ঢাকা, শনিবার,১৬ নভেম্বর ২০১৯

অর্থনীতি

সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ

এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা

২৮ মার্চ ২০১৮,বুধবার, ০০:০০


প্রিন্ট
এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা

এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা

মন্দমানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের মুনাফা থেকে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। গত বছরে এ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে ব্যাংকের ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। এ কারণে ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা কমে নেমেছে ৯ হাজার কোটি টাকায়। যেখানে পরিচালন মুনাফা ছিল ২৪ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্যাংক ভেদে প্রকৃত মুনাফার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদেশী ব্যাংক হিসাবে নিলে গত বছর প্রকৃত মুনাফার দিক থেকে শীর্ষে অবস্থান দখল করেছে বিদেশী ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল এক হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণেরর বিপরীতে প্রভিশন ও করপোরেট ট্যাক্স পরিশোধ করার পর ব্যাংকটির প্রকৃত মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭৬২ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রকৃত মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৬৫৩ কোটি টাকা, যেখানে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল এক হাজার ১৬০ কোটি টাকা। আর খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকটির প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে ১৩৪ কোটি টাকা। মুনাফার দিক দিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রকৃত মুনাফা ৬২৪ কোটি টাকা, যেখানে পরিচালন মুনাফা ছিল এক হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকটির প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে ৩২১ কোটি টাকা। স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রকৃত মুনাফার দিক থেকে শীর্ষে অবস্থানে রয়েছে ন্যাশনাল, ইসলামী ও ব্র্যাক ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রকৃত মুনাফার দিক দিয়ে শীর্ষ দশে থাকা অন্য ব্যাংকগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক ৫২৫ কোটি টাকা, দি সিটি ব্যাংক ৪০৯ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংক ৩৯৮ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ৩৭০ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক ৩৪৩ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংক ৩৪০ কোটি টাকা ও আল-আরাফাহ ব্যাংক ৩০৯ কোটি টাকা।
ব্যাংকারেরা জানিয়েছেন, আদায় অযোগ্য ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর বেশি হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। আর এই বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে কমে যাচ্ছে ব্যাংকের আয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করে তার বেশির ভাগই আমানতকারীদের অর্থ। আমানতকারীদের অর্থ যেন কোনো প্রকার ঝুঁকির মুখে না পড়ে সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। এর অন্যতম হলো প্রভিশন সংরক্ষণ। সাধারণত ঋণ শ্রেণীকরণের তিনটি পর্যায় রয়েছে, তা হলো- নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতি। এই তিনটি পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তাসঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে হয়।


কোনো ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে ঋণের শ্রেণিভেদে ২০ শতাংশ থেকে শতভাগ নিরাপত্তাসঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর এ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে। খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে, আর সে অনুযায়ী ব্যাংকের আয় না হলে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থাৎ ব্যাংকটি যে পরিমাণ আয় করে তা দিয়ে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় ঘাটতি দেখা দেয়। প্রভিশন ঘাটতি হলে ওই ব্যাংকের রিটেইন আর্নিং কমে যায়। এভাবে পরবর্তী সময় সমন্বয় করতে না পারলে মূলধন ঘাটতি দেখা দেয়। আর সেই সাথে ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয়ও (ইপিএস) কমে যায়। আয় কমে গেলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত বছরে (২০১৭) দেশের ৫৮টি ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছিল ২৪ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে মন্দ মানের খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে সাত হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। আর সরকারের কর পরিশোধ করতে হয়েছে সাত হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। প্রভিশন ও ট্যাক্স পরিশোধ করার পর প্রকৃত মুনাফা নেমে এসেছে ৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকায়।


বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংকের দুই কোটি ৯৬ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে বেশি হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করায় ব্যাংকটির মুনাফায় এ অবস্থা নেমে এসেছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৪৪৭ কোটি টাকা, এর মধ্যে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে পরিচালন মুনাফার পুরোটাই। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্যাংক এশিয়া ২২০ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক দুই কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ঢাকা ব্যাংক ২১৫ কোটি টাকা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ২৪৪ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক ১৪৫ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংক ১৭৯ কোটি টাকা, যমুনা ব্যাংক ২১৭ কোটি টাকা, মেঘনা ব্যাংক ৫১ কোটি টাকা, মিডল্যান্ড ব্যাংক ৬৯ কোটি টাকা, মধুমতি ব্যাংক ৭৪ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১১৩ কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংক ২৬৭ কোটি টাকা, এনআরবি ব্যাংক ৪৫ কোটি টাকা, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক সাড়ে ৮৪ কোটি টাকা, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ৪৬ কোটি টাকা, ওয়ান ব্যাংক ২১৬ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক ১০৬ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক ২৩২ কোটি টাকা, সাউথবাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা, শাহজালাল ব্যাংক ১১৯ কোটি টাকা, সীমান্ত ব্যাংক পৌনে তিন কোটি টাকা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ২৩০ কোটি টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংক ২৭০ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ১২৪ কোটি টাকা, দি প্রিমিয়ার ব্যাংক ১৯৮ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ব্যাংক ২০৪ কোটি টাকা, ইউসিবিএল ব্যাংক ২৬৬ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংক ৮৯ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংক ১৫৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
অপর দিকে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ৯৬ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক ৮৭ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংক ৪৮ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংক ২৪ কোটি টাকা এবং বিডিবিএল ব্যাংক ৬০ কোটি টাকার প্রকৃত মুনাফা করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, খেলাপি ঋণের তথ্য অধিকতর যাচাই-বাছাই করলে বেশির ভাগ ব্যাংকেরই প্রকৃত মুনাফা কমে যাবে। কারণ কিছু কিছু ব্যাংক বেশি মুনাফা দেখানোর জন্য খেলাপি ঋণের তথ্য আড়াল করে থাকে। যথাযথভাবে ডাউন পেমেন্ট না নিয়ে খেলাপি ঋণ নবায়ন করে। আবার কেউ কেউ যথাযথভাবে প্রভিশন সংরক্ষণ করে না। আর এর ওপর ভিত্তি করেই প্রকৃত মুনাফা বাড়ানো হয়, যা ক্যাশ ডিভিডেন্ট আকারে পরিচালকেরা নিয়ে যান। এতে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক ভিত্তি আরো দুর্বল হচ্ছে। ২০১৬ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকগুলো যে মুনাফা দেখিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে তা আরো কমে গিয়েছিল। সুতরাং ব্যাংকগুলোর প্রকৃত মুনাফার ওপর ভিত্তি করে ডিভিডেন্ট দেয়ার আগেই ব্যাংকগুলোর তথ্য অধিকতর যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন বলে ওই সূত্র মনে করে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫