ঢাকা, সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আমার ঢাকা

সম্ভাবনার ধোলাইখাল

শওকত আলী রতন

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ০০:০০ | আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ০৬:৫৮


প্রিন্ট

পুরান ঢাকার ধোলাইখাল গাড়ি ব্যবহারকারীদের শেষ ভরসাস্থল। দুষ্প্রাপ্য গাড়ির যন্ত্রাংশ কেনা ও গাড়ির জটিল সমস্যা সমাধানে সবাই ছুটে যান ধোলাইখালে। পরিবহন খাতের নির্ভরতার পুরনো ও রিকন্ডিশন্ড যানবাহনের অনেক যন্ত্রাংশই নতুন পাওয়া দুষ্কর হওয়ায় ধোলাইখালের বিকল্প নেই। সম্ভাবনাময় ধোলাইখাল নিয়ে লিখেছেন শওকত আলী রতন

রাজধানীর ঢাকার নবাবপুরসংলগ্ন ধোলাইখাল পুরনো যন্ত্রাংশের জন্য অনেক আগে থেকেই প্রসিদ্ধ। ধোলাইখালের রাস্তার দুই পাশে গড়ে ওঠা দোকান ছাড়াও রাস্তার অর্ধেকটাজুড়ে চোখে পড়ে গাড়ির নানা ধরনের যন্ত্রপাতি। প্রতিনিয়তই টুংটাং শব্দে মুখর থাকে ধোলাইখাল। সাধারণত গাড়ির নতুন যন্ত্রাংশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া গেলেও পুরনো সব ধরনের যন্ত্রাংশই পাওয়া যায় ধোলাইখালে। রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় গাড়ির নতুন যন্ত্রাংশ পাওয়া গেলেও মানুষজন সাধারণত ধোলাইখালে আসেন রিকন্ডিশন্ড যন্ত্রাংশের জন্য। দামও তুলনামূলক অনেক কম। ধোলাইখালের আরেকটি সুবিধা হলোÑ কোনো যন্ত্রাংশ কেনার পর সেটা গাড়িতে সেটিং করে দেয়ার জন্য রয়েছে সুদক্ষ কারিগর। প্রতিটি দোকানেই দুই-একজন কারিগর ক্রেতারা দোকান থেকে যন্ত্রাংশ কেনার পর তা গাড়িতে লাগিয়ে দিতে সাহায্য করেন।
আর এ কারণেই হয়তো এখনো গাড়ির প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সন্ধানে গাড়ির মালিক, ড্রাইভার, মেকানিক ও মোটর পার্টসের ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এই ধোলাইখালে। সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় বেশ জমজমাট থাকে ধোলাইখালের দোকানপাট। রাস্তার দুই পাশে গড়ে ওঠা টঙ ঘরের মতো ছোট্ট দোকানগুলো ঠেসে সাজানো হয়েছে যন্ত্রাংশ দিয়ে। জায়গাস্বল্পতার কারণে দোকানের মালিক, কর্মচারী ও কারিগরেরা দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। তবে ধোলাইখালের দোকানগুলোর বৈশিষ্ট্য হলোÑ এক দোকানে গাড়ির সব ধরনের যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না। কোনো কোনো দোকানে গাড়ির ইঞ্জিন, সাসপেনশন, বডি, নাট, বল্টু, চেসিস, বিয়ারিং, টায়ার, স্প্রিংসহ ছোট বড় সব যন্ত্রের রয়েছে।
নামকরণে ধোলাইখাল হলেও বর্তমানে খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ এক সময় ধোলাইখাল খালে চলাচল করত পালতোলা ছোট বড় অনেক নৌকা। প্রায় ৪০০ বছর আগে ঢাকার প্রথম সুবেদার ইসলাম খান নগররক্ষা পরিখা ও জলপথ হিসেবে খালটি খনন করিয়েছিলেন। এরপর অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। কালের পরিক্রমায় এখন ধোলাইখালে গড়ে উঠেছে লোহালক্কড় আর পুরনো গাড়ির যন্ত্রাংশের শত শত দোকান। পুরান ঢাকার বাসিন্দারাই মূলত এই পার্টসের ব্যবসায় বাণিজ্যের সাথে যুগ যুগ ধরে জড়িত। এসব যন্ত্রপাতি এখানকার দোকানিরা সংগ্রহ করে পুরনো ও ব্যবহার-অনুপযোগী যানবাহন থেকে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি নিলামে ক্রয় করে পরে তা ভেঙে যন্ত্রাংশ বের করে ধোলাইখালের মার্কেটগুলোয় বিক্রি করে। আবার অনেকে চট্টগ্রাম থেকেও পার্টস কিনে এনে বিক্রি করেন। আবার অনেক ব্যবসায়ী পুরনো যন্ত্রাংশ জাপান, দুবাই, চীন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ইংল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে সংগ্রহ করে বিক্রি করেন।
গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি ও পুরনো পার্টসের ওপর মানুষের আস্থা বাড়ার কারণে এক সময় চট্টগ্রামের ব্যবসায় চলে আসে ধোলাইখালে। ঢাকার ধোলাইখালে ১৯৬৮ সালে গাড়ির যন্ত্রাংশের মার্কেট প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর থেকেই গাড়ি ব্যবসায়ী, মেকানিক আর অটোপার্টস ব্যবসায়ীদের জন্য ধোলাই খাল আস্থার জায়গা হিসেবে পরিণত হয়েছে। তবে ধোলাইখাল থেকে যেকোনো যন্ত্রাংশ কিনতে হলে তা সঠিক আছে কি না তা চেক করে নেয়াই ভালো। অনেক সময় ক্রেতারা প্রতারিত হয়ে থাকেন বলে অভিযোগও রয়েছে। তারপরেও আপনার গাড়ি যত পুরনো হোক কিংবা নতুন মডেলের হোক না কেন, সব ধরনের গাড়ির যাবতীয় যন্ত্রাংশ পাওয়ার অন্যতম স্থান এখনো ধোলাইখাল। তাৎক্ষণিক কোনো যন্ত্রাংশের সন্ধান না মিললেও সময় নিয়ে জোগাড় করে দিতে পারেন ধোলাইখালের ব্যবসায়ীরা। ধোলাইখালে কোনো যন্ত্রাংশ না পাওয়া গেলে তা অন্য কোনো মার্কেট থেকে সংগ্রহ করা দুরূহ ব্যাপার বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
আশির দশকে পুরনো ইঞ্জিন আমদানির অনুমোদন দেয়ার পর থেকে এ ধোলাইখাল হয়ে ওঠে গাড়ির যন্ত্রাংশের জন্য একটি বিখ্যাত মার্কেট। গাড়ির সংখ্য দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে গাড়ির যন্ত্রাংশসংক্রান্ত দোকানপাট ধোলাইখালের গণ্ডি ছাড়িয়ে গোয়ালঘাট, লালমোহন স্ট্রিট, ধোলাইখাল পুকুরপাড়, উত্তর ও দক্ষিণ মৈশুন্দি, নবাবপুর রোড, টিপু সুলতান রোড ও ওয়ারী পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে। কেবল টঙ মার্কেটেই গড়ে উঠেছে প্রায় পাঁচ শতাধিক দোকান। এসব দোকানগুলোর বেশির ভাগের মালিকানায় রয়েছে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা। শুরু থেকে তারাই এ ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ ব্যাপারে কথা হয় হাজী আবদুল মজিদ লেনের নাটবল্টু ব্যবসায়ী জলিল মোটরসের মালিক আবদুল জলিলের সাথে। প্রায় ৩০ বছর আগে তার বাবার ব্যবসায়ের সূত্র ধরে মাত্র ১২ বছর বয়সে এ ব্যবসায় প্রবেশ করেন। সেই থেকে আজো টিকে রয়েছেন এ ব্যবসায়ের সাথে। তিনি জানান, সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসায় শুরু করেছিলেন, ৩০ বছরে অনেক উন্নতি হয়েছে ব্যবসায় থেকে। জাপান, দুবাই ও চায়না থেকে পুরনো পার্টস বাংলাদেশে আসে। সেখান থেকে মূলত আমরা আমাদের যন্ত্রাংশগুলো পেয়ে থাকি। আবার পুরনো গাড়ি ভেঙে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের জোগান পেয়ে থাকি। এক সময় রাজধানীর ওয়ার্কশপ মালিকেরা কেবল ধোলাইখাল থেকে পুরনো মালামাল কিনে গাড়িতে লাগাত, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সরাসরি চট্টগ্রাম থেকে পার্টস এনে বিক্রি করায় আমাদের কাস্টমার কমে গেছে। তা ছাড়া দুই বছর ধরে এই ব্যবসায় মন্দাভাব চলছে। ধোলাইখালে যে কয়েকটি দোকান রয়েছে, তাদের মধ্যে বেশির ভাগ দোকানই পুরনো। ধোলাইখালের ব্যবসায়ী সমিতি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ গাড়িই রিকন্ডিশন্ড। এসব গাড়ির বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি অনেক সময়ই নতুন পাওয়া যায় না। আর পেলেও দাম অনেক বেশি। অথচ ধোলাইখালে সাশ্রয়ী দামে গাড়ির পুরনো যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়। দীর্ঘ দিনেও এখানে বহুতল ভবন নির্মাণ না হওয়ার জায়গা সঙ্কটের কারণে অনেক পুরনো ব্যবসায়ী রাস্তার ওপর বসে ব্যবসায় করছেন। এমনকি অনেকে আইল্যান্ডের ওপর পার্টসের পসরা সাজিয়ে ব্যবসায় করছেন। ব্যবসায়ীরা জানান, অনেক আগ থেকেই আধুনিক মার্কেট করার দাবি জানিয়ে এলেও এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ঢাকা সিটি মেয়রের কাছে ব্যবসায়ীরা তাই আধুনিক মার্কেট তৈরির উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা করছেন।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫