ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২২ আগস্ট ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

পলিটিক্স এবং পলিট্রিকস

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

২১ মে ২০১৬,শনিবার, ০৭:৪৮


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

‘পলিটিক্স’ শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ ‘রাজনীতি’। কিন্তু এখন প্রচলিত ব্যবহারে ‘পলিটিক্স’ শব্দটি আর এককভাবে ‘রাজনীতি’ অর্থ বহন করে না। নানা ধরনের নেতিবাচক শব্দ সংযোজিত হয়েছে ‘পলিটিক্স’-এর সাথে। ‘পলিটিক্স’ বলতে লোকেরা বোঝে ‘ষড়যন্ত্র’, ‘কূটিলতা’, ‘কারসাজি’, ‘প্রতারণা’, ‘কপটতা’ ইত্যাদি। তাহলে ‘পলিটিক্স’-এর অর্থ দাঁড়ায় ‘পলি’ অর্থাৎ বহুমুখী+‘ট্রিকস’ মানে কারসাজি = বহুমুখী কারসাজি। রসিক লোকেরা মজা করে বলেন, রাজনীতির মধ্যে পলিটিক্স ঢুকে গেছে। আর গ্রামের লোকেরা যাবতীয় নেতিবাচক বিষয়কে বলে ‘পলিটিক্স’। অথচ ‘পলিটিক্স’ অর্থাৎ রাজনীতি বিজ্ঞানের জনক বলে পরিচিত এরিস্টটল রাজনীতিকে সত্য, সুন্দর ও নৈতিকতার বিষয় বলে বর্ণনা করেছেন। অবশ্য পরে প্রাচ্যের কৌটিল্য (খ্রিষ্ট পূর্ব তৃতীয় শতাব্দী) এবং পাশ্চাত্যের ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭) রাজনীতিকে অনৈতিক বিষয়ে রূপান্তর করেন। রাষ্ট্রক্ষমতা রক্ষার জন্য সব ধরনের ধূর্ততা, হিংস্রতা, অপকৌশল ও বিশ্বাসঘাতকতাকে তারা যুক্তিযুক্ত বলে মতামত দেন। আজকে বাংলাদেশে কৌটিল্য-ম্যাকিয়াভেলির রাজনীতির মহড়া চলছে। 

উপর্যুক্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন ‘পলিটিক্স’-এ পরিণত হয়েছে। রাজনীতি থেকে নীতি-নৈতিকতা, সত্য-সুন্দর-বাস্তবতা পরিত্যক্ত হয়েছে। তার পরিবর্তে মিথ্যাচার, কদাচার, নির্মমতা, নৃসংসতা এবং অপকৌশল রাজনীতির অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক কারণে গুম, খুন, হামলা এবং মামলা নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, দলীয় কোন্দলে মৃত্যুÑ বাংলাদেশকে মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৌজন্য, সংহতি এবং সম্প্রীতির পরিবর্তে হিংসা, প্রতিহিংসা এবং জিঘাংসা সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক আদর্শের পরিবর্তে একে অপরের দোষারোপ বা ব্লেম গেম প্রাধান্য পাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ছল, বল এবং কলাকৌশলের কোনো ঘাটতি ঘটছে না। রাজনৈতিক ব্লাকমেইলিং ক্ষমতাসীন দলের অব্যাহত রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়েছে।
গত সপ্তাহে ইসরাইলি গুপ্তচর সংস্থা ‘মোসাদ’-এর সাথে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর কথিত বৈঠক নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। সরকারপক্ষের নেতানেত্রীরা অভিযোগ করছেন যে, বিএনপি সব নীতি, আদর্শ এবং মুসলিম পরিচয়কে বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ইসরাইলি গুপ্তচর সংস্থার সাথে ষড়যন্ত্র করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে তার প্রদত্ত বক্তব্যে অভিযোগ করেছেন, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মোসাদের সাথে ষড়যন্ত্র করছে। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তারা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর সাথে ইসরাইলি মোসাদের কথিত গুপ্তচরের সাথে বৈঠকের কথা উল্লেখ করছেন। এমনকি তারা মাল্যভূষিত দু’জনের ছবিও প্রকাশ করেছেন। ইতোমধ্যে আসলাম চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আদালতে জমা দেয়া পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ‘আসামি আসলাম চৌধুরী গত ৫-৯ মার্চ বাংলাদেশের সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের কাজে ভারতে যান। তিনি ভারতে থাকার সময় বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কবহির্ভূত রাষ্ট্র ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট মেন্দি এন সাফাদির সাথে সাক্ষাৎ করেন। আসামি বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের নীলনকশা করেন। এই নীলনকশা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সরকারকে অবৈধভাবে উৎখাতের জন্য সন্ত্রাস, নাশকতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করেন; যা দেশের অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি ও রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য বিভিন্ন পরামর্শ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং এ জন্য মোসাদের সহযোগিতা চান আসলাম চৌধুরী।’ বিএনপির নেতারা এই ঘটনাকে সরকারের কারসাজি বলে মন্তব্য করেন।
সরকারের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপির সাথে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সম্পর্ক আছে এ কথা সঠিক নয়। মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ফিলিস্তিনের অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি বিএনপির পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। ফিলিস্তিনের পক্ষে আমরা সবসময় কথা বলে আসছি। ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর ইসরাইলি আক্রমণ, আগ্রাসনের বিষয়ে আমরা সবসময় প্রতিবাদ করে আসছি। বিএনপি ফিলিস্তিনের জনগণের সাথে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মির্জা ফখরুল আরো বলেন, বিএনপি কোনো ষড়যন্ত্রে বিশ্বাস করে না। এটি একটি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। সরকার পরিবর্তন সম্ভব শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে। অন্য কোনো পথে সরকার পরিবর্তনের কথা বিএনপি চিন্তাও করে না। দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘জয়ের ৩০০ মিলিয়ন চুরি ধামাচাপা দিতেই সরকার আসলাম চৌধুরীকে দিয়ে নাটক সাজিয়েছে’। এ বিষয়ে অভিযুক্ত আসলাম চৌধুরী বলেন, তিনি ব্যবসায়িক সফরে ভারত গিয়েছিলেন। একটি সংস্থার আমন্ত্রণক্রমে তারা আগ্রা সফর করেন। সেখানে তিনিও একজন আমন্ত্রিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ইসরাইলি কোনো নাগরিকের উপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। তিনি কারো সাথে কোনো বৈঠকও করেননি।
অপর দিকে, ১৭ মে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় এ বিষয়ে ভারতীয় বক্তব্য প্রকাশিত হয়। এতে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী যে ইসরাইলি নাগরিকের সাথে ভারতে বৈঠক করেছেন বলে বলা হয়, সেই মেন্দি এন সাফাদিকে গুপ্তচর বলে উল্লেখ করায় তার আমন্ত্রণকারীরা বিস্ময় প্রকাশ করেন। তারা বলছেন, মেন্দি এন সাফাদি নামে ওই ইসরাইলি একজন গবেষক ও রাজনীতিক। তিনি মোসাদের কেউ নন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মেন্দি ইসরাইলের ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য। সম্প্রতি ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক এবং আরো নানা বিষয়ে কথা বলতে তিনি বেশ ঘন ঘন ভারত সফরে এসেছেন। ইন্টারন্যাশনাল ডিপলোমেসি অ্যান্ড পাবলিক ডিপলোমেসি নামে তিনি একটি থিংক ট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান চালান। ভারতের একাধিক বিশেষজ্ঞের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এদের একজন মেজর জেনারেল (অব:) গগনদীপ বক্সি। সাফাদিকে একজন গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করায় বিস্ময় প্রকাশ করেন জেনারেল বক্সি। দিল্লির যে প্রতিষ্ঠানটি এন সাফাদিকে অনুষ্ঠিত সেমিনারে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিল, সেই ইন্ডিয়ান সিটিজেন সিকিউরিটি কাউন্সিল মনে করে দিল্লিতে এসে তিনি বাংলাদেশে অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা করবেন সেটা অবিশ্বাস্য। সংগঠনের আহ্বায়ক বিজয় কুমার বলেন, ‘আমাদের আলোচনায় আমরা নানা মতের লোকজনকে কথা বলার প্লাটফর্ম দেই। তাদের সাথে আমাদের এটুকু সম্পর্ক। সাফাদিকেও আমরা এভাবেই ডেকে ছিলাম; কিন্তু দিল্লিতে এসে তিনি ভারতের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত হবেন, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই’। সংগঠনের পক্ষ থেকে উভয়ের সাক্ষাৎকার সম্পর্কে বলা হয়, সাফাদির সাথে আসলাম চৌধুরীর দেখা হয়েছিল দিল্লিতে নয়, আগ্রায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আগ্রার মেয়র ইন্দ্রজিৎ বাল্মীকি। তার উপস্থিতিতে দু’জনকে মালা পরানো হয়। উপলক্ষ ছিল আগ্রার সাথে ইসরাইলের সামারিয়া শহরকে টুইন সিটি হিসেবে ঘোষণা করা। আগ্রার মেয়র বলেন, এই টুইন সিটির প্রস্তাবটা এসেছিল ইসরাইলি প্রতিনিধিদলের কাছ থেকেই। ওরাই আমার সাথে দেখা করতে চান। আমি তাজমহলে সেই অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করি। সেখানেই সাফাদি এসেছিলেন। আরো হয়তো অনেকে এসেছিলেন। সবাইকে তো আমার পক্ষে চেনা সম্ভব নয়। অনেক বড় দল ছিল। আসলাম চৌধুরীও সেখানে ছিলেন কি না মেয়র তা অস্বীকার করছেন না। কিন্তু একই সাথে বলছেন, আসলাম চৌধুরী যে বাংলাদেশের নাগরিক সেটাই তিনি জানতেন না। এদিকে বিবিসি জানিয়েছে, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আসলাম চৌধুরী ব্যবসায়ের কাজে আগ্রাও যাতায়াত আছে। সেই সুবাদে হয়তো শহরের মেয়রের আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে থাকতে পারেন। তবে একই অনুষ্ঠানে সাফাদি ও আসলাম চৌধুরীর দেখা হয়ে থাকলেও তাদের মধ্যে কোনো বৈঠকের খবর জনা নেই বলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করছেন। খোদ সাফাদি বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি, সেখানে সংখ্যালঘুদের অবস্থা সবাই জানেন- আমরা দু’জনে সেসব নিয়েই কথা বলেছি; তা-ও সেটা একটা প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে। আমরা বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করছিলাম বা সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা করছিলাম এর চেয়ে হাস্যকর কিছু হতে পারে না। সরকার ফেলার চক্রান্ত একটা প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে করা হচ্ছে, তারপর আবার চক্রান্তকারীরা হাসিমুখে তাদের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন, এ জিনিস আবার কোথাও হয় নাকি?’ তিনি বিবিসি বাংলাকে আরো বলেন, আগ্রার যে অনুষ্ঠানে তার সাথে আসলাম চৌধুরীর দেখা হয়েছিল তাতে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারতের ক্ষমতাসীন দল যুব শাখা। প্রতিবেশী দেশের একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আসলাম চৌধুরী সেখানে আমন্ত্রিত ছিলেন। দু’জনের আগে থেকে পরিচয়ও ছিল না, একই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত দুই অতিথি হিসেবে তাদের মধ্যে স্বাভাবিক আলোচনা হয়েছিল মাত্র। বিবিসির রিপোর্টে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে তাকে যে মোসাদের গুপ্তচর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে সে সম্পর্কেও সাফাদি পুরোপুরি অবহিত। এ সম্পর্কে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমাকে এমন একজন গুপ্তচর দেখান যিনি ঘণ্টায় ঘণ্টায় তার গতিবিধি ফেসবুকে পোস্ট করেন, সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান, সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দিয়ে বেড়ান। এর পরেও কেউ আমাকে যদি গুপ্তচর মনে করেন তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই।’
প্রকাশিত এ বক্তব্যটি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, বিষয়টি ছিল তাৎক্ষণিক এবং একসাথে, একযোগের। কোনো একটি ভোজসভায় যেমন অসংখ্য অপরিচিত লোকের সমাবেশ ঘটতে পারে, এটাও ছিল সেই সাদামাটা ঘটনা। কিন্তু যারা সাদামাটা ঘটনাকে রাজনৈতিক লেবাস পরাতে চান, তাদের উদ্দেশ্যটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে এই বিষয়টি ব্যবহৃত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে অস্বাভাবিক হলো বিএনপি-ইসরাইল সংযোগ। মানুষ জানে বিএনপি চিরাচরিতভাবে একটি মুসলমান ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল। এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, বন্ধন অটুট রাখার জন্য অকান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। ইসলামি সম্মেলন সংস্থায় তার ভূমিকা, ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে তার দূতিয়ালি এবং মর্যাদাপূর্ণ আল কুদ্স কমিটিতে তার অবস্থান- তাকে মুসলিম উম্মাহ্র কাছে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আরোপ করেন। ইসলামি মূল্যাবোধ বিএনপির বিঘোষিত নীতি। নিয়মতান্ত্রিকতা বিএনপির আদর্শ। সুতরাং এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের মানুষের বিপরীতে অবস্থান অবশ্যই অলিক কল্পনা। অপর দিকে, নীতি আদর্শ এবং কার্যক্রমের দিক থেকে ক্ষমতাসীনদের সাথে ইসরাইলি লবির সতত সহযোগিতা স্বাভাবিক। কূটনীতিতে এদের বলা হয় স্বাভাবিক মিত্র। ধর্মনিরপেক্ষতা, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং ইসলামি মৌলবাদ মোকাবেলায় তাদের রয়েছে অভিন্ন লক্ষ্য। ১/১১-এর ঘটনাবলির পর এসব বিবেচনায় একটি ‘প্যাকেজ ডিল’-এর আওতায় তারা ক্ষমতাসীন হয় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ইরানের শাহান শাহ রেজাশাহ পাহলবি তেহরানে মোসাদ বাহিনী পালতেন। আজো ইসলামের খেদমতগার বলে দাবিদারদের মোসাদের খেদমত নেয়ার গুজব রয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে, যুদ্ধের তথ্য বিনিময়ের নামে মোসাদের সাথে তাদের যোগাযোগ অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সন্দেহ নেই বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলার জন্যই কাজটি করা হয়েছে। এর পেছনে যদি আদৌ কোনো ষড়যন্ত্র থাকে তাহলে তা প্রতিবেশী দেশেই নিহিত। তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সাথে এ কার্যক্রম সঙ্গতিপূর্ণ। এর মাধ্যমে ক. সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, বিএনপি ‘যেনতেন প্রকারে’ ক্ষমতায় যেতে চায়। খ. ইসলামি মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠাকামী বলে একে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা। গ. মুসলিম বিশ্বের সাথে চলমান চমৎকার সম্পর্কে চিড় ধরানো। ঘ. একতরফা গণমাধ্যমে বিএনপির বিপুল জনপ্রিয়তা বিনষ্ট করা। ঙ. মিথ্যার বেসাতি করে বিএনপির মনঃস্তাত্ত্বিক ক্ষতি সাধন।
বাংলাদেশে ঘটমান সবকিছুকে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দ্বারা বিচার করা একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল বার্কুন তার বিখ্যাত গ্রন্থ A Culture of Conspiracy-তে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব তালাশ করেছেন। বার্কুন বলেন, ষড়যন্ত্র সত্য তবে সর্বত্র সত্য নয়। লিও টলস্টয়ের একটি উক্তি এরকম, 'There is nothing good or bad in this world but, things make it so. সুতরাং সবসময় সর্বত্র ষড়যন্ত্র আবিষ্কার কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা হতে পারে না। ‘পলিটিক্স’কে পলিট্রিক্সে রূপান্তর দেশ-জাতি-রাষ্ট্রের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। সুতরাং সাধু সাবধান!!
লেখক : কলামিস্ট এবং প্রফেসর
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫