ঢাকা, শুক্রবার,২৪ মে ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

ঘোষিত রোডম্যাপ ও নির্বাচনকালীন সরকার

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

২৬ মে ২০১৭,শুক্রবার, ২১:১৬


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

দৃশ্যত বিষয়টি ইতিবাচক। অদৃশ্যে নেতিবাচক অনেক কিছু থাকতে পারে। ইতিবাচক লোকেরা সব কিছু ইতিবাচকভাবেই দেখে। আর নেতিবাচক লোকদের কাছে ‘সকলই গরল ভেল’। এই প্রথম একটি নির্বাচন কমিশন একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিল্পনা ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনপ্রক্রিয়া শুরু করেছে। রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। রাজনীতির সরকারি অংশ বলছে খুব ভালো। বিরোধীরা বলছে ‘ডাল মে কুচকালা হ্যায়’। ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন করতে চায়। যদিও তাদের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় আছে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ১৫শ সংশোধনী অনুযায়ী একটি সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের তিন মাসের মধ্যেই নির্বাচনের ব্যবস্থা রয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন। দুষ্টু লোকেরা বলে থাকে, কোনো মতেই যাতে ক্ষমতা ফসকে না যেতে পারে সে জন্যই ওই বিধিব্যবস্থা। ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের আগাম নির্বাচনেরও প্রস্তুতি রয়েছে। তারা হয়তো ‘কর্তার ইচ্ছায় কীর্তন করতে চায়’।
নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপে সাতটি বিষয় রয়েছে। এগুলো হলো- ১. অর্থ ও পেশিশক্তির অবৈধ ব্যবহার মুক্ত নির্বাচন। ২. সব রাজনৈতিক দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। ৩. সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোগুলো সংস্কার। ৪. নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ। ৫. সুশীলসমাজের মতামত গ্রহণ। ৬. নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সহজ সরল এবং আরো যুগোপযোগী তৈরি করা। ৭. সংসদীয় এলাকার ভোটার সংখ্যায় যথাসম্ভব সমতা রেখে ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ। নির্বাচন কমিশন শুধু বিষয়াবলি নির্ধারণ করেই শেষ করেনি বরং প্রতিটি বিষয়ের জন্য তারা সুনির্দিষ্ট সময় রেখা বেঁধে দিয়েছে। আইনি সংস্কারের কাজগুলো জুলাই থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া সহজকরণের কাজগুলো এ বছরের জুলাই থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হবে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজ, সাংবাদিক, নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করা হবে জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে। রোডম্যাপের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিবন্ধিত দলগুলোর সাথে একবারই সংলাপ করা হবে। আসন পুনর্গঠনের কাজটি এ বছরের আগস্টে শুরু হবে। শেষ হবে আগামী বছরের এপ্রিলে। এতদ্দেশ্যে একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শুরু হবে এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। এই প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী বছরের জুনে মুদ্রণকাজ শেষ করা হবে। এরপর যাতায়াত সুবিধা ও ভোট গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধাসহ আইন অনুযায়ী ভোটকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হবে আগামী বছরের জুনে এবং তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনসহ দলের তালিকা প্রকাশ করা হবে ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ কাজ হচ্ছে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সক্ষমতা বাড়ানো। এই সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা ২০১৮ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে ভোট গ্রহণের আগে পর্যন্ত চলবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা গত ২৩ মে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয়ে ঘোষণা দেন।
আগাম নির্বাচন সম্পর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ৯০ দিন আগে সংসদ ভেঙে দেয়া হয়। এটা নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার ওপর। প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা করলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দেয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। এটাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন’ বলে থাকেন। উন্নত গণতন্ত্রে কোনো বিশেষ ইস্যু বা গুরুতর সঙ্কট সৃষ্টি হলে আগাম নির্বাচন দেয়া হয়। যেমন ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কিত ‘ব্রেক্সিট’ বিষয়ে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘোষণা করেছেন। যা হোক বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে উন্নত দেশের সংস্কৃতি দুরাশা মাত্র। তবে সুবিধাবাদের সংস্কৃতি তো বাংলাদেশে বহাল রয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন ক্ষতমাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনের জন্য একটি সুবিধাজনক দিনক্ষণ খুঁজছে। বর্তমানে তথাকথিত উন্নয়নের গণতন্ত্র কার্যকর রয়েছে। প্রশাসনসহ সর্বত্র ‘গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহ কাঠামো’ বহাল রয়েছে। একরকম বিরোধী দলবিহীন অবস্থায় খোলা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহল মনে করে ‘এখনই সময়’। তারা সতর্কতার সাথে ‘কচ্ছপ কৌশল’ অবলম্বন করছে। কচ্ছপ কৌশলে মর্মার্থ হলো সুযোগ বুঝে মাথা বের করা আর অসুবিধা দেখলে গুটিয়ে নেয়া।
পাঠক সাধারণ নিশ্চয় লক্ষ করেছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনী হাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। জনসভা থেকে শুরু করে প্রার্থী নির্বাচন পর্যন্ত তারা এগিয়েছে। এই হাওয়ায় বিএনপি যখন তাল মেলাতে গেছে বা তারাও নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছে, তখন শুরুতেই আওয়ামী লীগের বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণার পরে বিএনপির ওপর নতুন করে হামলা শুরু হয়েছে। বিএনপিকে ১ মে শ্রমিকসভা করার অনুমতি দেয়া হয়নি। অধিকন্তু বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে রাজনৈতিক সৌজন্য অতিক্রম করে পুলিশি তল্লাশি হয়েছে। এ জন্য বিএনপিকে অবহিতকরণ বা তাদের অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি শাসক মহল। কিন্তু তল্লাশির ফলাফল শূন্য। কিছুই পায়নি তারা। আওয়ামী লীগের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, গোয়েন্দা সংস্থার গোপন খবরের ভিত্তিতে তল্লাশি চালানো হয়েছে। এ জন্য উন্নত গণতন্ত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হতো। বিএনপির তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ‘ভিশন ২০৩০’-এর কর্মকৌশল এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানার জন্যই এই অভিযান পরিচালিত হয়। সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন, এর চেয়েও শতগুণ হালকা ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’র জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। ঘটনাটি ছিল ওয়াটারগেট নামে অভিহিত ভবনে বিরোধী পক্ষের তথ্য সংগ্রহের জন্য গোপন টেপ স্থাপন। এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো দূরের কথা, যে কারণে সরকার একরকম বিব্রত হলো (যদিও তারা বিব্রতবোধ করছেন না) সেই এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো কি না তাও দেশবাসী জানতে পারেনি। ক্ষমতাসীন দল সৌজন্যসূচক দুঃখ প্রকাশ করেনি।
নির্বাচনী কথায় ফিরে আসি। একটি টকশোতে একজন বিদগ্ধ দর্শক আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, নির্বাচনী রোডম্যাপের অর্থ কি এই যে, তারা সরকার থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের গোপন বার্তা পেয়েছেন? তার আরো জিজ্ঞাসা বাংলাদেশের সংবিধান এবং বিধিব্যবস্থা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন কি স্বাধীনভাবে নির্বাচনী কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে? সবাই বোঝে কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন দিনক্ষণ ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা বিগত ৪৬ বছরে নির্বাচন কমিশন কোনো ঘোষণা দিতে পারেনি। সরকারের ওপর কমিশনের সর্বাংশে নির্ভরতা সাংবিধানিক নয়। বরং ক্ষমতাকেন্দ্রিক। ক্ষমতার ‘শ্রী আংটি’ যাদের হাতে, নির্বাচন কমিশন তাদের আজ্ঞাবহ। এবার নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে মানুষের অনেক আশা-ভরসা। এখন পর্যন্ত দৃশ্যত নির্বাচন কমিশন জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার ধারক হিসেবে কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইভিএম ব্যবহারে আওয়ামী লীগ তারস্বরে তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা স্পষ্টতই বলেছেন রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া তারা ইভিএম ব্যবহার করবেন না। তবে কমিশন কতটা এ ব্যাপারে চাপকে অগ্রাহ্য করতে এবং গৃহীত সিদ্ধান্তে কতটা অনঢ় থাকতে পারবেÑ ভবিষ্যৎই তা বলবে।
নির্বাচনের ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচন প্রক্রিয়া। ভোটারবিহীন যে নির্বাচনী কারসাজি বা প্রকৌশল সৃষ্টি হয়েছে, তা অগ্রাহ্য করে সাধারণ মানুষের জন্য ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকালীন সময়ে কী ধরনের সরকার থাকবে বা কাদের নির্দেশে নির্বাচন সম্পন্ন হবে সেটি স্থির করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে নির্বাচন কমিশন বিকল্প সরকার হিসেবে কাজ করলেও এ দেশে সেটি সম্ভব নয়, বাস্তব ঘটনাগুলো তার প্রমাণ। এ দেশের নির্বাচন কমিশন ভারতের সাকসিনার মতো সাহস দেখাতে পারবে না। এটাই বাস্তব। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সরকারব্যবস্থার ধরন নিয়ে কথা বলাও সঙ্গত নয়, তার কারণ বিষয়টি তাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়। তবে তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ সবাই বলছে, তত্ত্বাবধায়ক ধরনের সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। শাসকদল বলছে, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পৃথিবীর সব দেশেই নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারের ধরন-ধারণ অন্যরকম থাকে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ২০১৪ সালের ‘অবৈধ’ নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী নিজেই মন্ত্রিসভাকে সঙ্কুচিত করেছিলেন। সুতরাং নীতিগতভাবে বিষয়টি তিনিও অনুধাবন করেন। এখন কিভাবে তা সম্ভব তা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে ‘নির্বাচনকালীন সময়ের সরকার’ টার্মটি ব্যবহার করছে। তাদের নমনীয়তা দৃশ্যমান। অনেকে ‘জাতীয় সরকার’ ব্যবস্থাকে সহজতর মনে করছে। সরকার যেহেতু দেশটি পরিচালনা করছে, দায়দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়। বিএনপির কৌশলগত ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে তথাকথিত সামরিক সমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সরকার অহরহ বলছে তারা দেশের ভালো করছে। জনগণের প্রত্যাশা, নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়েও তারা ভালোর দিকে এগোবেন। তার কারণ ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫