ঢাকা, মঙ্গলবার,১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অবকাশ

পতাকা চারাগল্প

আরাফাত শাহীন

২৫ মার্চ ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

শহিদুল সাহেব বহুক্ষণ ধরে তার ক্লাস ওয়ানপড়ুয়া ছেলের দিকে অপলক তাকিয়ে রয়েছেন। ভারি মায়াবী চেহারা ছেলেটির। একবার তাকালে সহজে চোখ ফেরানো যায় না। বারবার দেখতে ইচ্ছা করে। শহিদুল ইসলাম ছেলের মাঝে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। তার বড্ড ভালো লাগে।
অংকন অনেকক্ষণ ধরে ছবি আঁকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু ছবি কিছুতেই মনের মতো হচ্ছে না। আগামীকাল ওর স্কুুলে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। বাসায় তার প্র্যাকটিস চলছে। অংকনের অনেক বন্ধু স্কুুলে ক্লাস করার পাশাপাশি আঁকা শেখার স্কুুলেও ভর্তি হয়েছে। তারা সবাই সেখানে ক্লাস করে। কত সুন্দর সুন্দর ছবি যে সেখানে আঁকা শেখায়! একদিন প্রত্যয়ের আঁকা একটি ছবি দেখে ও পুরো থ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ এত সুন্দর ছবি আঁকতে পারে কিভাবে! পুরো একটি শহর এঁকে ফেলেছে! অংকনের ওমন সুন্দর ছবি আঁকার বড় শখ হয়। বাসায় রঙ-তুলি সবই আছে। কিন্তু ওকে আঁকা শেখাবে কে? ভাইয়া সারাদিন ব্যস্ত থাকে। তার সময় নেই অংকনকে আঁকা শেখানোর। বাবা নিজে অবশ্য চমৎকার আঁকতে পারেন। মাঝে মধ্যে একটু আধটু সাহায্যও করেন। তবে মূল কাজটি অংকনের নিজেকেই করতে হয়। বাবা বলেন, ‘নিজে নিজে চেষ্টা করে কিছু শিখতে পারলে তবে সেই শেখাটা পূর্ণাঙ্গ হয়। শেখাটা মনে গেঁথে থাকে।’
অংকনের খুব ইচ্ছা আর্ট স্কুুলে ভর্তি হওয়ার। একদিন ও বাবাকে এসে বলল, ‘বাবা, আমি আঁকার স্কুলে ভর্তি হতে চাই। আমার বন্ধুরা স্কুলে ক্লাস করার পাশাপাশি ওখানেও ক্লাস করে।’
ছেলের কথা শুনে শহিদুল সাহেব মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, ‘তোমার বন্ধুরা ওখানে ভর্তি হয়েছে বলেই কি তুমি ভর্তি হতে চাও?’
অংকন সোজাসুজি জবাব দিলো, হ্যাঁ। সে জন্যই আমি ভর্তি হতে চাই। সবাই কত সুন্দর ছবি আঁকে! আমারও ওদের মতো ছবি আঁকতে ইচ্ছে করে।’
‘তোমার আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়া লাগবে না। তুমি নিজে নিজে চেষ্টা করবে। আর সারাদিন স্কুলে ক্লাস করার পর আবার আর্টের ক্লাস করতে গেলে খুবই কষ্ট হয়ে যাবে। আমি তোমার জীবনটাকে যন্ত্র বানাতে চাই না।’
বাবার কথা শুনে অংকনের প্রথম দিকে ভারি রাগ হয়েছিল। বন্ধুরা যদি পারে তাহলে ও পারবে না কেন? পরে ভেবে দেখল, বাবার কথাই আসলে ঠিক। ক্লাস শেষ করে সবাই কেমন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বাবা-মা ওদের জোর করে আঁকার স্কুলে নিয়ে যান। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওদের যেতে হয়। ব্যাপারটা বোঝার পর থেকে আর্ট স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা পুরোপুরি ত্যাগ করল অংকন। বাসায় বসে নিজে নিজেই চেষ্টা করে।
ছবি আঁকার এক ফাঁকে অংকন মাথা তুলে দেখল বাবা ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তার ঠোঁটে হাসির রেখা। বাবাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অংকনের ঠোঁটে অভিমান জমে উঠল। অভিমানমিশ্রিত গলায় অংকন বলল, ‘ওভাবে আমার দিকে চেয়ে হাসছ কেন? আমাকে একটু সাহায্য করতে পারো না?’
ছেলের কথা শুনে শহিদুল ইসলামের ঠোঁটের হাসি আরো চওড়া হলো। ওদিকে অংকনের অভিমান ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে। বাবা বললেন, ‘নিজে নিজে চেষ্টা করো, ঠিকই পারবে।’
‘কিন্তু কী আঁকব সেটাই তো বুঝতে পারছি না!’
‘মন থেকে যেটা আসে সেটাই আঁকো। আর্ট হলো মনের জিনিস। জোর করে কোনো কিছু আঁকা যায় না।’
‘যা ইচ্ছা তাই আঁকলেই হবে! কাল প্রতিযোগিতা। সবাই কত সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকা শিখে আসবে। আর আমি কিছুই শিখতে পারলাম না।’
অংকনের কান্না পায়। সে কি প্রতিযোগিতার আগেই হেরে বসে থাকবে?
অংকনের এমন বেহাল দশা দেখে বাবা এগিয়ে এলেন। তার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘এত হতাশ হচ্ছো কেন? এখনো অনেক সময় আছে।’
শহিদুল সাহেব খাতা আর পেন্সিল নিজের দিকে এগিয়ে নিলেন। তারপর নিজেই আঁকতে শুরু করলেন। প্রথমে একটি আয়তক্ষেত্র, তারপর তার মাঝে আঁকলেন একটি বৃত্ত। রঙপেন্সিল এগিয়ে নিয়ে প্রথমে বৃত্তটা লাল রঙ দিয়ে ভরাট করলেন। তারপর আয়তক্ষেত্রটা পূর্ণ করলেন গাঢ় সবুজ রঙ দিয়ে। হয়ে গেল বাংলাদেশের পতাকা; আমাদের প্রিয় লাল-সবুজের পতাকা। অংকন এতক্ষণ চোখ বড় করে বাবার আঁকা দেখছিল। এবার সে প্রশ্ন না করে পারল না।
‘শুধু একটি পতাকা আঁকলেই হবে? সবাই তো কতকিছু আঁকবে!’
‘মন থেকে যা কিছু সুন্দর তা আঁকলেই হবে। আর পতাকাকে ছোট কিছু ভাবছ কেন? এই পতাকার জন্যই তো লাখ লাখ মানুষ তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। এই পতাকাই তো বাংলাদেশ! তুমি একটি পতাকা আঁকলে মানে পুরো বাংলাদেশকেই আঁকলে!’
অংকন এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল। তাই তো! যে পতাকার জন্য এত জীবন ঝরে গেলো, সেই পতাকা আঁকতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করা উচিত। অংকন এবার পতাকা আঁকাতে মনোনিবেশ করল। কয়েকবারের চেষ্টায় সে যতটুকু আঁকতে পারল বাবা তাই দেখে বললেন, ‘ফার্স্ট ক্লাস’। অংকনের মন খুশিতে ভরে উঠল।
অংকনের স্কুলে আজ ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা। ছুটির দিন হওয়ায় বাবা সাথে এসেছেন। অংকনের কেমন যেন ভয় ভয় করছে। বাবাকে বারবার প্রশ্ন করছে, ‘শুধু পতাকা আঁকলে হবে তো?’
বাবা ওর প্রশ্নের জবাব দিলেন না। শুধু মুচকি মুচকি হাসলেন।
প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেলো। অংকন চারপাশে একবার তাকিয়ে দেখে নিলো। স্কুলের বন্ধুরা বাহারি রঙ ও পেন্সিল নিয়ে এসেছে। ‘ওদের সাথে কিছুতেই পারা যাবে না’Ñ মনে মনে ভাবল অংকন। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আঁকাতে মনোনিবেশ করল। বাবা বলেছেন, ‘যখন যে কাজটি করবে; মনোযোগ দিয়ে করবে। কাজটিতে মনপ্রাণ সব ঢেলে দেবে। দেখবে সফলতা আপনাআপনি এসে ধরা দেবে।’
অংকন মনপ্রাণ ঢেলে দিলো ছবি আঁকায়। কোনোদিকে ওর কোনো খেয়াল নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাগজের বুকে সবুজ আয়তক্ষেত্রের মাঝে টকটকে লাল বৃত্ত ফুটে উঠল। তারপর অংকন পতাকাটিকে একটি ছেলের হাতে ধরিয়ে দিলো। তারসাথে সবুজ শ্যামল গাঁয়ের প্রকৃতি। নিজের আঁকা ছবি দেখে সন্তুষ্টির চিহ্ন ফুটে উঠল অংকনের ঠোঁটে। এখন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিততে না পারলেও কিছু আসে যায় না।
ঘণ্টাখানের মধ্যেই রেজাল্ট ঘোষণা করা হলো। তাতে যে ফলাফল হলোÑ তা রীতিমত বিস্ময়কর। প্রায় দেড় শ’ প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে অংকন প্রথম স্থান অর্জন করেছে। অংকনের কিছুতেই বিশ্বাস হতে চায় না। এমনকি শহিদুল সাহেবের কাছেও ব্যাপারটা কেমন যেন ধাঁধার মতো লাগছে। অংকন যে প্রথম হয়ে যেতে পারে, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। হয়তো ওর ছবিতে ব্যতিক্রম কিছু একটা ছিল। তাই বলে ফার্স্ট!
রেজাল্ট ঘোষণার পরপর পুরস্কারও দেয়া হলো। অংকন মঞ্চে উঠল সবার শেষে। প্রতিযোগিতায় প্রথম হলে তাকেই নাকি সবার শেষে পুরস্কার নিতে হয়। এটাই নাকি নিয়ম! অংকন ব্যাপারটা জানত না। আজ প্রথম জানল। স্কুলের হেড স্যারের কাছ থেকে পুরস্কার নিতে গিয়ে অংকনের বুকটা কেমন যেন ফুলে উঠল। জীবনের প্রথম পুরস্কার পাওয়া বলে কথা!
শহিদুল সাহেব দেখলেন, অংকন র্যাপিং কাগজে মোড়া পুরস্কার হাতে নিয়ে হাসিমুখে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার নিজেরও আজ বড় ভালো লাগছে। অংকনকে কাছে টেনে নিয়ে কপালে চুমু খেলেন। তারপর বুকে টেনে নিলেন।
‘বাবা, এটা খুলে দেখো ভেতরে কী আছে।’
হাসিমুখে বলল অংকন।
‘ত্বর সইছে না বুঝি?’
শহিদুল সাহেবও হাসতে থাকেন।
তারপর প্যাকেটটি খুলে ফেললেন। বাবা-ছেলে দু’জনই অবাক বিস্ময়ে দেখল কাগজের ভেতর লাল-সবুজের একটি পতাকা। অংকন পতাকাটিকে বুকে জড়িয়ে ধরল। এটাই যে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি; আমাদের বাংলাদেশ!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫