ঢাকা, শনিবার,২৪ আগস্ট ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

তারা জনগণকে ‘বাঁশ’ দিচ্ছেন

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

১২ জুলাই ২০১৬,মঙ্গলবার, ২০:৪৭ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০১৬,মঙ্গলবার, ২০:৫৯


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

বাংলা ভাষায় বাঁশ শব্দটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলা গদ্য-পদ্য, ভূগোল-ইতিহাস এবং রাজনীতি-সমাজনীতি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে বাঁশ বিদ্যমান। ‘বাঁশ বাগানে’ বাঁশ আছে তেমনি আছে ‘বাঁশের বাঁশরি’। বাঁশ উৎপাদনশীল বিশেষ অঞ্চল আছে। ইতিহাসে ‘বাঁশের কেল্লার’ কথা আছে। সামাজিক বন্ধন বোঝাতে বাঁশের উদাহরণ আছে : ‘আমগাছ-জামগাছ-বাঁশঝাড় যেন, মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন’। এই কবিতায় ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’ গ্রামীণ জনগণের একসাথে বসবাসের কথা বোঝানো হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাঁশ একটি অনুষঙ্গ বটে। মনে আছে, ষাটের দশকে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল ঝড়ের পর পরিদর্শনে গিয়েছিলেন গভর্নর মোনায়েম খান। তিনি জনগণকে বললেন, ‘শিগগিরই আপনাদের বাঁশ দেয়া হবে’। ঘরবাড়ি মেরামত, অস্থায়ী নিবাস নির্মাণ এবং ভেঙে পড়া ব্রিজ-সেতুর পুনর্নির্মাণে বাঁশ তখন প্রয়োজনীয় ছিল; কিন্তু জনগণ বাঁশ দেয়ার অর্থ সোজাভাবে না করে বাঁকাভাবে করল। ১৯৭১ সালে ১ মার্চ মানুষজন বাঁশের লাঠি নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল। বাঁশ প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং রাজনীতির ভাষা। বাঁশ সর্বনাশের ভাষাও বটে। ইদানীং বাঁশ আবার আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এবার এটি সাহিত্যের ভাষা নয়, পুলিশের ভাষা। পুলিশ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনগণের মধ্যে বাঁশের লাঠি বিতরণ করছে। পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এসব বাঁশ বিতরণ অনুষ্ঠানে রাজনীতির ভাষায় কথা বলছেন। তারা বলছেন, টার্গেট কিলিংসহ গুপ্ত হামলা ও জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে প্রতীকী অর্থে বাঁশ বিতরণ করছেন। মানুষের মনোবল ও সচেতনতা বাড়াতে এ কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এসব সমাবেশে পুলিশের বক্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েকটি উদ্ধৃতি এ রকম... ক. এলাকায় টার্গেট কিলিং, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। খ. জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে বাঁশের লাঠি ও বাঁশি দিয়ে পাড়া-মহল্লায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এ লাঠি দিয়েই আমরা ব্রিটিশ ও পাকিস্তানকে তাড়িয়েছি, এবার জঙ্গি ও সন্ত্রাস তাড়াব। গ. কিছু জ্ঞানপাপী জনগণের হাতে লাঠি তুলে দেয়া নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। সেই জ্ঞানপাপীদের প্রশ্ন করতে চাই, যখন পুরোহিত, স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়, তখন আপনাদের বুকে ব্যথা লাগে না? কুলাঙ্গারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে আপনাদের মায়াকান্না শুরু হয়? যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী বলে দাবি করেন, রাত জেগে টেলিভিশনে ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলেন, আন্তর্জাতিক প্রভুদের পদলেহন করেন, তাদের সতর্ক করে বলতে চাই- কোথায় ছাড় দিতে হবে, কোথায় আইন প্রয়োগ করতে হবে তা আমাদের জানা আছে। মধ্যরাতের টেলিভিশন ছেড়ে আপনারা জনতার কাতারে এসে দাঁড়ান।

পুলিশের বাঁশ ও বাঁশি বিতরণ এবং এ ধরনের বক্তব্য বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের সর্বোত্তম পন্থা এটি নয়। এ দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় বাহিনীর। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর লাঠি বিতরণের অর্থ সহিংসতার উসকানি দেয়া। জনতার নামে যাদের হাতে লাঠি তুলে দেয়া হচ্ছে এবং সমাবেশে যারা বক্তব্য রাখছেন বা অংশ নিচ্ছেন, তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলের লোক। জনপ্রতিনিধিত্বের নামে যাদের অংশ নিতে দেখা যায়, তারাও ওই একই ঘরানার। তাহলে জনগণ কোথায়? বিভিন্ন মত ও পথের মানুষকে অনুপস্থিতি বিষয়টিকে একতরফা ও একদলীয় করে ফেলছে না? এমনিতেই বিগত কয়েক বছর ধরে সাধারণ অভিযোগ রয়েছে, সরকারের পেটোয়া বাহিনীগুলো পুলিশের আদলে ও মদদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে কাজ করছে। সুতরাং বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এখানে আরেকটি অনুষঙ্গ সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। সংখ্যালঘু শ্রেণী তথা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এবং মন্দিরকেন্দ্রিক কিছু সমাবেশ করা হয়েছে। তাদের হাতেও লাঠি-বাঁশি তুলে দেয়া হয়েছে। সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ে যারা দূরদর্শী তারা সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন যে, এর মাধ্যমে সংখ্যালঘু শ্রেণীর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে নাকি সংবেদনশীল করা হয়েছে? মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল মনে করেন, লাঠি-বাঁশি বিতরণ নাগরিক নিরাপত্তা বিধানের সর্বোত্তম পন্থা নয়। একটি প্রধান দৈনিকের কাছে তিনি বলেন, ‘নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর। মানুষকে যদি এভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর কাজ কী? একজন মানুষ কি চব্বিশ ঘণ্টা লাঠি-বাঁশি নিয়ে ঘুরে বেড়াবে? যখন তিনি কাজে যাবেন, স্কুল-কলেজে যাবেন তখনো কি তিনি লাঠি-বাঁশি বহন করবেন? এ ছাড়াও কারো হাতে লাঠি দিলেই তো হলো না, এটা ব্যবহারের জন্যও তো একটা দক্ষতা লাগে। আবার কার সাথে কার শত্রুতা রয়েছে, সে দিক থেকেও এগুলোর অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। এগুলোর নিয়ন্ত্রণ কে করবে?’ পুলিশের প্রদত্ত ব্যাখ্যায় বলা হয়- ‘এটি নিয়মিত কাজের বর্ধিত অংশ। সাধারণত সন্ত্রাস বা অপরাধ বেড়ে গেলে বিভিন্ন রকম উদ্যোগ নেয়া হয়। সম্প্রতি ঘটে চলা গুপ্তহত্যার মতো অপরাধ মোকাবেলায় সমাজের লোকজনকে সম্পৃক্ত করতেই এ ধরনের উদ্যোগ।’ পুলিশের ভাষ্যে এ কথাও দাবি করা হয় যে, গোটা পরিকল্পনাটি পুলিশের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের পরিকল্পনায় পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের পুলিশের এ ধরনের উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
পুলিশ প্রশাসন সম্পর্কে এমনিতেই জনগণের ভাবনা ভালো নয়। পুলিশকে জনগণ ভয় করে, ভালোবাসে না। কিছু দিন আগে টিআইবির প্রকাশিত দুর্নীতির রেকর্ডে পুলিশের স্থান দ্বিতীয়। তেঁতুলগাছ থেকে যেমন মিষ্টি আম আশা করা যায় না, ঠিক তেমনি আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত একটি সংগঠন থেকে মঙ্গলজনক কিছু আশা করা যায় না। এ ছাড়া প্রতিটি রাজনৈতিক দল যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখনই তারা পুলিশকে তাদের গদি রক্ষার কাজেই বেশি তৎপর রেখেছে। তারা নিরঙ্কুশভাবে জনগণের শান্তি ও স্বস্তির জন্য কাজ করতে পারেনি। পুলিশকে রাজনৈতিক ক্ষমতা বলয়ের বাইরে রাখার দাবি অনেক দিনের। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একটি ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হয়েছিল; কিন্তু যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হয়, তখন ‘লোম বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে গেছে।’ আর সব রিপোর্টের মতোই এটি আর আলোর মুখ দেখেনি। পুলিশ যাতে জনগণের বন্ধু হয় সে জন্য চেষ্টা-তদবির যে কম করা হয়েছে তা নয়। রাজার বদলে পারিষদের ক্ষমতা শতগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তবে শাসকের নির্দেশ মানতে গিয়ে পুলিশ এবং জনগণের মাঝে বেশ দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। আজকে বাঁশ এবং বাঁশি দেয়ার মাধ্যমে যে সূর ও ছন্দ সরকার আশা করে ইতোমধ্যেই তার ব্যত্যয় ঘটেছে। সুতরাং সচেতনতার বাঁশ ও বাঁশি জনগণের জন্য সর্বনাশের ‘বাঁশ’ বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি ধরে নেয়া হয় যে, পুলিশের বাঁশ বিতরণ কর্মসূচি সঠিক, তাহলে এ কথাও বলা যায় যে, ‘ইট ইজ টু লেট’- অনেক দেরি হয়ে গেছে। কথায় আছে না, ‘কাঁচা কালে না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাঁশ ঠাঁশ’।
প্রিয়জন সৈয়দ আবুল মাকসুদ বাঁশ ও বাঁশি বিষয়ক একটি সরস রচনা উপহার দিয়েছেন। তাতে তিনি অনেক বিষয়ের অবতারণা করলেও ‘বাঁশ ডলা’র কথা লেখেননি। গ্রামদেশে চোর-চোট্টা, গুণ্ডাপাণ্ডা, বাটপাড়-বদমায়েশদের শায়েস্তা করার জন্য বাঁশ ডলা দেয়া হয়। দু’টি বাঁশ একত্রে করে শরীরের মাংশপেশি সঙ্কুচিত করা হয়। বাংলাদেশের সর্বত্র নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে বাঁশের ব্যবহার হয়ে আসছে। এখন পুলিশের সর্ব আরোপিত বাঁশের লাঠি নিপীড়নের হাতিয়ার নাকি প্রতিরোধের অস্ত্র- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আরেকটা কথা, বাংলা ভাষায় একটা প্রবাদ আছে ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়’। এ কথার অর্থ হচ্ছে- মূল বিষয়ের চেয়ে ছোট অংশকে যখন বড় মনে করা হয়। এর সমার্থক প্রবাদ হচ্ছে- ‘ডালের চেয়ে ভাত উঁচু’, ‘তাঐ- এর চেয়ে পুত্রা ভারী’। এখন গবেষণার বিষয়বস্তু হতে পারে ‘সরকারের চেয়ে পুলিশ ভারী হয়ে উঠল কি না?’ 

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫