ঢাকা, মঙ্গলবার,১৫ অক্টোবর ২০১৯

উপন্যাস

বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাস আর্থসামাজিক বাস্তবতা

মু সা ফি র ন জ রু ল

১৭ মার্চ ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৬:৫৯


প্রিন্ট

বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যের মূল উপজীব্য বিষয় হচ্ছে আমিত্ব, আত্মতা এবং নিঃসঙ্গতা। পরিবার-সমাজ ও স্বজনের সাথে বিশেষ যোগসূত্র না থাকায় প্রতিকূল পরিবেশ এবং বিরূপ ঘটনাধারা তাকে ক্রমশ আত্মসমাহিত, নিভৃতচারী, অন্তর্মুখী, সীমাহীন একাকিত্ববোধ ও নিঃসঙ্গচেতনায় আবিষ্ট করে তুলেছিল। তাই তার সাহিত্যে ইউরোপীয় সাহিত্যের ভাবধারার প্রভাব লক্ষণীয়। তার রচনায় তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিত্তসঙ্কট উপস্থাপনের অন্তরালে আত্ম-অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এ কারণে অনেকে মনে করেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার উপন্যাসে সমষ্টিচেতনা তথা বৃহত্তর সমাজচেতনা উপেক্ষিত হয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন, প্রতিকূল সমাজ প্রতিবেশ ও বিনাশী যুগচৈতন্য তাকে বিচলিত করে তুলেছিল। ফলে তার রচনায় যে জীবনবাদ প্রতিষ্ঠা পেল, তা মূলত পলায়নপ্রবণ, বিচ্ছিন্নতাপীড়িত ও নৈঃসঙ্গ্যশাসিত। বিবদমান পুঁজিবাদী সঙ্কটকে উপেক্ষা করে উনিশ শতকী ইয়োরোপীয় সাহিত্য যেমন আশ্রয় করেছিল অন্তর্চেতনার পলল মৃত্তিকায়; তেমনি কলোনিশাসন ও যুগ সঙ্কটকে ভুলে থেকে বুদ্ধদেবও সমাহিত হলেন ব্যক্তিভুবনে, আশ্রয় নিলেন ফেলে আসা রোমান্টিক স্বপ্নলোকে, জীবনের বিকল্প ভেবে শিল্পকেই করলেন অঙ্গীকার।

ত্রিশের যুগের কালপ্রবাহে বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে বুদ্ধদেবের পরিচয় কল্লোলপন্থী হিসেবেই স্মরণীয়। তবে ‘কল্লোলের কথাকোবিদ’ অভিধার অধিকারী হলেও তার লেখায় স্বাতন্ত্র্যের ছাপ সুস্পষ্ট। বস্তুত সাহিত্যের সব শাখায় বুদ্ধদেবের অসাধারণ দখলদারিত্ব থাকলেও ত্রিশের আগেই তিনি ঔপন্যাসিক পরিচয়ে সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। কল্লোলীয় বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটলেও বুদ্ধদেবের স্বকীয়তা তাকে স্বতন্ত্র রূপেও পরিচিত করে তুলেছিল। এই পরিচয়ের গৌরব বহন করেই উপন্যাসের জগতে তার আবির্ভাব, বিস্তৃতি ও প্রতিষ্ঠা।
দাম্পত্য সঙ্কট ও বিবাহোত্তর প্রেম বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয়। প্রেমের সঙ্গে জীবনকে তিনি অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে সংযুক্ত করেছেন। জীবনকে প্রেমের আঁধারে সন্ধান করেছেন তার উপন্যাসে। তিনি তার উপন্যাসে বৈনাশিক যুগসঙ্কটের প্রভাবে দাম্পত্য-বিচ্ছিন্নতাজাত এক নিঃসঙ্গতার শিল্পরূপ নির্মাণ করে বাংলা উপন্যাসে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছেন।
বুদ্ধদেব বসুর প্রথম পর্বের উপন্যাসে প্রেমই মৌল চেতনার পরিচায়ক হয়ে উঠেছিল। ‘সাড়া’ (১৯৩০), ‘ধূসর গোধূলি’ (১৯৩৩), ‘বাসর ঘর’ (১৯৩৫) প্রভৃতি উপন্যাসে বুদ্ধদেবের কবিত্ব শক্তির পরিচয় যেমন অস্পষ্ট থাকেনি, তেমনি প্রেম চেতনাও হয়ে উঠেছে স্পষ্টতর। প্রেমের এই জাগতিক রূপ প্রকাশে তিনি শরীর ধর্র্মকেও অস্বীকার করেননি। ‘একথা অনস্বীকার্য যে, ফ্রয়েড ও হ্যাভলক এলিসের মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্তসমূহ ত্রিশোত্তর বাংলাদেশে সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে প্রভাব বিস্তার করেছিল। বাংলা সাহিত্যে তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের প্রয়াসে তার প্রকাশ হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী। বুদ্ধদেবও এ প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করেন তার ছোটগল্প ও উপন্যাসে। এরই পাশাপাশি ভিন্ন প্রকৃতির প্রবণতাও বুদ্ধদেবের রচনায় অঙ্গীভূত হয়ে ওঠে।
বুদ্ধদেবের কবিসত্তার ব্যাপক প্রকাশ ঘটেছে তার উপন্যাসে। উপন্যাসের প্রধান বা কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র অথবা নায়ক চরিত্রটি তারই প্রতিভূ পরিচয়ে সমৃদ্ধ এক সৃষ্টি। লেখকের নিজস্ব চরিত্র বৈশিষ্ট্যের আভাসই প্রতিফলিত হয়েছে এসব চরিত্রেÑ প্রায়শই তারা কবি-শিল্পী অথবা অধ্যাপক। সে কারণে তার উপন্যাসের বিষয়- বৈচিত্র্য বিধৃত থাকলেও নায়ক চরিত্রের প্রকাশ প্রায়শই বৃত্তাবদ্ধ এক জীবনেরই বৈশিষ্ট্য বহন করে, সে জীবন অনেকাংশে অতি পরিচয়ের আড়ালে আচ্ছন্ন। তাদের প্রায় সকলের কথার মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে লেখকের কণ্ঠস্বরই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তার রচনায় বিধৃত কবিত্বপূর্ণ অথবা মননধর্মিতাই পাঠকমনকে আকৃষ্ট করে। তার রচনায় বাইরে থেকে ভেতরে, ঘটনা থেকে মানসিক প্রতিক্রিয়াকেই অধিক হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছে।
বুদ্ধদেব বসুর ঔপন্যাসিক অগ্রযাত্রার ইতিহাস তার স্বতন্ত্র বিচ্ছিন্ন ও অনন্য পরিচয় নিয়েই উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। ত্রিশের যুগে তিনি নিঃসন্দেহে নিঃসঙ্গ ছিলেন না, বহুর সমবায়ে তাদের সংক্ষুব্ধ শ্রেণীর আবির্ভাব বাংলা কথাসাহিত্যে বিশেষত উপন্যাসে প্রকরণগত বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বক্তব্যজাত অভিনবত্বেরও স্ফূরণ ঘটিয়েছিল। আর সমকালীন নানাবিধ অস্থিরতার অবশ্যম্ভাবী সেই পরিবর্তনের প্রবাহে অনেকের মতোই বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকাও ছিল অধিকতর উজ্জ্বল।
আধুনিক নগরজীবনের বহুমাত্রিক বিকৃতি ও বিচ্যুতি এবং পুঁজিবাদী সভ্যতার শ্রমশোষণ পদ্ধতি বুদ্ধদেব বসুর ‘যবনিকা পতন’ (১৯৩১) উপন্যাসের মূল উপজীব্য বিষয়। এ উপন্যাসে পুঁজিবাদী শ্রমনীতির প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এ উপন্যাসের অনেক চিত্রই কুৎসিত কিংবা জুগুপ্সাপূর্ণ। বাস্তবতার জোয়ারে প্রকৃত তথ্য বর্ণনা করতে গিয়ে অমিয়ের উচ্ছৃঙ্খল জীবন ও ব্যভিচারপূর্ণ আচরণের বর্ণনা নিতান্ত অপরিচ্ছন্ন। অঞ্জলি বসুর সঙ্গে তার যৌন সম্পর্ক সে কথা মনে করিয়ে দেয়। অঞ্জলি প্রচলিত নীতিবোধকে কখনো গ্রহণ করেনি। যৌবনের ধর্ম পালন করতে দেহকে নির্বিচার রাখতে অমিয় রাজি নয়। তার চিন্তা-চেতনায় ঘুরেফিরে শুধু খেয়ালিপনাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
এ উপন্যাসের নায়ক-নায়িকাদের সুখবাদী নীতির পরিণাম হিসেবে সমাজের অপরাধের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে গিয়ে আমাদের বলতে হবে এই অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতাকে আমরা প্রশ্রয় দিতে পারি না। যখন যা ভালো লাগে তাই করো- এই নৈরাজ্যের সুখ সমাজজীবনের কখনো কল্যাণ সূচিত করতে পারে না। তাই একে আমরা কঠোর অন্যায় আর অপরাধ বলে গ্রহণ করব, যদিও নায়ক-নায়িকারা কখনো এই অপরাধের দায়িত্ব স্বীকার করে না বা তাদের পাপবোধ তাদের অন্তরে ক্ষণকালের জন্য অনুশোচনায় পীড়িত করে না।
বুদ্ধদেব বসু বাংলা উপন্যাসের ধারায় পরিবর্তনের প্রয়াসী ছিলেন। মননকে প্রাধান্য দিয়ে সহজ-সরল কাহিনী অবলম্বনে বাংলা উপন্যাসকে গ্রামপ্রধান করতে সক্ষম হন। শহুরে জীবনের সচেতনতা না থাকায় একঘেয়েমি শিল্পবোধের নতুন উদ্ভাস কমে আসে। তার ‘তিথিডোর’ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ উপন্যাসে কবি বুদ্ধদেব বসু ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব বসুর হাত ধরে চলেছেন। এ কারণে ‘তিথিডোর’ একটি নিখুঁত আধুনিক প্রেমের কাহিনী হয়ে উঠেছে। আঙ্গিকের পরাকাষ্ঠায় অবিস্মরণীয় এ উপন্যাস।
বস্তুত এ উপন্যাসে স্বাতীর প্রেম আখ্যানের অন্তরালে চল্লিশের দশকের বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ জীবনের নানামাত্রিক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। মানুষের অন্তঃবাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের বহিরঙ্গ রূপ অঙ্কনের মাধ্যমে তিনি এ উপন্যাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের একটি বিশেষকালের শিল্পীত স্বরূপ চিত্রিত করতে সক্ষম হয়েছেন। সন্তোষকুমার ঘোষ বলেছেন- বৃহৎ উপন্যাস কখনো কখনো আপনকালের দলিল হয়, তবে বৃহত্ত্ব ছাড়িয়ে মহত্বের মর্যাদা পায়, ‘তিথিডোর’ তিরিশের শেষ আর চল্লিশের শুরুর কলকাতার পরিশীলিত একটি বিশেষ সমাজ মানসের দলিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে এক দিকে মধ্যবিত্ত সমাজের ভাঙন, অন্য দিকে চোরাকারবারি কালোবাজারির সাহায্যে নব্য ধনিক শ্রেণীর উত্থানের ফলে মানুষের সব প্রত্যয় যুগস্রোতে ভেসে গিয়েছিল। এই সময়ের ছোঁয়া ‘তিথিডোরে’র মানুষদের গায়েও লাগে। বিপন্ন হয় তারা সময়ের ঘানিতে।
‘তিথিডোর’ উপন্যাসের ঘটনাংশ রচিত হয়েছে উপন্যাসের নায়িকা স্বাতীর বাবা রাজেন বাবুকে ঘিরে। যুদ্ধকালীন পরিবর্তনমুখিতার প্রেক্ষাপটে তিনি জীবনকে সহজভাবে গ্রহণ করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত পরিবারের কেন্দ্রে থেকেও একাকী হয়ে পড়েন। ফলে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের পতন ত্বরান্বিত হয়ে ওঠে। বিজনের বিপথগামিতা, হারীত-শাশ্বতীর দাম্পত্য সঙ্কট, জামাতার মৃত্যু, স্বাতীর জন্য দুর্ভাবনা রাজেন বাবুকে একাকীত্বে বাধ্য করেছে। এ কারণে বহির্জীবনে অনভ্যস্ত এই মানুষটি শেষ পর্যন্ত আত্মকেন্দ্রীভূত এক বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেছে। উপন্যাসের নায়িকা স্বাতীর চিত্ত নৈসঙ্গানুভূতিতে বিদীর্ণ ও বিপন্ন। পরিবারে ও সমাজে কোথাও সে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না, কারো সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। তার এই বিচ্ছিন্নতা পারিবারিক বিপন্নতা বিজনের বিপথগামিতা এবং জীবনে সত্যেনের আগমন নতুন মাত্রা লাভ করে। সে অভ্যস্ত-নিরুত্তাপ পরিবারকে কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। বাবার প্রতি সম্পর্ক বন্ধন ছাড়া আর সব কিছু থেকে সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নিজের মধ্যে সম্পূর্ণতা খোঁজার জন্য নিমগ্ন হয়ে পড়ে। ফলে সবার মধ্যে থেকেও সে নিঃসঙ্গ ভুবনে বিচরণ করে। এই মানস প্রেক্ষাপটে মানুষের সান্নিধ্য তার কাছে যন্ত্রণার উৎস হয়ে ওঠে। স্বাতী তার পরিবারের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতেই ভালোবাসে। ‘যারা বেঁচে আছে, যাদের নিয়ে পৃথিবী, স্বাতীর মনে হলো তারা তার কেউ না। এমন কিছু সে জেনেছে যা আর কেউ জানে না; সেই জন্য সবার থেকে বিচ্ছিন্ন, পৃথিবীর মধ্যে সে একলা। সবাই চলেছে এক দিকে, নেচে, লাফিয়ে, ছুটে, ঘুরে, তাড়াতাড়ি, দেরি করে, দলে দলে চলছে বলির পাঁঠা, কেউ জানে না কোথায় যাচ্ছে, একলা সে জানে। একলা সে জানে যে জীবন্ত মানুষরাই মরন্ত, যারা বেঁচে আছে তারা দিনে দিনে মরছে। মৃত্যু নেই শুধু মৃতের।”৭ (তিথিডোর)।
‘তিথিডোর’ উপন্যাসে বুদ্ধদেব বসু মগ্নচৈতন্যের অন্তরালে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতার গরল, বিশ্বযুদ্ধোত্তর সমাজজীবনে শূন্যতা- একাকিত্বের বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছেন। এ উপন্যাসের চরিত্রগুলো কেবল রোমান্টিক নৈঃসঙ্গানুভূতি দ্বারাই প্রভাবিত হয়নি একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন সমাজবাস্তবতার টানাপড়েনে সংক্ষুব্ধ পীড়িত ও পর্যুদস্ত হয়েছে। ফলে উপন্যাসের মৌল জীবনার্থে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫