ঢাকা, শুক্রবার,২৪ মে ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

বিচার বিভাগীয় সমীক্ষা এবং রাজনৈতিক অপেক্ষা

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

০৭ জুলাই ২০১৭,শুক্রবার, ২০:২১


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত জাতীয় সংসদে গৃহীত ষোড়শ সংশোধনী যেভাবে বাতিল করেছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘বিচার বিভাগীয় সমীক্ষা’ বা জুডিশিয়াল রিভিউ। বিশ্বের তাবৎ সংবিধানে সুস্পষ্ট অথবা অস্পষ্টভাবে বিচার বিভাগকে আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ গৃহীত যেকোনো সিদ্ধান্তকে অকার্যকর, অগ্রহণযোগ্য, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও বাতিল ঘোষণার এখতিয়ার বিচার বিভাগকে দেয়া হয়েছে। সুস্পষ্টভাবে যেসব দেশের সংবিধানে এ ক্ষমতা দেয়া আছে সেগুলো হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, জাপান, জার্মানি, ইতালি এবং প্রতিবেশী ভারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৭৮ নম্বর ফেডারালিস্ট পেপারে আলেক্সান্ডার হ্যামিলটন শক্তভাবে বিষয়টির সন্নিবেশ করেন। এখানে এই তত্ত্বটির প্রাধান্য দেয়া হয় যে, রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবিধানকে মৌলিক কেন্দ্রবিন্দু নির্ধারণ করে আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগ যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করবে। বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে আইনের ব্যাখ্যার ব্যাপারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয় [It therefore belongs to them-Judiciary- to ascertain it’s meaning as well as the meaning of any particular act proceeding from the legislative body (Oxford Dictionary of Politics:2009 : 284)]। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তথা রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর সম্পর্ক বিধানে যে সিদ্ধান্তটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব বিবেচনা করা হয় তা হলো- ১৮০৩ সালে সংঘটিত একটি মামলা। এ মামলা মারবারি বনাম মেডিসন নামে সমধিক পরিচিত। এ সময়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন মার্শাল ১৭৮৯ সালের বিচার বিভাগ সম্পর্কিত একটি আইন, যা ইতঃপূর্বে মার্কিন কংগ্রেসে গৃহীত হয়েছে, তা বাতিল ঘোষণা করেন। কাকতালীয়ভাবে আমাদের ষোড়শ সংশোধনী এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সাথে এর অপূর্ব সামঞ্জস্য রয়েছে। জন মার্শালের ঐতিহাসিক রায়ের সারর্মম এ রকম : ‘সংবিধান সরকার গঠন নির্দেশ করে এবং সরকারের অন্যান্য ক্ষেত্রে তা সম্প্রসারিত হয়...। আইন বিভাগের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট এবং সীমিত। সংবিধানে লিপিবদ্ধ সেই সীমাবদ্ধতা ভুলক্রমে বা অন্যভাবে অতিক্রম করা যাবে না। যে কারণে ক্ষমতা সীমিত এবং যে কারণে সংবিধানপ্রণেতারা এর বাধ্যবাধকতা লক্ষ করেছেন, সেটি যদি কোনোভাবে লঙ্ঘিত হয় তা অবশ্য প্রতিরোধযোগ্য। এটা সহজেই বোধগোম্য হওয়া উচিত যে, আইনসভা কর্তৃক রচিত যেকোনো আইন তা যদি সংবিধান পরিপন্থী হয়, স্পষ্টভাবে বিচার বিভাগের দায়িত্ব কোনটি আইন আর কোনটি আইন নয় তা ব্যাখ্যা করা।’ এভাবে প্রায় সব রাষ্ট্রে সংবিধানের সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো বাস্তবে না হলেও অন্তত তত্ত্বকথায় সংবিধানের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথা বলে আসছে। বাংলাদেশের সংবিধানেও এ সত্যের স্বীকৃতি রয়েছে। অনুচ্ছেদ ৭-এর (১)-এ বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে’। একই অনুচ্ছেদের (২)এ বলা হয়েছে, ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইবে’। সুতরাং আইনসভা বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ যদি সংবিধানের মৌল চেতনার বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করে তা চূড়ান্ত বিচারে বাতিল হতে বাধ্য। প্রকারান্তরে বাংলাদেশের সংবিধান ও সর্বোচ্চ বিচারালয়কে সে ক্ষমতা দিয়েছে। সংবিধানের চতুর্থভাবে বিচার বিভাগ অংশের ১০৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদের যে কোন আইনের বিধানাবলিসাপেক্ষে এবং আপিল বিভাগ প্রণীত যেকোনো বিধিসাপেক্ষে পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকিবে’। বাংলাদেশ মূল সংবিধানে বিচারকদের অভিসংশন বা অভিযুক্তকরণ এবং প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অভিশংসনের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

অভিশংসন : রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বে বা উচ্চ দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিকে অভিযুক্তকরণের প্রক্রিয়াকে অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) বলা হয়। একে অপসারণ প্রক্রিয়াও বলা যেতে পারে। এ অভিশংসনের আওতায় আসতে পারে দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকেরা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা। অভিশংসনের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কর্তব্যে চরম অবহেলা, দুর্নীতির অভিযোগ, অসদাচরণ এবং রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি। প্রতিটি দেশের সংবিধানে এতদসম্পর্কিত বিধিবিধান রয়েছে। প্রথাগতভাবে উন্নত গণতন্ত্রে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সংসদে অভিযোগ উত্থাপিত হয়। অবশেষে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় উচ্চ পরিষদে। ব্রিটেনে অভিযোগ উত্থাপিত হয় হাউজ অব কমন্সে। আর বিচার করে হাউজ অব লর্ডস তথা প্রিভি কাউন্সিল। এসব দেশে অভিশংসনের ঘটনা খুবই বিরল। ১৬৬৬ সালে হাউজ অব কমন্স তৎকালীন ‘রাজার মুখ্যমন্ত্রী’ (এখনকার প্রধানমন্ত্রী) আর্ল অব দানবেকে অভিশংসন করেন। অভিযোগ ছিল ফ্রান্সের সাথে অসম চুক্তি আলোচনার। হাউজ অব লর্ডস তাকে শাস্তি দিতে অস্বীকার করে। তবে তিনি পদচ্যুত হন। ব্রিটেনে বিগত ২০০ বছরে মাত্র দু’টি অভিশংসনের ঘটনা ঘটে। ১৭৮৬ সালে ভারতে দুঃশাসনের জন্য ওয়ারেন হেস্টিংসকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১৮০৬ সালে সরকারি অর্থ আত্মসাতের জন্য লর্ড মেল ভাইল অভিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ আদালত অভিশংসনসহ সব ক্ষেত্রে ক্ষমতায়িত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে আপিল আদালত নির্বাচনী সীমারেখা নির্ধারণ প্রশ্নে রায় দেয়। ১৯৯০ সাল থেকে ব্রিটিশ বিচার আদালত ইউরোপীয় ধারার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পার্লামেন্ট প্রণীত আইন ও বিধিগুলো পর্যবেক্ষণ শুরু করে। বিশেষত, আইনানুগতা ও মানবাধিকার প্রশ্নে তারা ক্ষমতায়িত হয়ে ওঠে। পৃথিবীর বাস্তবতার আলোকে এই ক্ষমতায়ন হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা একে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌম চেতনার বিরোধী বলে মনে করে। একই ধারায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিশংসনের সার্বিক ক্ষমতা প্রতিনিধি পরিষদের কাছে ন্যস্ত। আগেই বলা হয়েছে, বিচারিক ক্ষমতা উচ্চপরিষদ বা সিনেট সংরক্ষণ করে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সিনেট যখন বিচারিক কার্যে সার্বিক কমিটি (Committee of the whole house) হিসেবে কাজ করে তখন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এতে সভাপতিত্ব করেন। সুতরাং সর্বোচ্চ আদালতের কর্তৃত্ব লক্ষণীয়। ১০০ সদস্যের সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৭৮৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত মাত্র সাতজন ফেডারেল জজ অপসারিত হয়েছেন। ১৮৬৮ সালে প্রেসিডেন্ট এনড্রু জনসন অভিযুক্ত হন। তিনি মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে অভিশংসন থেকে রক্ষা পান। ১৯৭৪ সালে মূলত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে প্রেসিডেন্ট নিক্সন অভিযুক্ত হন। অভিশংসন নিশ্চিত জেনে তিনি স্বসম্মানে পদত্যাগ করেন। ১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগে অভিযুক্ত হন। কিন্তু প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের অভাবে অভিশংসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। তৃতীয় বিশ্বে অভিশংসনের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। বিজ্ঞজন মাত্রই জানেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিচার বিভাগকে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী বলা হয়। বিচার বিভাগ সেখানে আইনের সর্বোচ্চ ব্যাখ্যাকারী, যুক্তরাষ্ট্রের অভিভাবক এবং নাগরিক স্বাধীনতার বিশ্বস্ত রক্ষক।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ : বাংলাদেশের সংবিধানেও অভিশংসনের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উপস্থাপিত হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫২তে রাষ্ট্রপতির অভিশংসনপ্রক্রিয়া বর্ণিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের অভিশংসনের কথা সংবিধানে উল্লেখ নেই। সংসদীয় ধারায় অনাস্থা প্রস্তাব এবং মন্ত্রীদের পদচ্যুতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা থাকার কারণে সম্ভবত বিষয়টি অভিশংসনের পর্যায়ভুক্ত হয়নি। সংবিধানের চতুর্থভাগে ৯৪ অনুচ্ছেদ থেকে ১১৩ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত বিচার বিভাগ তথা সুপ্রিম কোর্টের প্রতিষ্ঠা, বিচারক নিয়োগ, বিচারক পদের মেয়াদ, বিচারকদের ক্ষমতা, অক্ষমতা ইত্যাদি সম্পর্কে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ৯৬ ধারায় বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। সংসদীয় ধারা অনুযায়ী এটি ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীতে বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা এককভাবে রাষ্ট্রপতির ওপর অর্পিত হয়। মূল সংবিধানের দোহাই দিয়ে যারা কথা বলছেন, আসলে তারা চতুর্থ সংশোধনীর বাস্তবতা এড়িয়ে যাচ্ছেন। ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অভিশংসনের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত করেন। লক্ষণীয় যে প্রেসিডেন্টের হাতে সংরক্ষিত অভিশংসন ক্ষমতা তিনি বিচারকদের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। রাজনৈতিক প্রধান অভিশংসন ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে নিয়েছিলেন। আর সামরিক প্রধান সেই ক্ষমতা বিচারকদের কাছে ফিরিয়ে দেন। প্রধান বিচারপতি এবং আরো দুই জন সর্বজ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর ক্ষমতাসীন হলে যথেষ্ট সংযমের সাথে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। অবশ্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তারা সংবিধান সংযোজন, পরিবর্তন ও পরিমার্জনে হাত দিতে পারেনি। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তাদের সংবিধান পরিবর্তনের সুযোগ আসে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করা হয়। সংবিধানের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। তখনো তারা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল রাখে। ২০১৪ সালের গণ-অংশগ্রহণবিহীন নির্বাচনের পরে ১৭ সেপ্টেম্বর ষোড়শ সংশোধনী সংসদে পাস করা হয়। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নেয়া হয়। অবশ্য তখন এটা ব্যাখ্যা করা হয়নি যে অতীতে তারা এ রকম কোনো উদ্যোগ কেন গ্রহণ করেনি অথবা পঞ্চদশ সংশোধনীতে এটি কেন অন্তর্ভুক্ত হয়নি?

ষোড়শ সংশোধনীর কারণ : রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্রমে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব অধ্যায় এবং সব পর্যায় তাদের ক্ষমতা সংহত করার পর বিচার বিভাগকে বিশেষত উচ্চ আদালতকে করায়ত্ত করার প্রয়াস নেন। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গ আইনসভার ওপর তাদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাহী বিভাগ তথা আমলাতন্ত্রকে তারা দলতন্ত্রে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। নিম্ন আদালত তাদের নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে। নিম্ন আদালতের ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআইবির প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুর্নীতি এবং দলীয়করণের প্রমাণ পেয়েছে। নিম্ন আদালত যে তারা নিরঙ্কুশভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সুপ্রিম কোর্টের সাথে এতদসংক্রান্ত বিধিবিধান প্রণয়নে সরকারের উপর্যুপরি সময়ক্ষেপণ তার একটি বড় প্রমাণ। প্রধান বিচারপতি অনেকবার বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছেন। ষোড়শ সংশোধনী সংসদে পাস করা হলে বিচার বিভাগ তথা আইনজীবী ও ভুক্তভোগী মানুষের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে সরকার নিম্ন আদালত দখলের পর এখন উচ্চ আদালতকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে। কিছু আইনজীবীর সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে আইনজীবী মহলের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার কথা বোঝা যায়। ওই বছরের ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন ৯ জন আইনজীবী। প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর রুল জারি করে। এতে ওই সংশোধনী কেনো অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। এর বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এই আপিলের ওপর ১১ দিন শুনানি শেষে গত ১ জুন সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের দেয়া আদেশ বহাল রাখে। এ রায়ের ফলে সংসদের কাছে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা থাকছে না। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে দেন।

জনমত : মামলাটি দেশের সচেতন নাগরিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে। গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটিতে প্রতিফলিত জনমতে সরকারের বিপক্ষে গরিষ্ঠ মত প্রতিভাত হয়। ওই মামলায় ১০ জন এমিকাস কিউরি মতামত দেন। এদের মধ্যে ৯ জনই ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে কথা বলেন। দেশের শীর্ষ এসব আইনজীবীর মধ্যে রয়েছেন টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ফিদা এম কামাল, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দীন মাহমুদ, এ এফ হাসান আরিফ, এ জে মোহাম্মদ আলী ও এম আই ফারুকী। এমিকাস কিউরি আজমালুল হোসেন কিউসি সরকারের পক্ষে মত দেন। যারা রিট করেছিলেন তাদের বক্তব্য ছিল সংবিধানে ওই সংশোধনী হওয়ায় মৌল কাঠামোগত পরিবর্তন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণœ হবে। অপর দিকে সরকারের তরফ থেকে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ মূল সংবিধানে প্রত্যাবর্তন প্রয়োজন। সামরিক শাসক কর্তৃক সংঘটিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংবিধানের মৌল চেতনাবিরোধী। ষোড়শ সংশোধনী জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সংসদে পাস হয়েছে। সংসদ সার্বভৌম। সুতরাং এ আইন বাতিল হতে পারে না। বিচারকদের বিচার তারা করতে পারে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো জাতীয় সংসদের কাছেই বিচারকদের জবাবদিহি হতে হবে। অপর দিকে রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট থেকে বলা হয়Ñ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনসভার কাছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। দেশের সংবিধানেও শুরুতে এই বিধান ছিল। তবে সেটি ইতিহাসের দুর্ঘটনা মাত্র। রায়ে আরো বলা হয়, কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোতে ৬৩ শতাংশের অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল বা শৃঙ্খলা বিধায়ক পরিষদের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের বিধান রয়েছে। হাইকোর্ট মন্তব্য করে যে, বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের ফলে দলের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারেন না। তারা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। যদিও বিভিন্ন উন্নত দেশে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আছে। হাইকোর্টের মন্তব্যে আরো বলা হয়, মানুষের ধারণা হলো বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণœ হবে। সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে যাবে। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টে শুনানিকালে বিচারপতিরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের তথা সংসদ সদস্যদের দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের প্রসঙ্গটিও আনেন। প্রতিদিনের শুনানিতে অস্বস্তিকর বাক্য বিনিময় লক্ষ করা যায়।
আইনি বিতর্ক : রায়ের পর রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী মঞ্জিল মোর্শেদ বলেন, এর ফলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকবে না। আগের মতোই বিচার বিভাগই বিষয়টি পরিচালনা করবে। অপর দিকে সরকারের প্রধান আইনবিদ অ্যাটর্নি জেনারেল প্রদত্ত রায়ে চরম হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন আশা ছিল, স্বপ্ন ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত হবে। তা হলো না। রিটকারীদের আইনজীবী যেভাবে মতামত দিয়েছেন অর্থাৎ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এই রায়ের ফলে স্বাভাবিকভাবেই কার্যকর হলো এমন মতামতের বিরোধিতা করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আইনটি আপনা আপনি রেস্টর হবে না’। সরকারের প্রধান আইনি অভিভাবক ইঙ্গিত দেন যে নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হবে। অপর দিকে বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ব্যরিস্টার ময়নুল হোসেন, খন্দকার মাহবুব হোসেন, শাহদীন মালিক এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ গণমাধ্যমে মন্তব্য করেন, যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এমনি এমনিতেই প্রতিষ্ঠিত হলো। রাজনৈতিক দলগুলো এই রায়কে জনগণের বিজয় বলে অভিহিত করেছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মন্তব্য করেন যে, এ রায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ রায় নিয়ে কোনো ধরনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া না দেখানোর জন্য দলের ও সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিচার বিভাগ যে স্বাধীন এটা তারই বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রয়োজন নেই। সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান বলে গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ। প্রধানমন্ত্রীর এ প্রতিক্রিয়া তার রাজনৈতিক সংযমের পরিচায়ক বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।
পর্যবেক্ষণ : ষোড়শ সংশোধনী প্রশ্নে সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া পাওয়া কঠিন। তার কারণ তারা অসাধারণ আইনি জটিলতা বুঝতে অক্ষম। অপর দিকে শিক্ষিত সচেতন মানুষ যারা বোঝে তাদের প্রতিক্রিয়া উচ্চ আদালতের পক্ষে। গত কয়েক দিনে শ্রুত টকশো, পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় এবং জনমত জরিপে এ ধারণাই প্রকাশিত হয়েছে যে, এ রায়ের ফলে ‘এই প্রথমবারের মতো রাজা চেক দেয়া গেছে’। তবে পত্রপত্রিকায় স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ দৃশ্যমান। প্রাজ্ঞজনেরা কেউ কেউ শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। যারা ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের রণকৌশল সম্পর্কে জ্ঞাত তারা সতর্ক মতামত দিচ্ছেন যে সরকারি দল কিভাবে এই দৃশ্যমান পরাজয় মোকাবেলা করে তা ভাবার বিষয়। আইনসভার নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব তাদের হাতে রয়েছে। সুতরাং একই ধরনের আইন করে আবারো আদালতকে মোকাবেলা করার কৌশল মোটেই অবান্তর নয়। স্বাধীনচেতা বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা আগামী বছরের প্রথমে অবসরে গেলে সরকারের জন্য সে সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সাধারণভাবে মনে হয় যেন এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। তবে সরকার ও বিরোধীদলীয় সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা মনে করেন এর দ্বারা কোনোরকম বিরোধ বা সঙ্ঘাত সৃষ্টি হবে না। উভয় পক্ষই যদি নিজ নিজ সীমারেখায় আবদ্ধ থাকেন তাহলে তা স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করবে। এটি একটি অপ্রিয় সত্য যে, পৃথিবীর সর্বত্র এমনকি উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে বা নিজ নিজ পক্ষপুটে নেয়ার প্রবণতা রয়েছে। শাসকেরা তাদের সর্বোচ্চ বিবেক বিবেচনা বা নিজ পক্ষের ধারণায় সুদৃঢ় থেকে এমন সব মনোনয়ন দিয়েছেন, যা সব সময় তাদের জন্য সুখকর হয়নি। প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ার তার প্রতি বিশ্বস্ত আর্ল ওয়ারেনকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বানিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়ারেন তার জন্য অনেক বিব্রতকর অবস্থা সৃষ্টি করেছিলেন। অবশেষে দুঃখ করে আইজেন হাওয়ার তার মনোনয়ন প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘the biggest damfool mistake I ever made’ । বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্ব চিরকালীন। বিচার বিভাগ চায় নির্বাহী বিভাগের লাগামকে টেনে ধরতে। অপর দিকে নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগকে ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। এ ক্ষেত্রে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ একটি বহুল উচ্চারিত প্রতিশব্দ। অবশেষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফাইনারের মীমাংসা; ‘Complete separation of powers neither possible nor desirable.

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫