ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মাহে রমজান

পথচারীদের জন্য ইফতার সাজিয়ে বসে থাকেন এই গ্রামের বাসিন্দারা

সাবরিনা সোবহান

০৮ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১২:১৯ | আপডেট: ০৯ জুন ২০১৭,শুক্রবার, ১৫:৪৫


প্রিন্ট

 অতিথিদের জন্য ইফতার সাজাতে ব্যস্ত আল-নুবার এক বাসিন্দা

 

সুদানের আল-নুবা গ্রাম। এই গ্রামে পবিত্র রমজান মাসের বিকেল অন্য সময়ের চেয়ে ভিন্ন। সূর্য হেলে পড়তেই তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন বাড়ির উঠানে গালিচা বিছাতে।

পুরো উঠানজুড়ে গালিচা বিছানোর পর শুরু হয় ইফতার সাজানোর পালা। ভিন্নস্বাদের পানীয় আর সবজি-গোস্ত ও বিশেষ ধরণের কেক দিয়ে সাজানো হয় বড় বড় থালা।

এর পর বাসিন্দারা ছুঁটতে থাকেন প্রধান সড়কের দিকে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা সড়কের মাঝখানে গিয়ে যানবাহন থামাতে থাকে।

একজন গিয়ে বাস থামান তো, আরেকজন গিয়ে বাসের ড্রাইভারকে গাড়ি পার্ক করার জায়গা দেখিয়ে দেন। আর একজন যাত্রীদের ইফতার মাহফিলের জায়গার পথ দেখান।

 

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কের মাঝখানে দাড়িয়ে বাস থামাচ্ছেন এক বাসিন্দা

 

আকস্মিক ঘটনায় পর্যটকরা আশ্চর্য হলেও পরে আসল ঘটনা বুঝতে পারেন।

কারণ বাস থামতেই বাসিন্দারা বলতে থাকেন, 'ভাইয়েরা ইফতারের সময় হয়েছে। আসুন আমাদের সাথে ইফতার করুন।'

ইফতারের সময় যত ঘনিয়ে আসতে থাকে আল-নুবার বাসিন্দাদের অস্থিরতাও বাড়তে থাকে।

পর্যটক ও পথচারীদের সেবায় যেন কোনো ত্রুটি না হয়।

 

গালিচায় ইফতার সাজাচ্ছেন বাসিন্দারা

 

সম্মানের সাথে তাদের ইফতার বিছানো গালিচায় বসানো, তাদের সামনে ইফতার দেয়া- সবই চলতে থাকে শৃঙ্খলার সাথে।

ইফতারের ২০ মিনিট পর পর্যটক ও পথচারীদের সম্মানের সাথে আবার বাসে তুলে দেয়া হয়।

পর্যটকরা বুঝতে পারেন, মুসলমানদের কাছে পবিত্র রমজান শুধু সংযমের মাস-ই নয়, প্রার্থনা, দান আর ক্ষমার মাসও।

সাধারণত মুসলমানরা পারিবারের সবাইকে নিয়ে ইফতার করেন। কিন্তু সুদানের জাজিরা প্রদেশের এই গ্রামের চিত্র একেবারেই ভিন্ন।

 

অতিথি রোজাদারদের সেবায় কোনো ত্রুটি যেন না হয়। তাই সেবায় ব্যস্ত বাসিন্দারা 

 

আল-নুবা গ্রামের ১৬০ কিলোমিটার খার্তুম-ওয়ার্দ মাদানি মহাসড়কের পাশের বাসিন্দারা বলা যায়, এক প্রকার জোর করেই গাড়ি থামিয়ে যাত্রীদের ইফতার করান।

ইব্রাহিম আব্দেল রহিমের বাড়ি এই মহাসড়কের পাশেই। পেশায় চিকিৎসক। তিনি প্রতিদিন এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করেন।

বলেন, 'পথচারী ও পর্যটকদের ইফতার করানো আমাদের গ্রামের ঐহিত্য।'

ইব্রাহিম আনন্দের সাথে জানান, 'যখন ইফতারের সময় হয়, আমরা চেষ্টা করি গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া সব যানবাহন থামাতে। এবং তাদের অনেুরোধ করি আমাদের সাথে ইফতার করার জন্য।'

 

ইফতারে বিশেষ ধরণের কেক পরিবেশন করা হয়। তা পরিবেশনে ব্যস্ত আল-নুবার বাসিন্দারা

 

তাদের এই আন্তরিক আতিথিয়তায় মুগ্ধ অতিথিরাও। তাদের সাথে ইফতার করা এক বাস চালক বলেন, 'তারা মাঝ রাস্তায় এসে গাড়ির সামনে দাড়িয়ে পড়েন। পুরো রাস্তা বন্ধ করে দেন। গাড়ি থামাতে বাধ্য করেন। তারপর যাত্রীরা গাড়ি থেকে নেমে তাদের সাথে ইফতার করে। এবং পরে আবার যাত্রা শুরু করেন।'

আব্দুল্লাহ আদম নামে আরেকজন বলেন, 'আমরা জানি রমজান মাসে জাজিরার বাসিন্দারা যানবাহন থামিয়ে ইফতার করান। এটা তাদের ঐতিহ্য।'

এই ঐতিহ্য নিয়ে জাজিরার বাসিন্দারা গর্ব করেন। এবং একে পবিত্র দায়িত্ব মনে করেন তারা।

কারণ হযরত মোহাম্মদ (সা.) ঈমানদারদের জানিয়েছেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদার মুসলমানকে ইফতার করাবে সে ওই রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।

এই ইফতারে সাহায্যকারী বছর বিশেকের এক তরুণ বলেন, 'আমরা ছোটদের কিছু কাজ দেই। কেউ হয়ত গালিচা বিছায়, আবার কেউ খাবার নিয়ে আসে। কাউকে পাঠাই রাস্তায় গাড়ি থামাতে।'

 

আল-নুবার বাসিন্দাদের সাথে ইফতার করছেন পথচারীরা

 

সে জানায়, 'আমরা আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে গাড়ির সামনে গিয়ে দাড়াই। কিন্তু তাতে কোনো ভয় পাই না আমরা। কারণ আমরা জাজিরার ধর্মপ্রাণ মুসলমান।'

উল্লেখ্য, আল-নুবা গ্রামের বাসিন্দাদের সংখ্যা আনুমানিক দশ হাজার। তারা পেশায় কৃষক এবং সরকারি চাকুরিজীবী। বছরের পর বছর ধরে এই গ্রামে পথচারী ও পর্যটকদের উফতার করার প্রচলন চলে আসছে। একটি নিদিষ্ট সময়ের পর বাড়ির ছোটদের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে বলা যায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তারা বড়দের সাথে এই কাজে হাত লাগান। তাই ছোটবেলা থেকেই তাদের মনে গেঁথে যায় এই ঐতিহ্যবাহী প্রচলন। পরে বড় হয়ে তারাও সেই পথে হাটেন। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫