ঢাকা, শুক্রবার,২৪ মে ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

০৫ মে ২০১৭,শুক্রবার, ২০:৩০


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর বিভাজন একটি স্বীকৃত দর্শন। এ দর্শনের মূল কথা হচ্ছেÑ ক্ষমতা যদি একজন ব্যক্তির হাতে বা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত থাকে তাহলে ‘একনায়কতন্ত্র’ বা স্বৈরতন্ত্র কায়েম হতে পারে। একটা কথা আছে, ‘অ্যাবসুলুট পাওয়ার করাপ্ট অ্যাবসুলুটলি’। অর্থাৎ চরম ক্ষমতা চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে। এ সর্বাত্মক ক্ষমতা বিভাজনের ধারণার লক্ষ্য হচ্ছে, বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতার মাধ্যমে নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা করা। শাসন কাঠামোর আবর্তন-বিবর্তন শেষে রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ আইন, বিচার ও শাসনÑ এ তিনটি অঙ্গে বিভক্ত হয়েছে। সভ্যতার সুপ্রভাত থেকে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব; রাজা-বাদশাহ, সম্রাট, একনায়ক, স্বৈরশাসকেরা ক্ষমতাকে একীভূত করতে চেয়েছে। আর প্রজা বা নাগরিকসাধারণ ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে বণ্টনে প্রয়াসী হয়েছে। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। আধুনিক ইতিহাসে গণতন্ত্রের নামে শাসনক্ষমতা দৃশ্যত নাগরিকসাধারণের হাতের নাগালে এসেছে। কিন্তু বারবার ক্ষমতালোলুপ শাসকেরা কার্যত জনগণের ক্ষমতা ব্যক্তিবিশেষের হাতের মুঠোয় নেয়ার চেষ্টা করেছেন। সে কারণে ‘সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র’ বা ‘রাজকীয় রাষ্ট্রনায়ক’-এর মতো প্রত্যয়ের উদ্ভব হয়েছে। মনীষী জন লক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নির্বাহী, আইন ও যুক্তরাষ্ট্রীয়Ñ এভাবে বিভাজন করেছেন। কিন্তু তিনি এতটা জোর দিয়ে ক্ষমতার স্বতন্ত্রীয়করণের কথা বলেননি। অবশেষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মন্টেস্কু ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ বিষয়টিকে পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বে পরিণত করেন। ১৭৪৮ সালে তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য স্পিরিট অব লজ’-এ বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। লক ও মন্টেস্কু ব্রিটিশ সংসদীয় ধারার পরিপ্রেক্ষিতে ‘বিভাজন তত্ত্ব’টি প্রদান করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানপ্রণেতাদের হাতে এ তত্ত্বটি প্রায়োগিক বাস্তবতা অর্জন করে। ফেডারালিস্ট পেপারস নামে খ্যাত সাংবিধানিক দলিলপত্রে বিশদভাবে এসব বিষয় আলোচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সুস্পষ্ট করে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ নির্দেশিত হয়েছে। এগুলো হলোÑ ১. প্রেসিডেন্সি, ২. কংগ্রেস (সিনেট+হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ) ও ৩. জুডিশিয়ারি বা বিচার বিভাগ। বহু বিভাজনে বিভক্ত মার্কিন রাজ্যমণ্ডলী বা প্রদেশগুলোর ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করার জন্য জুডিশিয়ারি তথা সর্বোচ্চ আদালতকে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য বিধানের আইনগত ক্ষমতা দেয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দু’টি বিভাজনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথমত, ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার থেকে অঙ্গরাজ্যগুলো পৃথক। দ্বিতীয়ত, প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস এবং সুপ্রিম কোর্টের পারস্পরিক ক্ষমতা পৃথকভাবে চিহ্নিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য বলে থাকেন। এ তত্ত্বটিকে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিপক্ষে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পৃথিবীর সর্বত্র এ তত্ত্বটি পরবর্তীকালে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশের নাগরিকেরা ভাগ্যবান এই অর্থে যে, তাদের মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে সংবিধানের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বা সুপ্রিমেসি অব দ্য কনস্টিটিউশনের কথা বলা হয়েছে। অপর দিকে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নির্ধারণ করতে গিয়ে ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবে।’ সংবিধানের ৯৪ অনুচ্ছেদের ৪ ধারায় বলা হয়েছেÑ ‘এই সংবিধানের বিধানাবলির সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।’ কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর বিগত প্রায় ৫০ বছরে সত্যিকার অর্থে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ কোনো সরকারই সম্পন্ন করেনি। বিষয়টি জনপ্রিয় হওয়ার কারণে নির্বাচনের আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের ঘোষিত মেনিফ্যাস্টোতে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার, এ ক্ষেত্রে যতটুকু হয়েছে তা একটি অনির্বাচিত ও অপ্রত্যাশিত সরকারের পক্ষ থেকেই হয়েছে। ২০০১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ প্রেসিডেন্ট থাকাকালেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদ এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ধারণা করা হয়, আমলাতন্ত্রের কৌশলের কারণে সে সময় বিষয়টির সুরাহা হয়নি। ২০০৭-০৮ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রীকরণের আইনটি স্বীকৃত হয়। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বিষয়টিকে তার মিশন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার আইনগত বিষয়টিকে প্রায়োগিক ক্ষেত্র পর্যন্ত নিতে অনেক অদল-বদল করেছেন। মাসদার হোসেন মামলার রায় কার্যকর করতে অনেক সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি রয়েছে, যা ক্ষমতাসীন সরকার কার্যকর করছে না। নীতিগত অনুমোদন হলেও বাস্তবে যখন আইনটি কার্যকর করার পদক্ষেপ নেয়া হয়, তখন বিভিন্নপর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টের সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের মতপার্থক্য অথবা মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান সময়ে সুপ্রিম কোর্ট এবং সরকারের মধ্যে দৃশ্যমান দ্বন্দ্বের সূত্রপাত এভাবেই। বিশেষত সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি হলে বিষয়টি তিনি জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। অনেকেই মনে করেন, তিনি প্রধান বিচারপতি না হলে বিষয়টি এভাবে দৃশ্যমান হতো না। সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার বা কোর্টের এখতিয়ার সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য তার বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করছে বলে মনে হয়।


বেশ কিছু দিন ধরে বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের প্রচ্ছন্ন দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সর্বশেষ বক্তব্য প্রকাশিত হয় গত ১ মে। সংসদের সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণা করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেছেন, দুই-তৃতীয়াংশ ঐকমত্য হলেই সংবিধান সংশোধন করা যায়। শুধু দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই নন, পুরো সংসদ মিলেও যদি সংবিধান বাতিল করেন সেই ক্ষমতা তাদের আছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট যদি দেখেন এতে সংবিধানের মূল ভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকারে আঘাত হেনেছে, তাহলে সংসদের ওই সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে।’ গত ৩০ এপ্রিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে ‘ভূমি ও আইন ব্যবস্থাপনা’ বিভাগের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। প্রধান বিচারপতি আরো বলেন, আমরা যখন রায় দেই, তা যদি কারো বিপক্ষে যায় তখনই তারা এমন সব মন্তব্য করেন, যা শুনে আমাদের কষ্ট লাগে। কোনোমতেই নিজেদের সভ্য বলে দাবি করতে পারব না, যত দিন পর্যন্ত না আমরা সংবিধান ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারব। সেটা যদি আমার বিরুদ্ধেও যায় তা মাথা পেতে নেব। আইনের ব্যাখ্যা দেয়ার অধিকার সংবিধান সুপ্রিম কোর্টকে দিয়েছে, আর কাউকে তা দেয়া হয়নি। আর এ সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য সময় সময় সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। এটিকেও মানতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, পৃথিবীর উন্নত দেশে এমনকি ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিচারপতিরা নিয়মিত লেকচার দিয়ে থাকেন। তাদের বক্তব্য পত্রিকায় বের হয় না। আপনাদের প্রধান বিচারপতির বক্তব্য পত্রিকায় বের হয়। তার কারণ একটাই, আমরা সেই পর্যায়ে যেতে পারিনি।’ এস কে সিনহা বলেন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল তো অনেক ওপরে এমনকি পাকিস্তানের মতো দেশেও উচ্চ আদালতের নিয়ন্ত্রণে নি¤œ আদালত। পৃথিবীর অনেক দেশেই এটি বহাল আছে। কিন্তু সেটি আমরা এখনো করতে পারিনিÑ এ জন্য প্রধান বিচারপতি কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি নিশ্চিত করেন, ভবিষ্যতে সংবিধানের কোনো বিধান বা অন্য কোনো আইন সংবিধানের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হলে তা বাতিল করতে সুপ্রিম কোর্ট পিছপা হবে না।’ প্রধান বিচারপতির বক্তব্যটি আরো দীর্ঘ। সঙ্গতভাবেই বোঝা যায়, এটি সরকারের কার্যক্রমের বিষয়ে তার পরোক্ষ উত্তর।
প্রধান বিচারপতির এ ধরনের বক্তব্য নতুন নয়। কয়েক দিন আগে তিনি অভিযোগ করেছিলেন ‘কিছু দিন আগে সরকার বিচার বিভাগসংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিচার বিভাগের অভিভাবক হিসেবে প্রধান বিচারপতিকে কোনো কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি।’ এর আগে নি¤œ আদালতকে নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশনা চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব প্রেরণ করেছিলেন। এ ছাড়া নি¤œ আদালতের কিছু বিচারকের বদলির বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয় নাকচ করে দিয়েছে। প্রধান বিচারপতি অভিযোগ করেন, সম্পূর্ণ ভুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সরকারপ্রধানের কাছে সত্য গোপন করে সিদ্ধান্তগুলো হাসিল করা হয়েছে। অপর দিকে বলা হচ্ছে, সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে দূরত্ব তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে একটি মহল। ইতোমধ্যে সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা প্রধান বিচারকের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। একজন মন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে ‘বেশি কথা বলা’র জন্য অভিযুক্ত করেছেন। প্রধান বিচারপতি এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের মধ্যে নেতিবাচক বাক্য বিনিময় হয়েছে। অপর দিকে, প্রধানমন্ত্রী সমন্বয়মূলক বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, ‘ক্ষমতা কারো কিন্তু কম নয়।’
উল্লেখ্য, সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে ‘শীতল যুদ্ধ’ শুরু হওয়ার কারণ রয়েছে। তা হলো : ক. বিচার বিভাগ বিচারপতি অপসারণসংক্রান্ত ১৬তম সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাব বাতিলের মতো মাইলফলক রায় দিয়েছে। খ. দু’জন মন্ত্রীকে আদালত অবমাননার দায়ে দণ্ড দিয়েছে। গ. হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগের জন্য প্রধান বিচারপতির সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে। ঘ. জনস্বার্থে অসংখ্য বিষয়ে সরকারকে নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট। ঙ. কোনো কোনো রায় বা জামিন আদেশ সরকারের স্বার্থ বা ইচ্ছার বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। চ. কয়েকটি সিটি করপোরেশনের মেয়রের বরখাস্ত আদেশ বাতিল করে পুনর্বহালের আদেশ দিয়েছে। ঝ. নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। ঞ. অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য নিয়ে সরকারের সাথে বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ করে ১৬তম সংশোধনীর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ রায়ের এক অংশে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ‘ওই অনুচ্ছেদের কারণে দলের সংসদ সদস্যরা হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারেন না। রায়ে আরো বলা হয়, বিভিন্ন উন্নত দেশে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে আমাদের দেশের সংসদ সদস্যদের দলের অনুগত থাকতে হয়। বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তারা দলের বাইরে যেতে পারেন না। রায়ে বলা হয়, এই সংশোধনী থাকলে বিচারপতিদের সংসদ সদস্যদের করুণার প্রার্থী হয়ে থাকতে হবে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করে।’
পৃথিবীর তাবৎ বিচারব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথমত, বিচার বিভাগ কমবেশি নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র ও সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আইন বিভাগের গৃহীত ব্যবস্থাদি ও আইন পর্যালোচনার অধিকার বিচার বিভাগের রয়েছে। তৃতীয়ত, নির্বাহী বিভাগের যেকোনো সিদ্ধান্তকে বাতিল বা পর্যালোচনার অধিকার বিচার বিভাগের রয়েছে। চতুর্থত, বিচার বিভাগের অন্যদের থেকে পৃথক ঐতিহ্য, সম্মান, সুবিধা ও স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি রয়েছে। সে ধারায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদার প্রশ্নে নাগরিক সাধারণের সচেতনতা ও ঐকমত্যের প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবেই আইনজীবীদের আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার রক্ষক এবং আইনের শাসনের ধারক বলে বিবেচনা করে থাকি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সুপ্রিম কোর্টের মতো মর্যাদাপূর্ণ স্থানেও দলীয় মানসিকতাদুষ্ট মতামত ও কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের সাথে সরকারের যে দ্বন্দ্ব, তা কোনো ব্যক্তিগত, স্বার্থগত ও দলীয় বিষয় নয়। নাগরিক সাধারণের মৌলিক স্বাধীনতার সপক্ষে যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান, তাই জনস্বার্থেই বিচারালয়ের প্রতি সচেতন সব মানুষের স্বাভাবিক সমর্থন প্রত্যাশিত।

লেখক : প্রফেসর, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫