ঢাকা, শনিবার,২৪ আগস্ট ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

জাতীয় ঐক্যের কর্মসূচি

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

২২ জুলাই ২০১৬,শুক্রবার, ১৯:৫৯


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

যেকোনো রাষ্ট্রব্যবস্থায় সঙ্কটকালীন সময়ে জাতীয় ঐক্য অনিবার্য। পৃথিবীর উন্নত সভ্যতার ধারক দেশগুলোতে এ ধরনের ঐক্যের অনেক উদাহরণ রয়েছে। যুদ্ধকালীন সময়ে অথবা গৃহযুদ্ধের আশঙ্কায় দেশ ও জাতি যখন বিপর্যয় মোকাবেলা করে তখন কেবল জাতীয় ঐক্য সেই জাতিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর নির্দেশনা দিতে পারে। প্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থায় দলীয় সরকার রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে। রাষ্ট্রপ্রধান যে দলেরই হোন না কেন, তিনি তখন দলীয় সঙ্কীর্ণতা পরিহার করে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। এভাবে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গৃহযুদ্ধ ক্ষত মার্কিন রাষ্ট্রনায়ক আব্রাহাম লিঙ্কন। প্রথম মহাযুদ্ধে মানসিক সুবিধাবাদ ও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা অতিক্রম করে গণতন্ত্রের স্বার্থে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। চার্চিলের সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত ও সাহসিকতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনকে দিয়েছে গৌরবের মালা। জেনারেল দ্য গল ফিরিয়ে এনেছিলেন ফরাসিদের ভূলুণ্ঠিত সম্মান ও মর্যাদা। তৃতীয় বিশ্বের নাসের, নক্রমা এবং নেহরু স্ব স্ব জাতীয় সঙ্কটে পালন করেছেন জাতীয় ঐক্যের যথার্থ ভূমিকা। তারা তাদের ক্ষমতার চেয়ে বড় করে দেখেছেন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। তাই মার্কিন ধর্মতাত্ত্বিক এবং গ্রন্থাকার জেমস ফ্রিম্যান ক্লার্কের উক্তিটি এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, "A politician thinks of the next election : A statesman, of the next generation." একজন রাজনীতিবিদ তার ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যকে অতিক্রম করে যখন জাতীয় স্বার্থে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন তখন তিনি যথার্থভাবেই হয়ে ওঠেন একজন রাষ্ট্রনায়ক। 

বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র অতিক্রম করছে নিশ্চিত এক ক্রান্তিকাল। ৯/১১ যদি হয়ে থাকে বর্তমান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের মাইলফলক, তাহলে আমাদের ‘কালো শুক্রবার’ অবশ্যই এ জাতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সূচনা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়Ñ বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লক্ষ্যে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও সংহারকে সমর্থন করেনি। ১৯৭১ সালে জাতীয় নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক এবং নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে চেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি নির্বোধ জেনারেলদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে একটি রাজনৈতিক দল যখন নিয়মতান্ত্রিক পথ ছেড়ে সহিংসতা, সন্ত্রাস আর জিম্মি করার রণকৌলশ গ্রহণ করে তখন মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করে। বর্তমান সন্ত্রাসের সঙ্কট যদি আমরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস বাংলাদেশের জনগণের ওপর আরোপিত হয়েছে। সন্দেহ নেই, পাশ্চাত্য বিক্ষুব্ধ গোটা বিশ্বের মুসলিম মানস ক্ষুব্ধকাতর অনুভূতি বহন করে সর্বত্র। গতানুগতিকভাবে এরও দুটো ধারাÑ ১. নিয়মতান্ত্রিক, ও ২. সহিংস। পাশ্চাত্য ও তার দেশজ এজেন্টরা আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, মিসর ও বাংলাদেশ সর্বত্র নিয়মতান্ত্রিক ধারাকে অগ্রাহ্য করেছে। তার ফলে সন্ত্রাসী শক্তি সময় ও সুযোগ মতো সংগঠিত হয়েছে। পাশ্চাত্য তাদের রণকৌশলের ‘বাই-প্রোডাক্ট’ হিসেবে সৃষ্টি করেছে আলকায়েদা, নুসরা ফ্রন্ট এবং আইএস। এরা ডালপালা ছড়াতে চায় পৃথিবীর সর্বত্র। প্যারাসাইড যেমন সহজেই ক্ষতস্থানে বাসা বাঁধে, তেমনি মুসলিম বিশ্বের যেখানে ক্ষত আছে, জুলুম আছে এবং আইনের শাসনের অভাব আছে, সেখানেই তারা সহজেই তাদের ঘাঁটি গাড়তে পারে। ষড়যন্ত্রকারীরা বিশেষত ‘মোসাদ’-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব ক্ষেত্রে সুযোগ বুঝে ‘আগুনে ঘি ঢেলে দেয়’। যারা এ রকম সংস্থার এজেন্ট হিসেবে কাজ করে তারা নিজেরাই জানে না যে, সে কার উদ্দেশ্য সফল করছে। ভারতের গুজরাট দাঙ্গায় হিন্দু তীর্থবাহী ট্রেনে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা অতিক্রমকালে একটি ঢিল-ই হাজার হাজার মুসলিম হত্যার সূত্রপাত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। বিশেষজ্ঞরা খোলামেলাই বলছেন, ইরাকের শিয়া-সুন্নি বিরোধ যতটা না ধর্মবিরোধ, তার চেয়েও বেশি সাম্রাজ্যবাদের অনুঘটক। এসব ঘটনা একবার শুরু হলে গোষ্ঠীগত প্রতিশোধের ধারা অব্যাহত থাকে অনেককাল ধরে। এটা হয়ে দাঁড়ায় ‘Never ending story’। গুলশানে জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পর আমরা এ রকম কোনো ধারার মাঝে আটকে গেলাম কি না, সেটিই বিবেচ্য।
প্রধানমন্ত্রী যথার্থভাবেই উপলব্ধি করেছেন, গুলশান ট্র্যাজেডি ইতোমধ্যেই একটি অদৃশ্য জাতীয় ঐক্য তৈরি করেছে। বাংলাদেশের সব মানুষ নীরবে-নিভৃতে রক্তপাতের বিরুদ্ধে এক হয়েছে। সব রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীনদের অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচার তুচ্ছ করে জাতীয় স্বার্থে একাট্টা হয়েছে। দেশের নাগরিক সমাজ তাদের স্ব স্ব কর্মসূচি দিয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শক্তভাবে ‘না’ উচ্চারণ করেছে। এই অনুভূতি, মনোভাব ও উচ্চারণকে কার্যক্ষেত্রে ধারণযোগ্য করে তোলার দায়িত্ব নিশ্চিতভাবেই সরকারের। দীর্ঘস্থায়ী, মধ্যমেয়াদি ও আশু কর্তব্যÑ এই ত্রিবিধভাবে সরকার তার দায়িত্ব পালন করতে পারে। এজন্য দরকার যথার্থ দক্ষতা, দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতা। পারস্পরিক বিভেদ, মতপার্থক্য ও হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে জাতীয় ঐক্য সূচনার এখনই সময়। প্রধানমন্ত্রী যে ‘নীরব জাতীয় ঐক্য’ লক্ষ করেছেন, তাকে সরব করার জন্য প্রয়োজন যথার্থ কর্মসূচি। তিনি রেডিও-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে যে ‘জাতীয় ঐক্যে’র আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে সাড়া দিয়েছেন সবাই। কার্যত প্রধান বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঘটনার পরপরই একটি আবেগময় বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, ‘কালবিলম্ব না করে আসুন আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে দলমত নির্বিশেষে সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য গড়ে তুলে শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি। কে ক্ষমতায় থাকবে আর কে ক্ষমতায় যাবে, সেটা আজ বড় কথা নয়। আজ আমরা যারা আছি, আগামীতে তারা হয়তো কেউ থাকব না। দেশ থাকবে। জাতি থাকবে। সে দেশ ও জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আজ বিপন্ন। আমরা যে যাই বলি, আমাদের কিছুই থাকবে না, কোনো অর্জনই টিকবে না, যদি আমরা সন্ত্রাস দমন করতে না পারি।’ বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে অনুরূপ মনোভাব প্রকাশ করে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খালেদা জিয়া আহূত ‘জাতীয় ঐক্যের ডাক’ কার্যত প্রত্যাখ্যান করায় ক্ষমতাসীন দলের কঠোর সমালোচনা করেন। এরপরও বিএনপি জাতীয় ঐক্যের জন্য সরকারকে জোর তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পুনরায় বলতে চাই, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও কার্যকর গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাবে সম্মত হোন।’ সরকারের অসম্মতি ও দাম্ভিক অবস্থান দেশ ও জনগণের জন্য আরো বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। সরকার যদি ‘জাতীয় ঐক্যে’ রাজি না হয়, তাহলে তাদের উচিত সমমনা দলগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট’ গঠন করা। তারা তাদের মতো করে জাতীয় ঐক্যের কর্মসূচি প্রণয়ন করতে পারে। দেশের সুশীলসমাজও ‘জাতীয় ঐক্য’ ও যথার্থ কর্মসূচির আহ্বান জানিয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘শুধু বল প্রয়োগ করে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করা যাবে না। তবে যারা অপরাধী তাদেরকে আইনের আওতায় এনে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় এর কারণ অনুসন্ধান করতে হবে এবং জঙ্গিদের মতের বিপক্ষে সুচিন্তিত ও বিকল্প প্রস্তাবনা দাঁড় করাতে হবে। তাদেরকে বোঝাতে হবে যে, তাদের মত ঠিক নয়।’ জঙ্গিবাদের কারণ সম্পর্কে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী মুসলমানেরা নিজেদের নির্যাতিত মনে করে। এ ছাড়া আমাদের বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে, যা জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করছে।’ সন্ত্রাসের সমাধানকল্পে তারা ‘জাতীয় ঐক্য ও জনগণের একাত্মতার’ ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা আরো বলেন, ‘এ অবস্থায় জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজন গণতন্ত্র ও সুশাসন, যে গণতন্ত্র হবে জবাবদিহিমূলক।’ সুজন-এর বক্তব্যে সন্ত্রাস মোকাবেলায় আমাদের করণীয় ও কর্মসূচির তাগিদ রয়েছে।
যেকোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিশেষত সংসদীয় ব্যবস্থায় মূলত সরকার হচ্ছে দলকেন্দ্রিকÑ এ কথা আগেই বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতিতে ব্যক্তির প্রাধান্য থাকলেও দলের সমধিক গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা বহাল রয়েছে। তত্ত্ব ও বাস্তবে এটি একটি দলকেন্দ্রিক রাষ্ট্র। সংসদীয় ব্যবস্থা মানেই বহু দলের অবস্থান নিশ্চিতকরণ। বিশেষত নির্বাচিত সংসদীয় বিরোধী দলকে রাষ্ট্র ও সরকারের অপরিহার্য মনে করা হয়। সুতরাং বাংলাদেশের যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জাতীয় স্বার্থের সব মত ও পথের সম্মিলন প্রয়োজন। সন্ত্রাস প্রতিরোধ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। ১৬ কোটি মানুষের জন্য ১৬ কোটি পুলিশ নিয়োজিত হতে পারে না। আরোপিত এই সন্ত্রাসকে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থান এবং শিক্ষা জগৎ থেকে দূরীভূত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে ইসলাম একটি অলঙ্ঘনীয় মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক শক্তি। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে সন্ত্রাস নির্মূলের বাহন। প্রধানমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। যে কার্যব্যবস্থাই নেয়া হোক না কেন, তা হতে হবে ‘জাতীয় ঐকমত্য’-এর ভিত্তিতে। প্রথমত, আশুব্যবস্থা হিসেবে গোটা জাতির কাছে এবং বহির্বিশ্বে আমাদের শক্ত অবস্থান তুলে ধরার জন্য একটি ‘জাতীয় ঘোষণা’ দেয়া যেতে পারে। জাতীয় সংসদ হতে পারত এর যথার্থ ফোরাম। কিন্তু যেহেতু প্রধান বিরোধী দলের জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব নেই, সেহেতু জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত সব রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরে একটি ঘোষণা প্রচার করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকারের শক্তি প্রয়োগ কৌশলের পরিবর্তে সহযোগিতার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। নির্বিচার হত্যা, হাজার হাজার লোককে গ্রেফতার এবং সন্ত্রাসের বিপক্ষে সন্ত্রাস করে সন্ত্রাস দমন করা যাবে না। জনগণকে আস্থায় নিতে হলে মামলা-হামলা ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, সরকার সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করতে পারে। ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে তারা দেশব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী জনমত গঠন করতে পারে। চতুর্থত, কোনো বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়ী না করে এবং কোনো ছাত্র সংগঠনকে ইজারা না দিয়ে শুধু শিক্ষকদের মাধ্যমে গোটা ছাত্রসমাজে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঘৃণা জাগ্রত করতে হবে। পঞ্চমত, রাজনীতিতে যে বহমান সন্ত্রাস রয়েছে, যাকে আমরা ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন’ এর অবসান হতে হবে। মনে রাখতে হবে, ছাত্রসমাজ কোনো নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দা নয়। এই সমাজেই তাদের বসবাস। এ দেশের আলো-বাতাসেই তারা মানুষ। সুতরাং রাজনৈতিক সন্ত্রাস দূর না করে, আন্তর্জাতিকভাবে আরোপিত সন্ত্রাস বন্ধ করা যাবে না। ষষ্ঠত, দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সব পর্যায়ে (মাদরাসা, ইংরেজি মাধ্যম, সাধারণ শিক্ষা) স্ব স্ব ধর্ম, নীতিনৈতিকতা ও আদর্শিক দীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সপ্তমত, সাধারণভাবে মনে করা হয়, অর্থনৈতিক সঙ্কট তথা দারিদ্র্য, জীবনযাত্রার নিম্নমান সন্ত্রাসের অন্যতম কারণ। সুতরাং সম্পদের সুষম বণ্টন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সামাজিক সুবিধার ন্যায়ানুগ অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অষ্টমত, গণমাধ্যমকে সীমাবদ্ধ না করে তাদের সৃজনশীলতা দ্বারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে হবে। নবমত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন সূচিত হতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যত দিন অশিষ্টাচার, অশোভন বাক্যালাপ, অমার্জিত ব্যবহার ও বলপ্রয়োগের নীতি কার্যকর থাকবে, তত দিন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সন্ত্রাসমুক্ত করা যাবে না। দশমত, সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশটি করতে চাই, আর তা হচ্ছেÑ বিশ্বমোড়লদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। আজকের বিশ্বে মুসলমানদের সন্ত্রাসের জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরীয়া তথা মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়ন-নির্যাতন চলছে। সভ্যতার সঙ্ঘাতের (Clash of Civilization) নামে সাম্রাজ্যবাদ যেভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদকে উসকে দিচ্ছে, তার অবসান না হলে চাপিয়ে দেয়া সন্ত্রাসের যুদ্ধের অবসান হবে না। বাস্তবতা এই যে, বাংলাদেশ একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ। এ দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে সাধারণ মানুষ ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলেন। দৃশ্যত অন্য কিছু থাকলেও এ দেশের নাগরিক সাধারণের মনস্তত্ত্বের গহিন গভীরে ধর্মানুভূতি রয়েছে। প্রচলিত সাধারণ সত্য এই যে, বাংলাদেশের মানুষ ‘ধার্মিক, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়’।
সুতরাং সন্ত্রাস নির্মূলে ‘জাতীয় ঐক্যের কর্মসূচি’র পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে এর উৎসমূল নির্ণিত হতে হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষ্যকারেরা অনেকবার মন্তব্য করেছেন, ‘ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হলে পৃথিবীর ৯০ শতাংশ সন্ত্রাসের অবসান ঘটবে।’ বাংলাদেশের সন্ত্রাস আন্তর্জাতিক পরিসরের সম্প্রসারণ মাত্র। বাংলাদেশের রাজনৈতিক এলিটরা সন্ত্রাসের নির্মূল চাইবেন আবার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের তল্পি বহন করবেন- এ দ্বৈতনীতি চলবে না। সন্ত্রাসের অবসান চাইলে বহমান বৈরী মনস্তত্ত্বের অবসানে যথার্থ ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট এবং প্রফেসর
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫