ঢাকা, রবিবার,১৭ নভেম্বর ২০১৯

নারী

কারুশিল্প মেলায় নারী শিল্পীরা

হাসান মাহমুদ রিপন

১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

সোনারগাঁওয়ে চলছে মাসব্যাপী লোককারুশিল্প মেলা। কারুশিল্পে জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উজ্জীবন এবং শিল্পীদের সৃজনশীলতায় নবমাত্রা সঞ্চারের লক্ষ্যে এবং লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এ মেলার আয়োজন করে। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে কর্মরত কারুশিল্প প্রদর্শনী। এ প্রদর্শনীতে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে নানা বিষয়ের ওপর দক্ষ কারুশিল্পীদের। এ কারুশিল্প প্রদর্শনীতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন এখন নারী শিল্পীরা। পুরুষ কারুশিল্পীদের পাশাপাশি এসব নারী কারুশিল্পী তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি করছেন নজরকাড়া সব কারুপণ্য। লোকজ উৎসবে আসা দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হচ্ছেন তাদের হাতের তৈরী এসব মনোরম কারুপণ্য দেখে।
কথা হয় কর্মরত নকশিকাঁথা কারুশিল্পী হোসনে আরার সাথে। তিনি জানান, দীর্ঘ দিন ধরে কর্মরত কারুশিল্পী হিসেবে এ মেলায় অংশ নিয়ে আসছেন। তিনি বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন থেকে তার সূক্ষ্ম কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বর্ণপদক ও নগদ অর্থ পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন। তার সহকারী হিসেবে কাজ করেন তার ছোট মেয়ে নারগিস। হোসনে আরার বাড়ি সোনারগাঁও পৌরসভার গোয়ালদী গ্রামে। তিনি নকশিকাঁথার পাশাপাশি সুইসুতার সূক্ষ্ম কাজ করা পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, শাড়ি, রুমাল, কুশন কভারসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিস তৈরি করে থাকেন। এ মেলায় এসে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন বলে তিনি জানান। তিনি এ মেলা ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন মেলায় অংশ নেন। তিনি আরো জানান, নকশিকাঁথার প্রশিক্ষক হিসেবে তাকে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন নিয়োগ দিয়েছে। তিনি সোনারগাঁওয়ের প্রায় ৩০ জন নারীকে এ নকশিকাঁথার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। একসময় তিনিও প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। তার শিক্ষক ছিলেন হাসনা হেনা। হোসনে আরা এ ফাউন্ডেশনে ‘নকশিকাঁথার মাঠ’ নামে এক প্রকল্প থেকে নকশিকাঁথার প্রশিক্ষণ নেন।
বাঁশের ছোট্ট একটি যন্ত্র। এতে লম্বা ও আড়াআড়িভাবে লাগানো হয়েছে পাটের সুতো। পাশেই দেখা গেল কাপড়ের সাদা ও রঙিন সুতো। একজন নারী বাঁশের যন্ত্রের ওপর থাকা পাটের সুতোর ভেতরে উলের সুতো ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। যন্ত্রটি একটু একটু করে নড়ছে। এভাবেই তৈরি হচ্ছে শতরঞ্জি। শতরঞ্জি স্টলে দেখা গেল এ দৃশ্য। সুদূর রংপুর থেকে উৎসবে এসেছেন ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি কারুশিল্পী শিউলি বেগম। সাথে এসেছেন বাবা রমজান আলী। শিউলি বেগম জানান, তার বাবার সাথে এ মেলায় তার মা কাজ করতেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি তার বাবার সাথে প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছেন। তার শতরঞ্জির কাজের হাতেখড়ি হয়েছে বাবা-মায়ের কাছে। তার বাবা-মা দীর্ঘ ১২ বছর ধরে এ উৎসবে কর্মরত কারুশিল্পী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। তবে তিনি এ বছরই এ মেলায় অংশ নিয়েছেন। পাশে আরেক শতরঞ্জি স্টলে বসে নিপুণ হাতে শতরঞ্জি শিল্পকর্ম তৈরিতে ব্যস্ত বিউটি বেগম। তিনি এ মেলায় ১৯৯৬ সাল থেকে আসছেন। এ মেলা ছাড়া তারা ঢাকার শিল্পকলা, বিসিক মেলা, সার্কের মেলাসহ বিভিন্ন মেলায় অংশ নেন। কারুশিল্প মেলায় ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর কারুপণ্য নিয়ে এসেছেন রাঙামাটির শিউলি ও রাশেদা বেগম এবং বান্দরবানের এঞ্জেল। তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী তাঁতবস্ত্রসহ বাঁশের তৈরি বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করছেন প্রদর্শনীতে। বিশেষ করে তাদের কোমর তঁাঁতের তৈরি শাল, ওড়না ও থ্রি-পিসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা জানান, তারা আট-নয় বছর ধরে এ লোকজ উৎসবে কর্মরত কারুশিল্পী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। তবে এঞ্জেল ও রাশেদা বেগম এ প্রথম মেলায় অংশ নিয়েছেন। মেলায় নিরাপত্তা থাকায় তারা প্রতি বছর এ মেলায় অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন। এ দিকে মনিপুরী শিল্পের স্টলে বসে কাজ করছেন রেহেনা পারভীন ও তার মা আনোয়ারা বেগম। তারা এসেছে সিলেট থেকে। রেহেনা পারভীন জানান, তারা নিয়মিতভাবে এ মেলা চার বছর ধরে অংশ নিচ্ছেন। বাপ-দাদা থেকে এ পেশায় আসা। তাদের সাথে ছেলে মানুষ না থাকায় তারা অন্য কোনো মেলায় অংশ নিতে পারে না। নিরাপত্তার অভাব। ঢাকার বিভিন্ন মেলায় অংশ নেয়ার ইচ্ছা; কিন্তু তাদের নিরাপত্তার কারণে সেখানে যেতে পারে না। তিনি জানান, এ লোকজ মেলায় নিরাপত্তা রয়েছে। তারা বিভিন্ন অর্ডারের কাজও করে। তালপাতার হাতপাখা শিল্পী মনোয়ারা বেগম। তার স্বামী আবুল কালাম। বাড়ি চট্টগ্রামে। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এ মেলায় প্রদর্শনীতে অংশ নেন। তার স্বামী আবুল কালাম ২০১৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলে বাপ্পারাজকে নিয়ে এ বছর তিনি মেলায় প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।
প্রশান্ত রানী পাল তিনি তার স্বামী বিপদ হরিপালের সাথে দুই বছর ধরে মেলায় অংশ নিচ্ছেন। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কবি রবীন্দ্র গোপ তাদের কাজ দেখে মেলায় আমন্ত্রণ জানান। এ মেলা ছাড়াও তিনি জাতীয় জাদুঘর, চ্যানেল আইসহ বিভিন্ন মেলায় অংশ নেন।
লোকজ উৎসবে অংশ নেয়া নারী কারুশিল্পীরা তাদের নিজস্ব ও মেধা ও মনন কাজে লাগিয়ে তৈরি করছেন সুনিপুণ সব কারুকর্ম। পুরুষদের পাশাপাশি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে লালনের অন্যতম দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন এই নারীরা। নিখুঁতভাবে তৈরি এসব শিল্পকর্ম দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে সংসারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছে। দারিদ্র্যকে জয় করার পাশাপাশি এসব নারী আমাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছেন ঐতিহ্য রক্ষার সংগ্রামে সাহসী সৈনিক হিসেবে।
ফাউন্ডেশনের পরিচালক কবি রবীন্দ্র গোপ বলেন, আমাদের হারিয়ে যাওয়া দেশীয় ঐতিহ্য ও কারুশিল্পীদের পুনরুজ্জীবিত করার জন্যই এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবে পুরুষ কারুশিল্পীদের পাশাপাশি নারী কারুশিল্পীদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কারুশিল্পীদের শিল্পীসম্মানীর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ভবিষ্যতে লোকজ উৎসবে নারী কারুশিল্পীদের আরো বেশি প্রাধান্য দেয়া হবে।
ছবি : মো: শফিকুর রহমান

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫