ঢাকা, বুধবার,১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

প্রিয়জন

অদৃশ্য সুতার টানে

আবদুল কাদের আরাফাত

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

কিছুক্ষণ পরপর ফেসবুকে লগ ইন করে মিনিট দুয়েক কী যেন খুঁজে, কপালে জমতে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম স্রোতধারা হয়ে নামে, তবুও ফারিয়ার বিরাম নেই। বারবার মুহিমের ওয়ালে ঢুঁ মারছে। মেসেঞ্জার বলছে মুহিম ছয় দিন আগে সর্বশেষ অনলাইনে এসেছে, তবুও ফারিয়ার মন বলছেÑ এই বুঝি মুহিম নক করে বলবে, ফারিয়া আমি ভালো আছি, অযথা চিন্তা করো নাতো। সপ্তাহ পেরিয়ে যায়, প্রতীক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয়, মুহিমের খোঁজ মিলে না। সবাই আছে অথচ ফারিয়ার মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে, কোথাও কেউ নেই।
ফেসবুকে এতসময় দেয়া নিয়ে যার সাথে ঝগড়া হতো সে মানুষটা এক সপ্তাহে একবারের জন্যেও অনলাইনে আসেনি, ভাবতেই বুকের ভেতরে চিনচিনে ব্যাথাটা আরো বাড়ল। কেবলই ভাবছে, মুহিম ফিরে এলে বলবেÑ একটা স্ট্যাটাস দাও তো, তোমার ফেবু ওয়াল খালি দেখতে একটুও ভালো লাগছে না।
বাইরে ঝুম বৃষ্টি, মাকে জড়িয়ে শুয়ে আছে মাহি। মাহি মুহিমের একমাত্র মেয়ে, নার্সারিতে পড়ে, এতটুকুন বয়সেই দারুণ ছবি আঁকে। ছবি এঁকে আব্বুকে দেখিয়ে বলবেÑ দেখো তো আব্বু, তোমার বুড়িটা কেমন এঁকেছে? মেয়েকে কোলে নিয়ে মুহিম বলে ওঠেÑ মাশাআল্লাহ, দেখতে হবে না? এটা কার পাকা বুড়ি এঁকেছে।
-আব্বু আসছে না কেন? আমার একটুও ভালো লাগছে না, আব্বু এলে আচ্ছামতো বকে দিও।
আচ্ছা মা, বকে দিবো, এবার ঘুমাও আম্মু।
বৃষ্টি হলে মুহিমের মন পড়ে থাকত ঘরে, ঘড়ির কাটা ৪টা পেরোলেই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ত, বাসায় ফিরে বাপ-বেটি মিলে গল্প করতে করতে কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসত টেরই পেত না।
-সারাক্ষণ গল্প করলে পেট ভরবে? কিছু খেতে হবে না? ফারিয়ার ডাকে মুহিম মেয়েকে নিয়ে ডাইনিংয়ে আসতে আসতে বলত, দেখত মা, বাট-বেটি মিলে একটু গল্প করব এটিও সহ্য হয় না তোমার আম্মুর। হো হো করে হেসে উঠত ফারিয়া।
মুহিমের পুরনো লেখা পড়তে গিয়ে ফারিয়ার চোখ আটকে গেল একটি স্ট্যাটাসেÑ ‘অদৃশ্য সুতার টানে ক্রমশ গুম হয় প্রেয়সীর কথামালা, ছোট্ট খুকির আধো আধো বুলি, স্কুলে নতুন ভর্তি হওয়া দুষ্ট ছেলেটার রঙ পেন্সিলের বায়না। অশ্রুসিক্ত জননীর প্রতীক্ষার অবসান হয় না আর। তারা ফিরে আসে মধ্য রজনীতে প্রেয়সীর ঘুম ভেঙে যাওয়ার বেদনায়, আব্বুর ছবি বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া পিচ্চিটার চাহনিতে, অসহায় মা জননীর কান্নায়, সংবাদপত্রের পাতায় আর টেলিভিশনের বিশেষ বুলেটিনে।’
তবে কী...। নাহ আর ভাবতে পারছে না, কত কথা যে মনে পড়ছে, মনে হচ্ছে কতযুগ দেখা হয়না মানুষটার শিশুসুলভ আচরণ।
ভাবনায় ছেদ পড়ল মাহীর ডাকে।
আম্মু মশারি দাওনা কেন? তোমার দেখছি কিছুই মনে থাকে না, পরশু ডাক্তার আঙ্কেল কত করে বোঝাল।
-ওহ, স্যরি মা, এখনই দিচ্ছি।
মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে ফারিয়া ঘণ্টা দুয়েক অনলাইনে ছিল, অনলাইন বলতে ঘুরেফিরে মুহিমের ওয়াল। নাহ, আজও নতুন কোনো খবর নেই, কেউ জানে না মুহিম কোথায়।
ঘুমকাতুরে ফারিয়ার চোখ যেন ঘুমকে ছুটি দিয়েছে, ঘুমের ওষুধও অসহায় ঠেকছে তিন দিন ধরে, তবুও একটু ঘুমানো দরকার, ভোরে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যেতে হবে।
কাকভেজা হয়ে মুহিম ফিরে এসেছে, চোখে মুখে প্রচণ্ড ক্লান্তির ছাপ। ফারিয়া কপালে হাত দিয়ে দেখলো প্রচণ্ড জ্বর, কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলÑ এত দিন কই ছিলে। মাহি আব্বুকে জড়িয়ে আছে, আহ্লাদ ঝর পড়ছে ওর প্রতিটি কথায়, জানো আব্বু? তুমি দেখো না বলে আমি একটি ছবিও আঁকিনি এত দিন। তুমি বুঝি একটুও মিস করোনি আমায়।
প্রচণ্ড বজ্রপাতের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ফারিয়ার, ঘরে বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল স্ক্রিনে দেখল রাত ৩টা। চার্জ লাইট জ্বালিয়ে মুহিমের ফাঁকা বালিশের দিকে চোখ পড়তেই বুকটা হু হু করে উঠল, মুহিম ফিরে এসেছে এমন স্বপ্নের কথা মনে করে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে, বিড় বিড় করে বলতে লাগলÑ মানুষটা কোনো দিন কারো ক্ষতি করেনি, সহজ সরল মানুষটা কই হারিয়ে গেল। মাহিও জেগে উঠল, মায়ের চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলÑ মা তুমি কাঁদছ? মেয়েকে বুকে জড়িয়া ফারিয়া কোনো মতে জবাব দিলোÑ কই? না তো!
প্রিয়জন -১৬৫২

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫