ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অবকাশ

মুক্তিযোদ্ধার চিঠি

মীম মিজান

১৮ মার্চ ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
একজন

একজন

স্বপ্নে খুঁজে পাওয়া স্বপ্না,
আশা করি এ কাক চিলে মানুষ ভক্ষণের দিনে সুস্থ আছ। জানি তুমি সুখে নেই। তুমি কোনো এক অজানা ভয়ে যাও কুঁকড়ে। ভেতরটা তোমার চৈত্র মাসের ফসলের ক্ষেতের মতো ফেঁটে চৌচির। সেই ভয়ের ভয়াল থাবার কিছু নখ আঁচড় করে এ কলিজায়। ঝোঁপের মাঝে ঘুম থেকে আচমকায় সেটা অনুভূত হয়। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ে অনেক দিন মুণ্ডনবিহীন দাঁড়ি চুঁয়ে চুঁয়ে। সহযোদ্ধা ইদ্রিস টের পায় হাসফাস করা শব্দে। সান্ত্ব—না দেয় ধৈর্য ধরার। বলে, দেশ স্বাধীন হলে বিজয়ী বেশে স্বপ্নাকে বউ করে ঘরে তুলি নিস।
এক সকালে ছোট্ট আব্বাস সংবাদ নিয়ে এলো, হাকিমপুর গ্রামের ঠিক হাইস্কুলের উত্তর পাশের বাঁশ বাগানে বাঙ্কার করেছে পাকিস্তানি বাহিনী। এ সংবাদ শুনে আমাদের ক্যাপ্টেন চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি আমাদের সবাইকে নিয়ে টিম মিটিং করলেন। সেখানে বললেন, আমাদের খবর যেকোনো মুহূর্তে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এ মুহূর্তে আমাদের কী করা উচিত? আমরা সবাই বললাম, ক্যাপ্টেন স্যার আপনি জোনাল কমান্ডারের সাথে পরামর্শ করেন ও পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্রের মজুদের পরিমাণ আব্বাসের মাধ্যমে জেনে নিন। তিনি একটি চিঠি লিখে আব্বাসের হাতে দিয়ে বললেন, এটি স্কুলমাস্টার মোসলেমরে দিবি আর বলবি, ৫৫৭০০৫ (গোপন কোড যা দ্বারা সাব কমান্ডারের নাম বুঝিয়েছিল)।
রাতে আব্বাস এসে ফিসফিসিয়ে ক্যাপ্টেনকে কী জানি বলল? আব্বাস চলে গেলে ক্যাপ্টেন আমাদের ডেকে বললেন, পাকবাহিনী ইদ্রিসের বাড়িতে হামলা করেছিল। ইদ্রিসের মাকে অনেক অত্যাচার করেছে ইদ্রিস মুক্তিফৌজে যোগদানে। ইদ্রিস তো রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল তার মায়ের এ সম্মান ও অপমানের খবরে। সে রাইফেল হাতে নিয়ে বলে, স্যার অর্ডার দিন; ওই কুকুরের বাচ্চাদের শেষ করে আসি। ক্যাপ্টেন বললেন, ইদ্রিস মাথা ঠাণ্ডা রাখো। আমরা অবশ্যই অপারেশন চালাব, তবে সাব কমান্ডারের আদেশ লাগবে তো। কিছুক্ষণ পরই মোসলেম মাস্টার এলেন টর্চ লাইটের আলোয় পথ চিনে। এসেই ক্যাপ্টেনকে সাব কমান্ডারের চিঠি দিলেন। চিঠি পেয়ে ক্যাপ্টেন আমাদের নিয়ে মিটিং করলেন। তিনি অপারেশন চালানোর নির্দেশ পেয়েছেন। তাই তিনি আমাদের ৯ জনের টিমকে তিনটি ভাগে ভাগ করলেন। প্রথম গ্রুপে আমি, ইদ্রিস আর ফজলু। দ্বিতীয় গ্রুপে রমজান, ময়েন আর মমিন। তৃতীয় গ্রুপে ক্যাপ্টেন, রতন আর তালেব।
ক্যাপ্টেন গ্রুপ থাকবে স্কুলের কাছে। আমরা থাকব বাঁশঝোপের দক্ষিণে। রমজানেরা আগে। পশ্চিম দিকে পুকুর এ জন্য সেদিক কোনো গ্রুপ লাগেনি। প্রথমেই ক্যাপ্টেন বলে দিয়েছিলেন, তিনিই প্রথম আক্রমণ করবেন। তারপর পাকবাহিনী এদিকে গুলি ছোড়া শুরু করলে দ্বিতীয় গ্রুপ আক্রমণ চালাবে। এভাবে প্রথম গ্রুপ। কেননা তারা বিভ্রান্ত হবে ও ভয় পাবে। আমরা যে মাত্র ৯ জন এটা ওরা বোঝবে না।
পরিকল্পনা অনুযায়ী জ্যোৎস্নাবিধৌত রাতে ঝিঁঝি পোকার শব্দে অপারেশন শুরু। যথারীতি ক্যাপ্টেনের আক্রমণ। পাকবাহিনী বিচলিত হয়ে স্টেনগান দিয়ে খই ফোটাতে শুরু করলেন সেদিকে। তারপর রমজানেরা শুরু করল গুলি ছোড়া। পাকবাহিনীর কিছু অংশ পূর্ব দিকে গুলি চালাতে লাগল। এবার আমরা শুরু করলাম রাইফেল চালাতে বাঙ্কারের ভেতর। এ রকম ত্রিমুখী আক্রমণ দেখে তো তারা দিশেহারা। জ্যোৎস্নার আলোয় প্রায় সব বোঝা যাচ্ছিল। পাকবাহিনী গুলি চালানো থামিয়ে দিলো। ভাবলাম সব কি শেষ! না। হঠাৎ আবার গুলি শুরু করেছে তারা। আমরা মাথা নিচু করে গুলি চালাচ্ছিলাম। ইদ্রিস বলে উঠল, আজগর দেখ ওরা মাথা উঁচিয়ে গুলি করছে। কী সাহস? হারামিরা আমার মায়ের ওপর অত্যাচার করিস। দেখ। দেখ, ওই যে হেলমেট দেখা যাচ্ছে। ইদ্রিস ক্ষিপ্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রাইফেল চালানো শুরু করল।
না। না, ইদ্রিস। বসে পড়ো। ধপাস করে আমার ওপরে পড়ে গেল ইদ্রিস। বুক থেকে গড়িয়ে পড়ছে তাজা রক্ত। ইদ্রিস আমার কোলেই চলে গেল পরপারে। একটু মাথা উঁচিয়ে দেখি পাক বাহিনী রাইফেলের মাথায় হেলমেট উঁচিয়ে আমাদের বোকা বানিয়েছে।
অপারেশন শেষে ইদ্রিসকে ঘাড়ে করে নিয়ে এসে এই দুই হাতে শুইয়ে দিলাম মাটির কবরে। এখন ইদ্রিস নেই কেউ সান্ত্বনাও দেয় না। প্রেয়সী স্বপ্না ভালো থেকো। নিজেকে সামলে রেখো। হয়তো দেখা হবে, নয়তো বা মিশে যাবো ইদ্রিসের সাথে।
ইতি
তোমারই
আজগর

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫