ঢাকা, শনিবার,২৪ আগস্ট ২০১৯

মজা.কম

স্মৃতির মাইনকাচিপায় ভোট

শাহাদাত ফাহিম

১৫ জুন ২০১৬,বুধবার, ১৮:৪২


প্রিন্ট

ভোটের প্রসঙ্গ আসতেই তবারক চাচা ছোঁ মেরে টেনে নিলেন প্রসঙ্গ। বলতে শুরু করলেন, তোমরা কী ডাইলের বোটের কথা বলো। ভোটের কথা বলতে হলে আমি বলব। তোমরা শুধু কান পেতে মনোযোগ দিয়ে শুনে যাবে। শোনো তাহলে। আমাদের সময়ে ভোটের চিত্রই ছিল আলাদা, যা তোমরা কল্পনাও করতে পারো না। তখন ভোটের আগে মিছিলে যে পরিমাণ বিস্কুট বিতরণ করা হতো, তা তোমরা সারা জনমেও খেতে পাও কিনা সন্দেহ। মিছিল শুরু হওয়ার আগেই বিতরণ করা হতো প্রথম দফা। আর শেষ হলে বিতরণ করা হতো দ্বিতীয় দফা। যে দিন মিছিল করতাম সে দিন আমাদের আর ভাত খেতে হতো না। বিস্কুট খেয়েই পেট ভরে যেত। মিছিল যখন বাড়ির সামনে দিয়ে যেত, তখন আমরা গরমের কারণে জামা খুলে বাড়িতে রেখে তার পর আবার সেই মিছিলে শরিক হতে পারতাম। এবার ভেবে দেখো কত বড় মিছিল ছিল আমাদের সময়ে! তবে আমরা কিন্তু তোমাদের মতো এভাবে মোটরসাইকেল বা বাসে চড়ে, সিটে হেলান দিয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে মিছিল করতাম না। হেঁটে করতাম। আমাদের মিছিলে কোনো ককটেলের ব্যাগ ছিল না। কারো কোমরে পিস্তল গোঁজানো ছিল না। মিছিল করতে গিয়ে সেন্ডেল খুলে পড়ে গেলে প্রার্থীর কাছ থেকে তার সুদ-আসল কোনোটিই উসুল করতাম না। 

প্রার্থীর পোস্টার লাগাতে গিয়ে আমরা এখনকার মতো আরেক প্রার্থীর ভাঙা অথবা গোলআলু মার্কা চোহারার ওপর পোস্টার লাগিয়ে টেংরি ফালানোর এন্তেজাম করে বসতাম না। এক প্রার্থীর মাইক আরেক প্রার্থীর লোকেরা ভুলেও হকিস্টিক দিয়ে মুখস্থ পিটিয়ে ভেঙে ফেলত না। বলতে পারো তখন তো এখনকার মতো হকিস্টিকের চল ছিল না। তা ঠিক। তবে মুগুরের চল তো অবশ্যই ছিল। এটির চল থাকা সত্ত্বেও আমরা মুগুরের ব্যবহার করতাম না। ভোট দেয়াটা আমাদের কাছে ছিল প্রায়ই ঈদের মতো খুশির ব্যাপার-স্যাপার। নিজের নতুন পোশাক না থাকলেও কারো কাছ থেকে ধার করে হলেও গায়ে দিয়ে ভোট দিতে যেতাম। তবে যাওয়ার সময় তোমাদের সময়ের মতো ময়-মুরব্বিদের কাছ থেকে জীবনের ভুল-ভ্রান্তির জন্য মাফ চেয়ে যেতে হতো না। কারণ তখন ভোটকেন্দ্র থেকে নিরাপদে ফিরে আসার পূর্ণ গ্যারান্টি ছিল। এখনকার মতো তখন ভোট দিতে গিয়ে লাশ হয়ে সেখান থেকে কবরস্থানে যেতে হতো না। দুই পা দিয়ে ভোট দিতে গিয়ে এক পা নিয়ে ফিরে আসারও রেওয়াজ ছিল না। দৌড়ানির বদৌলতে ডোবায় পড়ে নোংরা পানি খেয়ে পেট ভরতে হতে না দুই-চার জনের। ব্যালট পেপার কিন্তু শুধু ভোট দেয়ার সময় প্রিজাইডিং অফিসারের হাতেই পাওয়া যেত। ঝোঁপে বা টয়লেটের পেছনে বাটি চালা দিয়েও পাওয়া যেত না। আর ব্যালটবাক্স দিয়ে তখন এভাবে ফুটবল খেলা হতো না মোটেই। এটা নিয়ে কাড়াকাড়িও হতো না। তবে এখনকার মতো তখন সিল মেরেই ভোট দেয়ার নিয়ম ছিল। কিন্তু ভোটের আগের দিন রাতে সিল মেরে বাক্স বর্তি করে ফেলার তরিকাটি একদমই ছিল না। তখন এজেন্ট ও প্রিজাইডিং আফিসারেরা কেন্দ্রে বসে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন না। কেন্দ্র ময়দানে চতুষ্পদ যন্তুদের বিচরণও ছিল না।
অবশ্য ভোট গণনার মধ্যে তখন আর এখনের মাঝে তেমন কোনো তফাৎ ছিল না। তফাৎ ছিল এইটুকুই; তখন এখনের মতো করে বিজয়ীকে পরাজিত ঘোষণা করা হতো না। পরাজিত লোক বিজয়ী ঘোষণা পেয়ে এভাবে দোকানে মিষ্টির সঙ্কট তৈরি হতে দিতো না। মিষ্টি বিতরণ নিয়ে ছিল না কোনো গৃহযুদ্ধ। ফলে সবাই যার যার ঘরে থাকতে পেরেছে শান্তিতে। কাউকেউ ঘর ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে অবহেলার জীবন যাপন করতে হয়নি। ভোটে যারা বিজয় লাভ করেছে, তারা গলায় ফুলের মালা নিয়েছে ঠিক; তবে জনগণের সেবাও করেছে। শুধু নিজের আর কর্মীবাহিনীর পেট ভর্তির কারবারে লিপ্ত থাকেনি। ভোট নিয়ে আরো অনেক স্মৃতি আছে আমার ভাণ্ডারে। আজ আর নয়। আরেকদিন বলব। এই বলে তবারক চাচা রওনা হলেন সামনের দিকে। আমরা তাকিয়ে থাকলাম তার পরিহিত দুই পায়ে দুইরকমের জুতার দিকে। একটি ছেঁড়া। আরেকটি আধা ছেঁড়া।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫