ঢাকা, সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মাহে রমজান

তুরস্কে রমজান : আহলান ওয়া সাহলান

সিনেম সেনগিজ

০৮ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:৩২ | আপডেট: ০৯ জুন ২০১৭,শুক্রবার, ১৫:৪৫


প্রিন্ট

তুরস্কের সাথে যারা অপরিচিত বা তুরস্কের ব্যাপারে যাদের তেমন জানা-শোনা নেই- তারা সেখানে পবিত্র রমজান মাস কি চমৎকারভাবে উদযাপিত হয় তা উপলব্ধি করতে পারবেন না। কারণ দেশটি হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ- তাই কিছু মানুষ মনে করে তুর্কিরা রোজা রাখে না এবং তুরস্কে রমজান বা অন্যান্য মাসের মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য দেখা যায় না।
কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তুরস্কে প্রত্যেক বছর রমজান একটি উৎসবের মতো আনন্দের বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়। রমজান মাস যেন সে দেশে আনন্দঘন একটি ভিন্ন পরিবেশ নিয়ে আসে। এ মাসে কেউ তুরস্কের রাজপথে ঘুরে বেড়ালে বর্ণিল সাজে সাজানো দোকানপাট দেখতে পাবেন। ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমদ স্কোয়ারে উৎসবের আমেজে সাজানো দোকানপাট, মসজিদের মিনারে মিনারে বিশেষ ধরনের আলোকসজ্জা এবং বেকারিগুলোর সামনে মানুষের বিশাল ভিড় দেখতে পাবেন।
পবিত্র রমজান মাসে তুরস্ক ওসমানী খেলাফতের সময়কার ঐতিহ্য ও নিয়মবিধি মেনে চলার চেষ্টা করে। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর মসজিদগুলোকে বিশেষভাবে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। মসজিদের মিনারগুলোতে ‘পবিত্রতম মাসকে স্বাগতম’ স্লোগান সংবলিত আলোকসজ্জা শোভা পায়। এ ছাড়াও, ওসমানী আমলের ঐতিহ্যবাহী ‘কারা সাজ হাচিভাত’-এর মতো অতিথি আপ্যায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। সারা দিন রোজা রাখার পর সন্ধ্যায় ইফতারের আয়োজন করা হয় উৎসবের আমেজে। হোটেল রেস্টুরেন্টে স্থানীয় লোকজন এবং পর্যটকদের জন্য বিশেষ রমজান মেন্যু প্রস্তুত করা হয়। মুসলিমদের সাথে অমুসলিমরাও রমজানের এই উৎসবে শরিক হয়ে থাকেন।
তুর্কি পরিবারগুলো এই পবিত্র মাসে জাঁকালো ও মূল্যবান খাবারের আয়োজন করে থাকে। নানা পদের মূল্যবান খাবারে ডিনার টেবিল থাকে ভরপুর। তুর্কিরা একত্রে বসে দীর্ঘ সময় ধরে এই খাবার গ্রহণ করে। পরিবারের সাথে মূল্যবান সময় কাটানোর একটি সুযোগ হিসেবে সবাই গ্রহণ করে ইফতারকে এবং এটাকে আনন্দের সাথে উপভোগ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেরোজাদারদের মধ্যেও ইফতার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ দিকে, ইফতারের সময় জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টগুলো রোজাদারদের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং সেখানে বসার সিট পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
ঐতিহ্যগতভাবে রমজান হচ্ছে অতিথিপরায়ণতা বৃদ্ধি এবং বদান্যতা দেখানোর সময়। কারণ এই সময়ে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য পরস্পরের প্রতি অধিকতর সহানুভূতিপরায়ণ ও কৃতজ্ঞতাবোধসম্পন্ন হয়ে ওঠে।
প্রতি সন্ধ্যায় তুরস্কের প্রায় প্রতিটি এলাকায় বিনামূল্যে ইফতার খাওয়ানোর জন্য টেবিল সাজিয়ে রাখা হয়। একদিকে দেখা যায় বহু মানুষ একত্রে খাওয়া-দাওয়া করছেন, অপর দিকে সেখানে রাতব্যাপী ইসলাম ও সুফিবাদের ওপর আলোচনা, কনসার্ট ও নাটক মঞ্চায়ন হতে দেখা যায়।
ইফতারের পর আসে জনপ্রিয় ডেজার্ট বাকলাভা। এর মাধ্যমে যেন সবাই ওসমানীয় আমলের রান্নাবান্নায় ফিরে যায়। তুরস্কে মিষ্টি হচ্ছে আনন্দ ও সুখের প্রতীক। তুর্কিরা কখনোই মিষ্টি ব্যতীত কোনো খাবার বা ভোজ শেষ করতে পারে না। এমনকি আমাদের একটি প্রবাদ আছে : ‘চল, মিষ্টি খাই আর মিষ্টি কথা বলি’ বিশেষভাবে রমজান মাসে। এর সত্যিকারের প্রতিফলন দেখা যায় এই মাসে। মুসলিমেরা খারাপ কাজ এবং বাজে কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে রমজানে।
প্রত্যেক ইফতারের প্রধান অংশজুড়ে থাকে মিষ্টি দ্রব্য। এখানকার পর্যটকদের বা অতিথিদের আতিথেয়তা বা আপ্যায়নে মিষ্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকের ভূমিকা পালন করে।
ঐতিহ্যগতভাবে, রমজান মাস হচ্ছে ব্যাপক আতিথেয়তা ও বদান্যতা বা ঔদার্য প্রকাশের মাস। কারণ এই সময় তুর্কিরা পরস্পর একত্র হয় এবং তাদের নিজেদের যা আছে সে জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এই সময়ে কেউ তুরস্ক সফরে গেলে যে কেউ তাকে ইফতারের দাওয়াত দিতে পারেন। তাই তুর্কি মুসলিমদের ইফতারের দাওয়াতে কারো বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। ইফতারের দাওয়াতে সঙ্কোচ না করে যোগ দিয়ে তাদের আতিথেয়তার আগ্রহকে উৎসাহিত করা উচিত। আবার সেহরির আগে পর্যন্ত একত্রে বসে রাজনীতি ও দৈনন্দিন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা, আড্ডা দেয়াও এখানে বেশ জনপ্রিয়।
রমজানের আরেকটি ইবাদাত হিসেবে তারাবি নামাজের জন্যও মুসল্লিরা মসজিদে হাজির হয়।
তারাবিতে মসজিদে উপচে পড়া ভিড় সৃষ্টি হয়। এমনকি রমজানে মুসল্লিদের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে মসজিদের পাশের রাস্তায়ও নামাজ পড়তে দেখা যায়। এ ধরনের দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক ব্লু মসজিদ এবং ইয়াপ সুলতান মসজিদে বিপুল সংখ্যক মুসল্লির একত্রে নামাজ আদায়ের অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর।
সেহরির সময় মানুষকে ঘুম থেকে জাগানোর জন্য রাস্তায় রাস্তায় ড্রাম বাজিয়ে কিছু লোককে স্বেচ্ছায় ও মনের আনন্দে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। কবিতা আবৃত্তি করে ড্রাম বাজিয়ে লোকদের ঘুম থেকে জাগানোর প্রয়াস শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য। অবশ্য দুঃখজনকভাবে, এই ঐতিহ্য এখন ক্রমান্বয়ে বিলীন হওয়ার পথে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে রমজানে দিনের বেলায় হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকলেও তুরস্কে খোলা থাকে এবং প্রকাশ্যে পানাহারের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তুরস্কের বেশির ভাগ মানুষ রোজা পালন করলেও কেউ কেউ নিয়মিত রোজা রাখে না। তবে এই সংখ্যা খুবই নগণ্য। তুর্কিদের মধ্যে যারা রোজা পালন করে না, তারাও পবিত্র রমজানের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করে। কারণ রমজানের শিক্ষা হলো : ধৈর্য, সম্মান এবং ভালো বা কল্যাণকর কাজ করা। তাই আহলান ওয়া সাহলান মাহে রমজান : তথা রমজানকে সুস্বাগতম জানাই।
লেখক : তুর্কি রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বিশেষভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক নিয়ে লিখে থাকেন।
‘আরব নিউজ’ থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫