ঢাকা, সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অবকাশ

মনেপ্রাণে বাংলা চাই

কাজী সুলতানুল আরেফিন

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ফেব্রুয়ারি মাস। ভাষার প্রতি বীর বাঙালির চেতনার মাস। দুঃসাহসী ভাষাসৈনিকদের আত্মত্যাগের মাস। ২১ যতই সামনে এগিয়ে আসছে, ততই শিহরণ জেগে উঠছে। মায়ের মুখের ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত ও শফিউলসহ আরো নাম না জানা আমাদেরই মায়ের বীর সাহসী সন্তানেরা হাসিমুখে নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ছোটবেলা থেকে আমাদের প্রাণে প্রাণে ছন্দে ছন্দে বেজে উঠত, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’। তখন এত কিছু উপলব্ধি করতে পারতাম না। বুঝতে পারতাম না ভাষার মর্ম আর রক্তে মাখা বেদনাসিক্ত কাহিনী। এ ভাষাকে সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে অনেক বুক তাজা রক্তে রাঙাতে হয়েছিল। হানাদারেরা গুলি করে থামাতে চেয়েছিল বাঙালির মুখের ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়ার আন্দোলন। কিন্তু আমাদের ভাষাসৈনিকেরা হানাদারদের এ হীনচেষ্টাকে রুখে দিয়েছিল নিজেদের বুক পেতে দিয়ে। নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে। আমরা অবশেষে পেরেছিলাম আমাদের এই মায়ের ভাষাকে মুখের ভাষা হিসেবে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করতে। আমাদের এই দাপট সমগ্র বিশ্ব মেনে নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত দিলো। এটা এখন আর শুধু আমাদের দিবস নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মানে সবার দিবস। এমন রাজকীয় মুকুট আর মহান স্বীকৃতি এ পৃথিবীর আর কারো নেই। এই একুশ আমাদের দিয়েছে নিজেদের প্রাণের আকুতি প্রকাশ করার স্বাধীনতা। নিজেদের মায়ের মুখের ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য লড়াই করার অঙ্গীকার। এই একুশে আমরা আমাদের ভাষা সৈনিকদের ত্যাগের মহিমা বহন করে ছুটে চলেছি নিরন্তর। যে ভাষাতে আজ আমরা সুখ-দুঃখ আর জীবন জয়ের মালা গাঁথি, স্বপ্নের রঙিন রেখা আঁকি, সে ভাষাকে আমরা কি এখনো সেই মর্যাদা দিতে পেরেছি?
সব কিছুকে ছাপিয়ে দিয়ে ভাষাসৈনিকদের সেই মর্যাদার শীর্ষ আসনে তুলতে পেরেছি কি? তাদের প্রতি কি সঠিক সম্মান জানাতে পেরেছি? শুধু দিবস পালন করে কিছু ফুলের তোড়া দিলেই সব কিছু হয়ে যায় না। ভাষাকে মনেপ্রাণে শ্রদ্ধা আর সম্মানের মাধ্যমে মূলত এই ভাষাসৈনিকদের শ্রদ্ধা করা হয়।
শুধু দিবস এলেই কেন আমাদের ভাষার প্রতি দরদ বা ভালোবাসা উথলে ওঠে? সারা বছর ধরে কেন আমরা ভাষার প্রতি এমন সম্মান দেখাতে পারি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ যত্রতত্র দেখা যায় ভাষার বিকৃতি। বানানের অবস্থা দেখলে আমাদের নিজেদের অসহায় মনে হয়! এই বানান ভুলের মহামারী সামাজিক মাধ্যম, দেয়াল লিখন, সাইনবোর্ড এ সীমাবদ্ধ নেই! পাশাপাশি দেশের পাঠ্যপুস্তকেও দেখা যায় অজস্র ভুল। নিজের ভাষার সাথে সাথে অন্য ভাষার ওপর জ্ঞান অর্জন বা দক্ষতা থাকা ভালো। আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা প্রায়ই দেখে থাকি অনেক তথাকথিত ওপরের তলার লোক নিজেকে জাহির করার জন্য যত্রতত্র বিনা প্রয়োজনেও ইংরেজি আওড়ান। নিজেকে জ্ঞানী-গুণী বা ভিন্ন স্ট্যাটাসের প্রকাশ করতেই এমন প্রয়াস। এহেন কার্যকলাপে আসলে কোনো বাহাদুরি নেই। নিজের ভাষার কাছে নিজেকেই ছোট করার শামিল। নিজের আঙিনায় নিজের ভাষাকে ভালোবেসে ব্যবহার করাই ভাষার প্রতি আন্তরিকতা।
অন্য ভাষা বা অন্য সংস্কৃতির দিকে আমাদের মন এত উতলা হয় কেন বুঝি না! আমাদের কমতি কিসের? কবিও বলে গিয়েছিলেন, ‘আমাদেরও আছে ধনে ধনে ভরা বিবিধ রতন’।
বিভিন্ন মার্কেট প্লেসে বা ডিসপ্লেতে ইংরেজি নাম বা কিছু প্রদর্শন করলেই সেটা খুব আলাদা কিছু বহন করবে এমন ভাবা নিছকই বোকামি। আর এখন মনে হচ্ছে পাশের দেশের ভিন্ন ভাষার আগ্রাসী সিরিয়ালের মতো সে দেশের ভাষাও আমাদের দেশে ঢুকে যাবে! আমরা যখন নিজের ভাষাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসবো তখন স্বাভাবিকভাবে নিজের সংস্কৃতির প্রতিও ভালোবাসা জেগে উঠবে।
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে তাদের নিজেদের ভাষার প্রতি প্রেম আয়নার মতো চকচক করে। তাদের সব কিছুতেই তাদের ভাষা চোখে পড়ে। গাড়ির নম্বরপ্লেট থেকে শুরু করে বাড়ি বা দেয়াল লিখন এবং সাইনবোর্ড সব কিছুতে। এমনকি তাদের সংস্কৃতি আর বিনোদনের মাধ্যমগুলোতেও তাদের ভাষার প্রতি ভালোবাসা ফুটে ওঠে। চীনারা এদের মধ্যে অন্যতম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় তাদের তৈরি চায়না মুভিগুলোতে শুধু তাদের ভাষাই ফুটে উঠেছে। কিন্তু আমাদের দেশের মুভিগুলোতে অন্য ভাষার (ইংরেজি) আভিজাত্য প্রকাশ করা হয়।
আমাদের দেশে যানবাহনের নম্বরপ্লেটে বাংলা করার কার্যক্রম প্রশংসনীয়। তবে বাস্তবায়ন করতে যেন আমাদের খুব কষ্ট হয়। শুধু পরিবহন সেক্টর কেন, আমরা চোখে পড়ার মতো সব কিছুতেই বাংলা দেখতে চাই। অন্য ভাষায় কোনো ডিসপ্লেই আমরা আর দেখতে চাই না। চার দিকে শুধু বাংলা আর বাংলা দেখতে চাই। এটা আনন্দের ব্যাপার যে অফিস-আদালতে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। সব স্থানেই বাংলার ব্যবহার চাই! মানুষের মুখে মুখে বাংলা ভাষার জয়গান নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের অন্তরেও নিজের ভাষার ঠাঁই দিতে হবে মর্যাদার উচ্চাসনে। আসুন সবাই এই একুশ থেকেই অঙ্গীকার করি ‘মনেপ্রাণে বাংলা চাই’।
পূর্ব শিলুয়া, ছাগলনাইয়া, ফেনী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫