ঢাকা, বুধবার,২৬ জুন ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

গজব ও গুজব

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

২৩ মার্চ ২০১৮,শুক্রবার, ১৯:৩৯ | আপডেট: ২৫ মার্চ ২০১৮,রবিবার, ১৩:৩৯


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

গজব শুধু আল্লাহর তরফ থেকে আসে না। গজব আসতে পারে গজবি মানুষ থেকেও। আগেকার দিনে দুর্ভোগ-দুর্যোগ হলে মানুষ বলত আল্লাহর গজব। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় গজব শুধু আল্লাহর তরফ থেকে আসেনি। যুগে যুগে স্বৈরাচার, স্বেচ্ছাচার, রাজা-বাদশা, আমির-ওমরা এবং ধনীক-বণিকদের তরফ থেকে সাধারণ মানুষের ওপর গজব নিপতিত হতো। ফেরাউন-নমরুদের কথা না হয় নাই বললাম। শাসকগোষ্ঠী এসব গজবের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করত। আইনকানুন সবই ছিল তাদের ইচ্ছামতো। ফরাসি সম্রাট ল্ইু-১৪ বলতেন ‘আমিই রাষ্ট্র’। এর আধুনিক সংস্করণ ‘এক নেতা, এক দেশ’ ইত্যাদি। বর্তমান বিশ্বে গণতান্ত্রিক গজব দেখা দিয়েছে বলে একজন আন্তর্জাতিক ভাষ্যকার মন্তব্য করেছেন। এই সেদিন রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন চতুর্থবারের জন্য যখন রুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, তখন তিনি এ মন্তব্য করেন। এর আগে উদাহরণ হিসেবে এই ভাষ্যকার অতিসম্প্রতি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর আজীবন ক্ষমতায় থাকার আয়োজনের কথা বলেন। গণতান্ত্রিক গজবের সবচেয়ে শক্ত উদাহরণ হিসেবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা বলেন। কুরআন কিতাবেও গজব হিসেবে রাজা-বাদশাহর আবির্ভাবের কথা বলা হয়েছে। গজব মানে শাস্তি, অভিশাপ, দুর্যোগ ইত্যাদিকে বোঝানো হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমরাও আজব গজবের মধ্যে নিপতিত হয়েছি। 

বাংলাদেশের মানুষ নিজ দেশে যখন ‘ঔপনিবেশিক শাসন’-এর মোকাবেলা করেছে, তখন তারা আইয়ুব-ইয়াহিয়া এবং টিক্কা খানের মতো গজব মোকাবেলা করেছে। বাংলাদেশেও এরশাদ ও মইন ইউ গজব নাজিল হয়েছিল। এই গজব যেমন কোনো ব্যক্তি থেকে আসতে পারে, আবার দল, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান থেকেও আরোপিত হতে পারে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে যে হারে হত্যা, হামলা এবং মামলা সব সীমা লঙ্ঘন করেছে তখন ক্ষোভের সাথে লোকজন গজবের কথাই বলছে। সমাজে যেভাবে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও পাশবিকতা বেড়েছে তাতে গজবের কথা মনে হতেই পারে। গজবের আরেকটি নাম অধিকারহীনতা। বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক অধিকারবঞ্চিত। অর্থনৈতিকভাবে পুঁজিবাদী শোষণের শিকার। ন্যায়বিচার থেকেও বিতাড়িত।

একই আইনের যখন দু’রকম ব্যাখ্যা হয়, চোরচোট্টা, গুণ্ডাপাণ্ডা, বাটপার, বদমাইশরা যখন বিচারব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং দল-গোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে রেহাই দেয়া হয় তখন সাধারণ মানুষ হতাশ হতে বাধ্য। গত সপ্তাহে এরকম একটি চরম হতাশার ঘটনা ঘটেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে। আমরা যারা আইনের লোক নই তারা সাধারণভাবে বিষয়গুলো বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। আর বিশেষ লোকেরা বিশেষ ব্যাখ্যা দেন। সরকারের লোকেরা বলছেন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। সরকার এ বিষয়ে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করছে না। অপর দিকে বেগম জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন ‘সরকারি কূটকৌশলে খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আটক রাখা হচ্ছে।’

সরকারের আইনি কুশীলবরা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বলে দিচ্ছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের ভুলের কারণে জামিন মঞ্জুর হয়নি। আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরা- যা বোঝার তা বুঝে গেছি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা সরকার দেশের সাধারণ মানুষকে বোকা মনে করে। চতুর কাক খর কুটোয় মুখ লুকিয়ে মনে করে তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। আইনের চাতুর্য এবং কর্তাব্যক্তিদের কৃপায় যে সবকিছু হয় তা এ দেশের মানুষ বোঝে। মানুষকে অবমূল্যায়ন করে কোনো লাভ নেই। এখন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজা পাওয়া বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি কবে মিলবে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন নেয়ার পর তা স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের শুনানির পর যদি হাইকোর্টের দেয়া জামিন বহালও রাখা হয় তারপরও তিনি মুক্তি পাচ্ছেন না। কারণ তাকে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। গত ১২ মার্চ কুমিল্লার একটি হত্যা মামলায় এরই মধ্যে বেগম জিয়াকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। আগামী ২৮ মার্চ এর জন্য শুনানির দিন ধার্য করা আছে। এর আগে ওই তারিখে তাকে হাজির করার জন্য কারাগারে প্রডাকশন ওয়ারেন্ট বা হাজিরা পরোয়ানা পাঠানো হয়েছে। এখন ওই মামলায় জামিন হওয়ার আগে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন না। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা আরো অন্তত পাঁচটি মামলা রয়েছে।

এ অবস্থায় সরকার যদি পর্যায়ক্রমে প্রতিটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখায় তাহলে খালেদা জিয়ার মুক্তির তারিখ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামলার নথি থেকে দেখা যায় যে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলায় আট যাত্রীকে হত্যার ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় কুমিল্লার জজ আদালত গত বছর ১০ সেপ্টেম্বর এবং হত্যা মামলায় কুমিল্লার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গত ২ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এ ছাড়া নড়াইলে দায়ের করা একটি এবং ঢাকায় দায়ের করা দু’টি মানহানি মামলায় গত বছরের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। বর্তমানে কারাগারে থাকা অবস্থায় মামলার পর মামলা দিয়ে তার মুক্তি অসম্ভব করে তুলছে সরকার। এসবের উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। জাতীয়তাবাদী দলকে নির্বাচনের আগে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায় আওয়ামী লীগ সরকার। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিদিন হত্যা, হামলা ও মামলার খবর আসছে। যোগ্যতর প্রার্থীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্বাচনের অযোগ্য করে দেয়ার চেষ্টা চলছে। প্রতি গ্রামে গ্রামে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। জঙ্গিত্বের বদনাম এঁটে তাদের পাইকারিভাবে গ্রেফতার করা হচ্ছে। নেতাকর্মীদের এভাবে হয়রানির উদ্দেশ্য হচ্ছে বিএনপিকে নির্বাচনের জন্য অযোগ্য অথবা বেআইনি ঘোষণা করা। চার দিক থেকে যেভাবে বিএনপিকে অসহায় করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে তা সাধারণ সমীক্ষায় দুর্ভাগ্যজনক বিবেচিত হতে বাধ্য।

বিএনপির এ ধরনের স্থানীয় সর্বনাশ সাধন করেও তারা ক্ষান্ত হয়নি। বিএনপি এবং এর নেতৃত্ব সম্পর্কে নানা ধরনের গুজব রটিয়ে জনমনে অস্থিরতা ও অনাস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করছে। রটনা করা হচ্ছে যে, বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া আপস করতে যাচ্ছেন এবং সরকারের সমঝোতার প্রস্তাব গ্রহণে রাজি হয়েছেন। খবরে বলা হয়েছে, “কারারুদ্ধ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাথে গত ৭ মার্চ জেলখানায় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এক বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকে পাঁচ দফা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। প্রথম প্রস্তাবটি হলো সেই পুরনো ‘মাইনাস ফরমুলা’। ফরমুলা অনুযায়ী বেগম জিয়াকে একটি দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। যদি তিনি লন্ডন বা অন্য কোথাও চলে যেতে রাজি হন তাহলে বেগম জিয়ার জামিনের ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে আর কোনো আপত্তি দেয়া হবে না। প্রকাশিত তথ্য মোতাবেক বেগম জিয়া নাকি এই শর্তে রাজি হয়েছেন যে, তাকে বিদেশে থাকলেও নির্বাচিত হওয়ার অধিকার দিতে হবে। আরো শর্ত হচ্ছে এই যে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে; কিন্তু তার পরিবারের কেউ ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এর বিনিময়ে বিএনপি সরকারি বিরোধী দল হওয়ার সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে।”

খবরে আরো বলা হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন মেনে নেবেন। বিএনপির মান রক্ষার জন্য অক্টোবরের দিকে একটি মিনি কেবিনেট গঠিত হবে। উল্লেখ্য যে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এই প্রকাশিত খবরের সাথে কিছু অপ্রকাশিত খবরও রয়েছে। বেগম জিয়াকে রাজি করানোর জন্য নানাবিধ কূটকৌশলের আয়োজন করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে তারা ‘স্ট্রিক অ্যান্ড ক্যারট’ পলিসি অনুসরণ করছে। তারা কারাগারে বেগম জিয়ার সাথে কষ্টকর ও বিব্রতকর ব্যবহার করছে। তাকে এই ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যে, তিনি যদি এতে সম্মত না হন তাহলে চিরজীবনই জেলে থাকতে হবে। সূত্র মোতাবেক তিনি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। স্মরণ করা যেতে পারে, বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অনমনীয় মনোভাবের জন্য আপসহীন নেত্রী খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ আশা করে কোনো ধরনের গজবে তিনি নতি শিকার করবেন না। আর গুজবেও মানুষ কান দেবে না। কারণ, মানুষ খালেদা জিয়াকে চেনে। উপসংহারে খালেদা জিয়ার উদ্ধৃতি দিয়েই শেষ করি, ‘আপনাদের খালেদা জিয়া কোনো অন্যায় করেনি’। দেশবাসী বিশ্বাস করে যে, তিনি কোনো অন্যায় করতে পারেন না।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫