ঢাকা, বুধবার,১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

নারী

ক্যান্সার বিজয়ী এক নারী

সাদিকুর রহমান

০৬ নভেম্বর ২০১৭,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

মাহমুদা আকন্দ ডলির জন্ম মধ্যবিত্ত এক পরিবারে। গ্রামের আট-দশটা সহজ সরল বাবার মতো সহজ সরল তার বাবা মতিউর রহমান। পেশায় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তিন মেয়ে আর এক পুত্রকে নিয়ে তার আনন্দের সংসার। সংসারে তেমন অভাব-অনটন না থাকলেও সব সময় একটা টানাটানিভাব লেগেই থাকে। সন্তানদের সব চাওয়া তিনি পূর্ণ করার চেষ্টা করেন তার সাধ্যমতো। গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তার জুরি নেই।
মা গৃহিণী হওয়ার সুবাধে তার সবটা সময় পরিবারেই কাটে। সন্তানদের পেছনে তিনি একেবারে আঠার মতো লেগে থাকেন। ছেলেমেয়েরাও তার সাথে সব কিছু শেয়ার করে। আর এ ক্ষেত্রে তাদের সম্পর্ক বন্ধুর মতো।
মাহমুদা আকন্দ ক্লাস ফাইবে বৃত্তি পেলে তার বাবা সিদ্ধান্ত নেন তাকে শহরের কোনো স্কুলে ভর্তি করবেন। কিন্তু তার মা তাকে ছাড়তে নারাজ। তাকে পাশে রেখেই বড় করবেন তিনি।
মতিউর রহমান সাহেব তার সিদ্ধান্তে অনড়। তাই এলাকার স্কুল থেকে নিয়ে শহরের ভালো একটি স্কুলে ভর্তি করান।
যথারীতি সে স্কুলে যায় এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মাঝে মধ্যে বাড়ি আসে। আর যখন সে ক্লাস এইটে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে বৃত্তি পেল না তখন তার মা মতিউর রহমানকে ইচ্ছা মতো ঝাড়েন। এতে মতিউর রহমান সাহেব কান দেন না।তিনি মেয়ের রেজাল্টের দিকে না তাকিয়ে তার জ্ঞান অর্জনের দিকে তাকান। আর এতে তিনি সন্তুষ্ট। কেননা তিনি মেয়েকে যে রকমভাবে তৈরি করতে চাচ্ছিলেন, সেভাবেই পেয়েছেন। তাই তিনি রেজাল্টের দিকে কান দেন না।
যথারীতি সে ক্লাস টেনে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ফাইব পায়। আর তখন তার মা তার বাবাকে আরো উৎসাহিত করেন ঢাকার ভালো কোনো কলেজে ভর্তি করাতে। তার বাবা বলেন, সেখানে খরচ অনেক, চালানো কঠিন হয়ে যাবে। তাই যে প্রতিষ্ঠানে পড়ছে, সেখানেই পড়ালেখা করুক।
এইচএসসি শেষ করলে কোনো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করে দেবেন। এতে তার মা-ও একমত হন।
যথারীতি যখন সে এইচএসসি পরীক্ষা দেয় তখন সে সারা বাংলাদেশে সপ্তম স্থান অধিকার করে। এতে তার পরিবারের আনন্দের শেষ নেই। তিনি মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করবেন বলেই পণ করেন। মেয়েও বাবার ভক্ত। সেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। তাই যথারীতি পরীক্ষা দিয়ে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।
ইউনিভার্সিটির সেমিস্টারগুলোতে সে সর্বদা ভালো করে। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়াটা যেন তার কপালেই লিখা ছিল। তাই কেউ চাইলেও তাকে পেছনে ফেলতে পারে না।
যখন সে থার্ড ইয়ারে উঠে, তখন পরিচয় হয় আবু জুনায়েদ মোহাম্মদ মিথুনের সাথে। মিথুন আইআরএ ফাইনাল ইয়ারে পড়ত। সামনে সে বিসিএস দেবে। আর তখন তাদের দুইজনের ইচ্ছা এক ইচ্ছায় রূপ নেয়।
মাহমুদা পূজার ছুটিতে বাড়ি গিয়ে তার মায়ের সাথে মিথুনের ব্যাপারে বললে তার মা কিছু বলেনি। কিন্তু তার বাবা তাকে স্বাগতম জানায়। কারণ তার মেয়ে কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়নি। মাহমুদা যখন ফাইনাল ইয়ারে পড়ে, তখন মিথুন তাকে জানায় তার পরিবার তাকে বিয়ে করানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
মাহমুদা তার পরিবারে বিষয়টি জানালে মিথুনের পরিবারের সাথে তারা যোগাযোগ করে তাদের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলে সব ঠিকঠাক করে রাখে।
বিয়ের দুই বছর পর মাহমুদার কোলে আসে সুন্দর একটি মেয়ে শিশু। সবাই তাকে ‘খুশি’ বলেই ডাকে। কিন্তু পরের বছর মাহমুদা যখন তার শরীরে অসুস্থতা অনুভব করে, তখন মেডিক্যালে ডাক্তারি পরীক্ষা করায়। আর ধরা পড়ে স্তনক্যান্সার।
ডাক্তার জানায়, তার বাম পাশের স্তনটি অপারেশন করে কেটে ফেলে দিতে হবে।
মিথুন আর মাহমুদা দু’জন মিলেই সিদ্ধান্ত নেয় স্তন কেটে ফেলে দেবে। কিন্তু অপারেশনের পরই সব কিছু বদলে যেতে থাকে। মিথুন আর মাহমুদাকে মেনে নিতে চায় না।
যার ফলে সংসারে এক সময় তৈরি হয় দ্বিধাদ্বন্দ্বের। আর সেখান থেকেই ছাড়াছাড়ি।
কিন্তু মাহমুদা থেমে যাওয়ার মতো মেয়ে নয়। সে চালিয়ে যেতে থাকে তার জীবন যুদ্ধ।
আর এ খবর যখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পায়, তখন বিভিন্ন সংগঠন এগিয়ে আসে।
একপর্যায়ে জাতিসঙ্ঘ তার কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে নিযুক্ত করে বাংলাদেশের একজন স্তন ক্যান্সারের কর্মী হিসেবে। মাহমুদা আকন্দের কাজ স্বীকৃতি পায় বৈশ্বিকভাবে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫