ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২২ আগস্ট ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

রাষ্ট্র বনাম সরকার

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

২৪ জুন ২০১৬,শুক্রবার, ১৯:১৬


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

সাধারণভাবে রাষ্ট্র ও সরকারকে এক, অভিন্ন ও সমার্থক মনে করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পরিচয় বিভাজক হিসেবে শব্দ দু’টি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সর্বাত্মক ও স্বৈরাচারী শাসকেরা নিজেদের রাষ্ট্রের প্রতিভূ মনে করে। যেমন ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই বলতেন- ‘আমিই রাষ্ট্র’। আধুনিক স্বৈরাচার সরাসরি বাক্যটি উচ্চারণ করেন না বটে, তবে তারা তাদের ক্ষমতার প্রয়োগ এবং কার্যব্যবস্থার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন- রাষ্ট্র এবং তাতে কোনো পার্থক্য নেই। আর গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের শাসক হচ্ছেন জনগণের প্রতিনিধি মাত্র। গণতন্ত্রের নামে যখন স্বৈরাচার চেপে বসে তখন তাকে বলা হয়, ‘গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব’ (Democratic Dictatorship)। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় কখনো কখনো এই শব্দযুগল উন্নত বিশ্বে নেতিবাচক বৈধতা পেলেও (যেমন- ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচার) তৃতীয় বিশ্বে শাব্দিক ও ব্যবহারিক উভয় অর্থেই নেতিবাচক। এর অর্থ দাঁড়ায়- ব্যক্তিশাসক, ‘রাষ্ট্র এবং সরকার’ উভয় সত্তার দাবিদার। 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাষ্ট্র ও সরকার সুস্পষ্টভাবে বিভাজিত। রাষ্ট্র একটি নৈর্ব্যক্তিক সত্তা। আর সরকার হচ্ছে, তার একটি অংশ মাত্র। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উইলোবি বলেন, ‘By the term, government is designated the organization of the state machinery through which is designated the organization of the state machinery through which its purposes are formulated and executed.’। সরকার হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। এ জন্য গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থায় রাষ্ট্র হচ্ছে মালিক আর সরকার হচ্ছে কর্মচারী। মনবদেহের সাথে তুলনা করে বলা যায় এভাবে যে, রাষ্ট্র হচ্ছে ‘দেহ’ আর সরকার হচ্ছে তার ‘মস্তিষ্ক’। রাষ্ট্র ও সরকারের পার্থক্য বোঝাতে আরো বলা হয়, রাষ্ট্র একটি স্থায়ী সত্তা, অপর দিকে সরকার হচ্ছে সাময়িক ব্যবস্থা। সরকার পরিবর্তনশীল, কিন্তু রাষ্ট্র অপরিবর্তনীয়। ‘সরকার যায় সরকার আসে, রাষ্ট্র চিরকাল বেঁচে থাকে’। শাসকের মৃত্যু হলে অথবা ক্ষমতাচ্যুত হলে অথবা নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রের মানচিত্রের কোনো বদল হয় না। বাংলাদেশে সেদিন জাতীয়তাবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত ছিল এখন আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিষ্ঠিত আছে। বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আইনগতভাবে সব জনসমষ্টি নিয়েই রাষ্ট্রের গঠন। ভূমি নয়, জনগণই রাষ্ট্রের সর্বপ্রধান উপকরণ। অপর দিকে রাষ্ট্রের এক ক্ষুদ্র জনমণ্ডলীর নাম সরকার। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গসংগঠনÑ আইন, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগ। কিছু নির্ধারিত ব্যক্তিরাষ্ট্রের এই অঙ্গগুলো পরিচালনা করে। সুতরাং রাষ্ট্র একটি বৃহত্তর ব্যবস্থা, সরকার তার প্রয়োজনীয় অঙ্গ মাত্র। রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হচ্ছে তার সার্বভৌমত্ব। সার্বভৌমত্বের অর্থ হচ্ছেÑ অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক বিষয়ে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা। সরকার সার্বভৌমত্বের ধারক-বাহক নয়। সংবিধান অনুযায়ী জনগণের পক্ষ থেকে সরকারকে দেয় ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারিত। ক্ষমতা জনগণের পক্ষ থেকে আহরিত, সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত। রাষ্ট্রের কিছু অলঙ্ঘনীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সরকার ইচ্ছা করলেই রাষ্ট্রকে বিক্রয় করে দিতে পারে না। জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো কার্যব্যবস্থা নিতে পারে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদ, চুক্তি এবং আইনের মাধ্যমে সরকারের দায়দায়িত্ব নিরূপিত। রাষ্ট্র গায়ের জোরে আরেকটি রাষ্ট্র দখল করলে রাষ্ট্রমণ্ডলী এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। যেমনÑ কুয়েত দখল মুক্তকরণ। কোনো রাষ্ট্রে মারাত্মকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে জাতিসঙ্ঘ সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে। বসনিয়া হার্জেগোভিনা, কসোভো এবং কিছু আফ্রিকান গোত্র রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপের কথা উল্লেখ করা যায়। তবে দৃশ্যত কেউ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে চায় না।
সরকার রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে অনুরূপ কার্যব্যবস্থা নিলে এর বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত। আধুনিক নির্বাচনব্যবস্থার মূল সূত্র হচ্ছে ‘সামাজিক চুক্তি’। এই মতবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের জনগণ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে তাদের শাসনভার অর্পণ করে। যদি শাসক দল ‘সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক সুবিধা’ (Optimum happiness for maximum people) নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে জনগণ আগের দেয়া সম্মতি প্রত্যাহার করতে পারে। তবে জনগণকে যেমন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে ন্যায়সঙ্গত মনে করা হয় না, ঠিক তেমনি সরকার যদি রাষ্ট্রবিরোধী অর্থাৎ জনস্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তাকেও বৈধতা দেয়া হয় না। জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে সরকারের দেশদ্রোহমূলক আচরণের বিরুদ্ধে নাগরিক সাধারণ আবেদন করতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তথা বিশ্বায়নের যুগে সরকারের কর্তৃত্বের সীমারেখা ক্রমহ্রাসমান হয়ে উঠছে। সম্প্রসারিত বিশ্বে তথ্যবিপ্লব, বহুজাতিক কোম্পানি এবং বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) ভূমিকা সরকারের কার্যক্রমকে সীমিত করে তুলছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এসব সংস্থাকে বলা হয় ‘অরাষ্ট্রীয় ক্রীড়নক’ (নন-স্টেড অ্যাক্টর)।

সম্প্রতি সরকারের ক্রমহ্রাসমান ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে ‘সহিংস অরাষ্ট্রীয় ক্রীড়নক’ (ভায়োলেন্ট নন-স্টেড অ্যাক্টর) অতীতের স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীর তরফ থেকে এর উদ্ভব এবং বিকাশ হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-র হামলার পরে বিষয়টি গোটা পৃথিবীকে আতঙ্কিত করেছে। সেই আতঙ্কের তরঙ্গাভিঘাত অনিবার্যভাবেই বাংলাদেশের মাটিতে আছড়ে পড়েছে। বাংলাদেশে ৯/১১-র স্টাইলে যে ১/১১-র কথা বলা হয়, সেখানেও এইসব ‘সহিংস অরাষ্ট্রীয় ক্রীড়নক’দের ভূমিকা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তারা ক. অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে, খ. আন্তর্জাতিক ক্ষোভে এবং গ. মতাদর্শিক উদ্দেশ্যে নানা ধরনের সহিংস কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। এর মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার ক্রমেই শক্তি প্রয়োগের মাত্রা তার বৈধ সীমারেখা লঙ্ঘন করছে বলে রাজনৈতিক মহল, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠছে। স্মরণ করা যেতে পারে, প্রথমত একটি প্যাকেজ ডিল, দ্বিতীয়ত পরাশক্তি এবং আঞ্চলিক শক্তির যোগসাজশে ক্ষমতাসীন হলেও শিগগিরই তারা জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে। পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন, ২০১২-এর পর জনগণের সঙ্কেত স্পষ্ট হয়। তখন আরো শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তারা গণ-আকাক্সক্ষা প্রতিরোধ করে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনে তাদের বিজয় অসম্ভব হয়ে উঠলে একটি গণ-অংশগ্রহণবিহীন অবৈধ নির্বাচনের মাধ্যমে তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। নির্যাতনের বাহন হিসেবে তারা গুম, খুন, জখম, হামলা এবং গণমামলার পথ বেছে নেয়। এ ক্ষেত্রে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ তাদের ক্ষমতা নিরাপদ করার একটি মাধ্যমে পরিণত হয়। তাদের ক্ষমতায় আরোহণের বছর ২০০৯-২০১৬ জুন পর্যন্ত আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান মোতাবেক ক্রসফায়ারে নিহতের সংখ্যা ৭১৩ (বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা এ ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়নি)। অতি সম্প্রতি ‘সহিংস অরাষ্ট্রীয় ক্রীড়নক’ (জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হিজবুত তাহরির)দের তৎপরতা অসম্ভব বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে ক্রসফায়ারে দু’টি মৃত্যু নাগরিক সাধারণকে উদ্বেগ আকুল করে তোলে।
অসংখ্য মৃত্যু আর বন্দুকযুদ্ধে নিহতদের কান্না ছাপিয়ে মানুষের বিবেককে আহত করে মাদারীপুরের ফয়জুল্লাহ ফাহিম হত্যাকাণ্ড। সে জনতার কাছে হাতেনাতে গ্রেফতার হওয়ার একজন কথিত জঙ্গি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সে শিবিরের লোক। গণমাধ্যম এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলেছে, সে নিষিদ্ধ ঘোষিত হিজবুত তাহরিরের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। সে সংখ্যালঘু একজন শিক্ষককে হত্যা করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়ে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। যেহেতু সে হাতেনাতে ধরা পড়া আসামি। সুতরাং দীর্ঘ সহিংসতার বিশ্বস্তসূত্রের সন্ধান তার মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারত। সেই বিবেচনায় ফাহিম ছিল মূল্যবান সম্পদ। অথচ তাকে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়। ফাহিমের মৃত্যুর ঘটনার রেশ না কাটতেই ঢাকায় ঘটে এ রকম আরেকটি ঘটনা। ঢাকায় নিহত হয় শরিফুল ওরফে শাকিল। পুলিশের ভাষ্য মোতাবেক সে লেখক অভিজিৎ রায়সহ অন্তত সাতটি খুনে জড়িত ছিল। এ নিয়ে চলতি মাসে সন্দেহজনক সাত জঙ্গিসহ ১৪ জন নিহত হলো তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিশ্লেষণে জানা গেছে, সাম্প্রতিক হামলা ও হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রসফায়ার কি জঙ্গি সঙ্কট সমাধানের উপায় হিসেবে সরকার বেছে নিয়েছে। অপর দিকে জঙ্গিদের যথাযথ বিচার ও তদন্তের আওতায় না এনে বন্দুকযুদ্ধের নামে তাদের হত্যা করা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান মন্তব্য করেছেন, ‘রাষ্ট্র দৃশ্যত কাঠগড়ায় রয়েছে’। তিনি আরো অভিযোগ করেছেন, সম্প্রতি মানবাধিকার কমিশন ২৩টি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। ২২ বার তাগাদা দিয়েও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো উত্তর আসেনি। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যরিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, এভাবে বন্দুকযুদ্ধ প্রশ্ন ও অবিশ্বাস তৈরি করেছে। অপর দিকে আইন ও সলিস কেন্দ্রের পরিচালক এবং মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল অভিযোগ করেন, ‘রাষ্ট্র কোনো কিছুই তোয়াক্কা না করেই নিজ হাতে আইন তুলে নিচ্ছে।’ উল্লেখ্য, সংবিধানের ৩১-৩৫ ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি যত বড় অপরাধীই হোক না কেন, তাকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই শাস্তি দিতে হবে। দৃশ্যত প্রমাণিত হচ্ছে, সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করছে। এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেফতারের ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ সে নির্দেশনাও অগ্রাহ্য করছে। এসব ঘটনাবলির পর মন্তব্য করা যায়, সরকার রাষ্ট্রকে অগ্রাহ্য করছে। বিশ্লেষকদের তরফ থেকে এমন মন্তব্য এসেছে যে, সরকারের মধ্যে জঙ্গিবাদের মদদদাতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একমাত্র হাতেনাতে ধরা ফয়জুল্লাহ ফাহিমের মৃত্যুকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ দিকে ঢাকায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত শরিফুলের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধের সত্যতা সম্পর্কে তার পরিবার প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলেছে, শরিফুল নামে যাকে হত্যা করা হয়েছে সে আসলে মুকুল রানা। তাকে প্রায় চার মাস আগে যশোর শহরের বসুন্দিয়া থেকে কয়েক ব্যক্তি তুলে নিয়ে যায়। তার নিখোঁজের বিষয় যশোর কোতোয়ালি থানায় সাধারণ জিডি বা ডায়েরি করা হয়েছিল। দীর্ঘ দিন ধরে দেশের মানুষ বন্দুকযুদ্ধের একই গল্প শুনে আসছে। এসব গল্প নাগরিক সাধারণ আর বিশ্বাস করে না।
দেশের প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ উত্থাপন করেছেন’। তিনি তার অভিযোগে আরো বলেন, ‘মাদারীপুরে শিক্ষক হত্যাচেষ্টার ঘটনায় অপরাধী ধরা পড়ল। অথচ রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তাকে ক্রসফায়ার দেয়া হয়েছে। কারণ, আটকেরা হয়তো এমন তথ্য দিয়েছে, যার সাথে সরকার জড়িয়ে যায়।’ তার মতে, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হচ্ছে। বিরোধীদলীয় নেত্রীর অভিযোগটি মারাত্মক। তিনি খোদ সরকার, যারা নাগরিকদের রক্ষক তাদের বিরুদ্ধেই অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন। ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ বোঝা যায়, কোনো সহিংস গোষ্ঠীর রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ আইন আমলে আনা যায়, কিন্তু যখন সরকারকে অভিযুক্ত করা হয় তখন অভিযোগটির ব্যাপকতা ও গভীরতা অনুধাবন করা উচিত।
এই লেখার প্রথমে রাষ্ট্র ও সরকারের সীমারেখা চিহ্নিত করা হয়েছে। রাষ্ট্র মূলত একটি নৈর্ব্যক্তিক সত্তা। কিন্তু তত্ত্বগতভাবে, নৈতিকভাবে এবং আইনগতভাবে এর একটি অবয়ব আছে। সংবিধান আর সরকার এক বস্তু নয়। সরকার হচ্ছে সংবিধানের বিধিবিধান-নির্ভর একটি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। একটি কারখানার কর্মচারীরা যেমন কারখানার মালিক নয়, ঠিক তদ্রুপ রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানের নিবেদিত সরকার রাষ্ট্রের মালিক নয়। পৃথিবীর তাবৎ রাষ্ট্রের মালিক হচ্ছে জনগণ। বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছেÑ ‘জনগণ-ই রাষ্ট্রের মালিক’। সুতরাং যখন সংবিধান অগ্রাহ্য করা হয় এবং জনগণকে নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেয়া হয় তখন অবশ্যই বলতে হয়, সরকার তার ‘ম্যান্ডেট’ লঙ্ঘন করছে। আর এটা সবার জানা কথা যে, এই সরকার সেই ‘ম্যান্ডেট’-এর ধারক নয়। সুতরাং সংবিধান ও জনগণ উভয় ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার বৈধতা হারিয়েছে। মনীষী কার্ল মার্কস সম্ভবত এ ধরনের সরকার আশ্রিত রাষ্ট্রকে ‘নিপীড়নের বাহন’ (ইনস্ট্রুমেন্ট অব টর্চার) বলে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশে রাষ্ট্র সরকারের যে অবস্থা তাতে বোঝা যায়, আমরা একটি ‘ভীতির রাজত্বে’ বসবাস করছি। তাই কেউ যদি রাষ্ট্র নামক বিমূর্ত সত্তাকে দায়ী করে ভীতি এড়াতে চান, তাহলে তাকে দোষ দেয়া যায় না। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে যে ‘মুৎসুদ্দিবাদ’ বা সুবিধাবাদ কায়েম হয়েছে সেখানে পরোক্ষ প্রতিবাদও ক’জনে করে? অবশেষে ফ্রেডারিক হায়েকের ভাষায় কর্তাব্যক্তিদের মনে করিয়ে দিতে চাই ‘The chief evil is unlimited government.’ সুতরাং ক্ষমতার সীমা-পরিসীমা সম্পর্কে সতর্ক থাকুন!

লেখক : কলামিস্ট এবং প্রফেসর
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫