ঢাকা, শুক্রবার,২৪ মে ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

বেগম জিয়ার ভিশন ২০৩০

নতুন ধারার রাজনীতির রূপকল্প

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

১২ মে ২০১৭,শুক্রবার, ২০:২৯


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

 

বাংলাদেশ তথা তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক ধারায় চিরায়ত গতানুগতিক ধারা বিদ্যমান। এসব দেশের বেশির ভাগই ঔপনিবেশিক শক্তি দিয়ে শাসিত হওয়ার কারণে সে উত্তরাধিকার এখনো বহমান। সেখানে পক্ষ-বিপক্ষ, সখ্য-বৈরিতা এবং উত্থান-পতন একই ধারায় গ্রথিত। বাংলাদেশের প্রায় ৫০ বছরের রাজনীতিতে এক দলতন্ত্র, সামরিক তন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের অদল-বদল হয়েছে, কিন্তু রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি। কথিত স্বৈরতন্ত্রের লৌহ বিধান (Iron Law of Oligarchy) থেকে অথবা নিজ বলয়ের বাইরে এসে কেউ ক্ষমতা বিভাজনের কথা বলেনি। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সেই গতানুগতিকতার বাঁধ ভাঙলেন। সুশীলসমাজের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করছেন এবং সৎ সাহসের সমালোচনা করছেন, কিন্তু নাগরিক সাধারণ সন্তুষ্ট এই দেখে যে, তিনি এত দিনের গতানুগতিক রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে এসে নতুন ধারার রাজনীতির রূপকল্প উপস্থাপন করেছেন। সেই প্রস্তাবনায় যেমন দীর্ঘ জনকল্যাণের পরিকল্পনা আছে, আরো আছে প্রচ্ছন্ন আত্মসমালোচনা এবং নতুন প্রজন্মের আহ্বান। আছে ‘জনগণের হাতে মালিকানা ফিরিয়ে দেয়ার প্রত্যয়’। ভিশন-৩০ এর মূল বক্তব্য মূলত দেশে হৃত গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতিতে পরিপূর্ণ। এ ভিশনে স্পষ্ট করে বলা হয়- ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন ও গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়ন শ্রেয়- এ অজুহাতে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা জনগণকে সাথে নিয়ে বিএনপি প্রতিহত করবে।’

ভিশন-৩০এর পটভূমি : নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো তার মিশন ও ভিশন নিয়ে তৎপর হবে এটাই স্বাভাবিক। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৮-এর শেষে অথবা ২০১৯-এর শুরুতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। সরকারি দল অনেক আগেই মাঠে নেমেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রীতিমতো জনসভা করে বেড়াচ্ছেন। এমন কোনো অনুষ্ঠান নেই যেখানে তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচনের কথা আনছেন না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বৈকূল্যের কারণে সরকারি দলে মনস্তাত্ত্বিক হতাশা রয়েছে। এরা ভালো করে জানেন যে, তারা সত্যিকার অর্থে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হননি। অপর দিকে ওই নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেয়ার ফলে সেখানেও এক ধরনের হতাশা বিরাজ করছে। বিগত কয়েক বছরে শাসক দলের পক্ষ থেকে বিএনপির ওপর যে অন্যায়-অনাচার, নিপীড়ন-নির্যাতন চলেছে তাতে বিএনপির অবস্থা নাজুক। কিন্তু নীরব বিপুল জনগোষ্ঠী বিএনপির সমর্থনের শক্তি ও সমর্থনের ভিত্তি। ক্রমে সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের ঘর গুছিয়ে নিচ্ছে তারা। সুতরাং সমাগত নির্বাচন বিএনপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সমাধান সুদূরপরাহত হওয়া সত্যেও বিএনপি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিছু শর্ত সাপেক্ষে ৩০০ আসনে ৯০০ প্রার্থীর কথা বলে কার্যত নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা বলেছেন। বিএনপির চেয়্যারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১০ মে ২০১৭ তারিখে বহুল প্রত্যাশিত ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করে নির্বাচনমুখী দল হিসেবে বিএনপির সদিচ্ছা ও সম্ভাবনার কথা জানান দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অবশ্য খালেদা জিয়ার এই ইতিবাচক বক্তব্যকে চিরাচরিত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছে।

নতুন ধারার রাজনীতির আহ্বান : বেগম জিয়ার পুরো বক্তব্যটি যদি নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে স্বীকার করতেই হবে যে, এতে একটি নতুন ধারার রাজনীতির আহ্বান রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি বলে আসছিল, দেশের দুটো প্রধান দল আসলে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কয়েক দশক ধরে গণতান্ত্রিক সময়কালকে বিশ্লেষণ করলে তাদের এ বক্তব্য উড়িয়ে দেয়া যায় না। আওয়ামী লীগের গত ৮ বছরে রাজনৈতিক ভিন্নমত দলনের কারণে সিভিল সোসাইটি অনেক দুর্বল হলেও তাদের এ বোধটি টনটনে রয়েছে যে, এ দুই দল দিয়ে ভালো কিছু আসা করা যায় না। বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় ইতোমধ্যে অনুভূত দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় এবং সংবিধানে এককেন্দ্রিক ক্ষমতার বিন্যাসের কারণে অনেকেই ছিলেন হতাশ। ক্ষমতার ভারসাম্য বিধানে উত্তরাধিকার রাজনীতির কেউ সংস্কারের কথা বলবেন- এটা ছিল বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু বেগম জিয়ার ভিশন-৩০এ সেই বিস্ময়ের প্রকাশ ঘটেছে। সে ক্ষেত্রে বেগম জিয়ার ভাষণটি যুগান্তকারী বলা যায়। ভাষণটি সুলিখিত, সুদীর্ঘ ও সর্বব্যাপী। এ ভাষণে এমন কোনো বিষয় বাদ যায়নি, যা আমাদের সমাজে দৃশ্যমান নয়।

ক্ষমতার ভারসাম্য : ভিশন-৩০এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য বিধানে সাংবিধানিক সংশোধনের প্রস্তাবনা। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের বড় একটি কারণ হচ্ছে ‘ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন’। মজার ব্যাপার হচ্ছে- যারা যখনই ক্ষমতায় যান তখন তারা ক্ষমতার সপক্ষেই থাকেন। সামরিক সমর্থিত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেশ জোরেশোরেই বিষয়টি আলোচিত হচ্ছিল। যেহেতু বিষয়টি সাংবিধানিক, সে জন্য অন্য বিষয়ের মতো চট করে কোনো অধ্যাদেশ বা আদেশের বলে এটি সংশোধন করা যায়নি। ওই সরকার এ বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের চেষ্টা করেছিল। প্রধান দু’টি দল তাদের এ চেষ্টাকে যথার্থভাবেই অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রাসঙ্গিক ও অনর্থক বিবেচনা করেছে। এ সংশোধনীর প্রস্তাব অজনপ্রিয় সরকার এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও বিষয়টি ছিল জনপ্রিয়। মনে মনে বাংলাদেশের তাবৎ সচেতন মানুষ এ সংশোধনীর পক্ষেই মতামত পোষণ করে। বেগম জিয়া তার প্রস্তাবনায় বলেন, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়নে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রেসিডেন্ট পদটি অলঙ্কারিক মাত্র। দীর্ঘ ৪৫ বছরের শাসন অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রী কারো হাতেই কেন্দ্রীভূত হওয়া যৌক্তিক নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব, সামাজিক অস্থিরতা ও প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সেই বহুল উচ্চারিত প্রবাদ ‘সার্বিক ক্ষমতা সার্বিকভাবেই ব্যক্তিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে’। সে ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য একটি অনিবার্য বিষয়। দক্ষিণ এশিয়া বা সার্কভুক্ত দেশগুলোতে এ ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপালের সাম্প্রতিক প্রণিত সংবিধানের কথা বলা যেতে পারে। ভারত একটি ফেডারেশন এবং পার্লামেন্টারি সরকার শাসিত হওয়ার কারণে প্রেসিডেন্ট পদটি আনুষ্ঠানিক হওয়াই স্বাভাবিক। বেগম খালেদা জিয়া সত্যি সত্যি যদি কাজটি করতে পারেন তাহলে তিনি একজন বৈপ্লবিক কাজ করবেন। এ জন্য তিনি বাংলাদেশে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বলা বাহুল্য, এটি নির্ভর করছে আগামী নির্বাচনে বিএনপি এবং তার সমমনা দলগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ওপর। সবাই বোঝে যদি আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোট দেয়ার ক্ষমতা থাকে তাহলে পরিবর্তন অনিবার্য। আর বাংলাদেশের মানুষ যারে দেয় তারে উজাড় করে দেয়। এ কথা যদি সত্যি হয় তাহলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন অসম্ভব হবে না। এখনই যদি জনমত যাচাই করা হয় এবং নিশ্চয়ই কোনো সংবাদপত্র তা করবে- তাহলে দেখতে পাবেন শতকরা ৯০ ভাগ লোক এ সংশোধনীকে সমর্থন করবে।

সংসদীয় সংস্কার : সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিজ্ঞজনচিতভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কারের কথা বলেছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি ‘স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক’ জন্ম দিয়েছে বলে মন্তব্য করে অঙ্গীকার করেন যে, ‘ক্ষমতায় গেলে বিদ্যমান অবস্থার অবসানকল্পে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে।’ তিনি বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করেÑ জনগণ সব উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। যেসব বাধা জনগণের মেধা, শ্রম, উদ্যোগ ও উৎসাহ দমিয়ে দেয় তা দূর করে বাংলাদেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও আধুনিক মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে ভিশন-২০৩০ প্রণয়ন করা হয়েছে। তার একটি প্রস্তাব অভিনবত্বের দাবি রাখে। এটি হচ্ছে জাতীয় সংসদের ‘দ্বিকক্ষে’ উন্নীতকরণ। বিষয়টি এত দিন জাসদ, বাসদ ও বামদের দাবি ছিল। বিএনপির মতো বড় দলের এ প্রস্তাবে অনেকেই হকচকিত হয়েছেন। প্রস্তাবনাটির ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি, তবে সাধারণ জ্ঞান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, রাজনৈতিকভাবে নানা মত ও নানা দলের তথা পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তির জন্য এ প্রস্তাবটি করা হয়েছে, যা পৃথিবীর উন্নত গণতন্ত্রে রয়েছে। ভারতেও পার্লামেন্টে উচ্চকক্ষ রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনে আগের দিন প্রভাবশালী দৈনিকগুলোতে খবর বেরিয়েছিল যে, বিএনপির নীতিনির্ধারক মহলে এ নিয়ে বড় ধরনের বিভক্তি রয়েছে। তাদের যুক্তি হচ্ছেÑ এতে বিভক্তি, কোন্দল আর বাড়বে বৈ কমবে না। আরো বলা যায়, বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সাথে এটি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা হয়তো বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চকক্ষকে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় মনে করবে। যা হোক বিএনপি প্রস্তাবটিকে পরীক্ষামূলক বলেই অভিহিত করেছে। জনমত যাচাই এবং বিজ্ঞজনদের পরামর্শের ভিত্তিতে বিষয়টি সংযোজিত অথবা বিয়োজিত হতে পারে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা : বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীনদের মাধ্যমে সংশোধিত সব বিষয়ই পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। এর মধ্যে যে সংশোধনীটির কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে সব দুর্যোগ নেমে এসেছে তা হচ্ছে ১৫দশ সংশোধনী। এ সংযোজনীর মাধ্যমেই বিরোধী আওয়ামী লীগের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সরকার সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির বিপুল জয় লাভের পর যখন ক্ষমতাসীন সরকার নিশ্চিত হয়, তারা সম্পূর্ণভাবে জনগণের আস্থা হারিয়েছে; তখন তারা তাদের দাবিকৃত ‘তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা’ বাতিল করে। সম্প্রতি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সে ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার প্রকারান্তরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রস্তাব যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। জনমনে এ নিয়ে নানা বিভ্রান্তি রয়েছে। বেগম জিয়ার এ প্রস্তাবনা তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে তাদের দৃঢ়তার প্রমাণ রাখে। ক্ষমতাসীন সরকার সংসদীয় রীতিনীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। এমনকি তারা ’৭২-এর সংবিধান সংশোধনে স্বীকৃত গণভোট ব্যবস্থা রহিত করে। সংসদীয় রাজনীতির প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে যথার্থভাবে শামিল করার প্রস্তাব রেখেছেন।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা : শাসক দল রাষ্ট্রীয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের পর হাত দেয় বিচার বিভাগের প্রতি। বিচারকদের অভিশংসন বা অপসারণের ক্ষমতা ইতঃপূর্বে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ছিল। তারা ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে এ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত করার জন্য বিধান প্রণয়ন করে। অবশ্য হাইকোর্ট পরবর্তীকালে এই সংবিধান সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে। এ নিয়ে বর্তমানে নির্বাহী বিভাগ বনাম বিচার বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্ব তুঙ্গে। খুব সঙ্গতভাবেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিষয়টি পর্যালোচনান্তে সিদ্ধান্ত নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নীতিবোধ, দেশপ্রেম, বিচারবোধ ও সুনামের কঠোর মানদণ্ডে যাচাই করে সব আদালতের বিচারক নিয়োগ দেয়া হবে। যোগ্যতা, মেধা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংবিধানের আলোকে বিচারপতি নিয়োগের সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও মানদণ্ড সংবলিত আইন প্রণয়ন করে বাছাই কমিটি ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। অধস্তন আদালতকে নির্বাহী বিভাগের আওতামুক্ত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় স্থাপন করা হবে।

সুশাসন : বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় সবচেয়ে যে বিষয়টির অভাব অনুভূত হয় সেটি হচ্ছে ‘সুশাসন’। মানুষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর শাসন চায় না, চায় ‘আইনের শাসন’। জনগণ উন্নয়ন চায়, কিন্তু তা সুশাসনের বিনিময়ে নয়। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এ সবই সুশাসনের লক্ষণ। বেগম খালেদা জিয়া দৃঢ়তার সাথে সুশাসন, সুনীতি ও সুসরকার ‘থ্রি জি’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক সৃষ্টির জন্য জাতিগঠন প্রয়াসের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। সুশাসনের জন্য তিনি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক দক্ষতা, রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে আরো বলেন, ইতঃপূর্বে রাজনৈতিক বিভাজনের নামে যে রক্তক্ষরণ বা যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে তার তিনি অবসান ঘটাতে চান। অনেকেরই মনে থাকার কথা যে, ২০০৭ থেকে এ পর্যন্ত (২০১৭) বিএনপি অব্যাহতভাবে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি মোকাবেলা করে এসেছে। কারো কারো মনে এ ধারণা থাকতে পারে যে, বিএনপি যদি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসে তাহলে তারাও প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের ব্যবস্থা নেবে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের নিরন্তর নিপীড়নের কারণে বিএনপির সাধারণ পর্যায়ে এ ধরনের ইচ্ছা পোষণ অস্বাভাবিক নয়। তাই বিষয়টি যাতে কোনো দল বা গোষ্ঠীকে ভীত না করে বা তারা যাতে দেশ ছেড়ে না পালায় সে জন্য বিএনপি নেত্রী আগাম ক্ষমার ঘোষণা দিলেন। তিনি হিংসা-প্রতিহিংসামুক্ত এক নতুন সামাজিক চুক্তির কথা বললেন।

নৈতিকতার শক্তি পুনরুদ্ধার : সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে নৈতিক মূল্যবোধের ভয়াবহ অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এর ফলে সমাজে অস্থিরতা ও নৈরাজ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিএনপি গণমাধ্যম, অ্যাকাডেমিক কারিকুলাম, সঠিক ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা এবং ইতিবাচক সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রতিরোধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধের নিদারুণ অবক্ষয়ের মনবেদনার কথা বলেন। তিনি তরুণদের মানবিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কার্যব্যবস্থার কথা বলেন। তিনি যুবসমাজকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য ছাত্রসংসদ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেন।

সামাজিক নিরাপত্তাবলয় : ২৫৬ দফা বিশিষ্ট দীর্ঘ ভাষণটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার সুযোগ সীমিত। তার বক্তৃতা যারা দেশকে ভালোবাসেন নিঃসন্দেহে তাদের ভালো লাগবে। বিশেষ করে তরুণসমাজ উজ্জীবিত হবেন। বর্তমান মেধাবী প্রজন্মের মনে নিয়োগ ক্ষেত্রে কোটার বিরুদ্ধে যে নীরব বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার সব ধরনের কোটা উঠিয়ে দেয়ার ঘোষণায় তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন। পাশ্চাত্যের কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণায় বেকার যুবক ও দেশের সিনিয়র নাগরিকদের জন্য তিনি ভাতার ঘোষণা দিয়েছেন। সমাজের দুস্থ, দরিদ্র ও হতভাগ্য মানুষের জন্য তিনি ‘সামাজিক নিরাপত্তাবলয়’ প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা করেছেন। সর্বক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে বেতনভাতা পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন। তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেবা, পরিবেশ রক্ষা, খাল খনন, নদীর নাব্যতা বাড়ানো প্রভৃতি সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি নেয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ ছাড়া তিনি ক্ষুদ্র পাহাড়ি গোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য অধিদফতর প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।

প্রশাসনিক সংস্কার : তিনি পুলিশের নিরপেক্ষতা, আমলাতন্ত্রের সক্ষমতা, দুর্নীতি রোধ, সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করার কথা বলেন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিরসনের কথা বলেন। এ ছাড়া তিনি স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধীদের অনৈতিক বরখাস্ত ও অন্যায় নির্যাতন না করার প্রতিশ্রুতি দেন। দৃশ্যত বর্তমান সরকারের অনুরূপ ব্যবহারের বিপরীতে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দিলেন। বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের কথা বলেন। এ ছাড়া তিনি প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র প্রভৃতি বিষয়ে তার ভবিষ্যৎ সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করেন।

প্রতিক্রিয়া : সিভিল সোসাইটির বেশির ভাগ সদস্য বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-৩০কে ইতিবাচক বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। গরিষ্ঠ অংশ সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবনাকে সাধুবাদ জানাবে। অন্যেরা বলেন, প্রস্তাবনাটিতে নতুনত্ব না থাকলেও এটি ইতিবাচক। তবে অনেকে এ ভিশনের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। কেউ বা প্রশ্ন তোলেন যে, ক্ষমতায় থাকাকালে কেন তারা এসব প্রস্তাবনা বিবেচনা করেননি। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ ভিশনকে ‘ফাঁকা প্রতিশ্রুতির ফাঁপা বেলুন’ বলে অভিহিত করেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বেগম জিয়ার ভাষণ পরবর্তী তাৎক্ষণিক মন্তব্যে ভাষণটিকে তামাশা, প্রতারণা ও অসার প্রলাপ ইত্যাদি অভিধায় অভিযুক্ত করেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভিশন-৩০কে আওয়ামী লীগের কর্মসূচির নকল বলে অভিযোগ উত্থাপন করেন।
বেগম খালেদা জিয়া এতসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে এটি বাস্তবায়ন খুব সহজ হবে না। তিনি নিজেই তা স্বীকার করে বলেন, ‘এটি কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়’। সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে তিনি নাগরিক সাধারণের সতত সহযোগিতা কামনা করেন। যেকোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি সফলতা তার নেতাকর্মীদের ভূমিকার ওপর নির্ভর করে। নিঃসন্দেহে বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণ কর্মী সাধারণকে উজ্জীবিত করবে। বাস্তবিক পক্ষে এই উচ্চাভিলাষী ভিশন-৩০ এর যদি বাংলাদেশের মাটিতে বাস্তবায়নের সুযোগ আসে অর্থাৎ বিএনপি যদি আগামী নির্বাচনে সরকার গঠনের সুযোগ পায়, তাহলে তা প্রকৃতপক্ষেই জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের সহায়ক হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫