ঢাকা, বুধবার,২৬ জুন ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

অপেক্ষা

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

৩০ মার্চ ২০১৮,শুক্রবার, ১৮:২০ | আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০১৮,রবিবার, ১৪:৩৮


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

অপেক্ষা সম্পর্কে আরবি প্রবাদটি এ রকম : ‘আল ইন্তেজার ওয়া মিনাল মওত’। অপেক্ষা বা প্রতীক্ষা মৃত্যুর কাছাকাছি একটি বিষয়। বাংলা ভাষায় অপেক্ষা বা প্রতীক্ষার ব্যবহার গল্প-উপন্যাসে রোমান্টিক অর্থেই বেশি হয়। প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা যেমন মধুর তেমনি আবেগময়। সন্তান কখন মায়ের কাছে আসে, মা সে অপেক্ষায় অপলক চোখে পথের পানে চেয়ে থাকেন। আবার মা যখন বিপদে থাকেন, তখন সন্তান আকুল হয়ে ওঠে।

অস্বীকার করার উপায় নেই- বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের মাতৃসম নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা যেন আর শেষ হয় না। মানুষ অপেক্ষার প্রহর গুনছে : কখন তিনি বেরিয়ে আসবেন, চার দেয়ালের বাঁধন টুটে। কবি গুরুর ভাষায়, ‘বাজিবে তার চরণধ্বনি বুকের শিরে শিরে। /কখন, কাছে না আসিতে সে পরশ যেন লাগিবে এসে, যেমন করে দখিন বায়ু জাগায় ধরণীরে।’ সবারই আশা-ভরসা ছিল আইনে। তবে অনেকের আশঙ্কাও ছিল। আশা-আশঙ্কার দোলাচলে অবশেষে প্রমাণিত হলো ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’। আইন-আদালত, নিয়ম-কানুন, রীতি-নীতি এবং সৌজন্য-শুভেচ্ছার আর কিছু যেন বাকি নেই। অথচ এ দেশে খুনিরা রাষ্ট্রীয় মার্জনা পায়, এ বি এম মুসা কথিত চোরের দাপটে গেরস্তের টেকা দায় এবং দলাদলির গলাগলিতে সব ন্যায়নীতি বিসর্জিত হয়। আর সব কিছুর উৎসমূল ‘ক্ষমতা’।

সচেতন নাগরিকেরা অবগত আছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে রয়েছেন। মামলার রায়ের পর পরই তার আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন। আইন অনুযায়ী ওই দিনই জামিন হওয়ার কথা; কিন্তু জামিন হলো না। রায়ের কপি চাওয়া হলো। অথচ এ ধরনের মামলায় নথি ছাড়াই জামিনের উদাহরণ রয়েছে। রায়ের কপি যেখানে পাঁচ দিনের মধ্যে দেয়ার কথা, সেখানে সরকারের লোকেরা টালবাহানা করে প্রায় ১৫ দিন লাগিয়েছেন। দুদক ও রাষ্ট্র পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার শুনানি পিছিয়ে যায়। ১২ মার্চ হাইকোর্ট থেকে চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয়ার পরের দিনই তা স্থগিত করেন চেম্বার জজ। ১৪ মার্চ চার মাসের জামিন দিয়ে হাইকোর্টের আদেশ ১৮ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। ২৫ ফেব্রুয়ারি শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়। শুনানিতে দুদক ও সরকার পক্ষের সর্বোচ্চ আইনি কর্মকর্তারা রাজনীতির ভাষায় বক্তব্য দিলেন। সরকার পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের মধ্যে বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টির অপচেষ্টা করা হয়।

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল আশা প্রকাশ করেন, আপিলেও বহাল থাকবে খালেদা জিয়ার সাজা। সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে হয়তো নিশ্চিত হয়েই তিনি এরূপ মন্তব্য করে থাকবেন। যা হোক, পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট খালেদা জিয়ার জামিন মঞ্জুর করেছেন। চেম্বার জজের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করলে জামিন তো দূরের কথা, তারা ৮ মে পর্যন্ত প্রদত্ত জামিন স্থগিত করেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতি আপিল বিভাগে এ আদেশ দেন। তারা রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদককে প্রদত্ত শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি প্রদান করেন। আপিল বিভাগের ওই আদেশের দুই ঘণ্টা পর খালেদা জিয়ার সিনিয়র আইনজীবীরা ফের আপিল বিভাগে গিয়ে করজোড়ে শুনানির দিন অবকাশকালীন ছুটির আগেই করার জন্য অনুরোধ করেন। তাদের সে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। এ সময়ে বেগম জিয়ার আইনজীবীরা মন্তব্য করেন, সরকার দুদক এবং আদালত একাকার হয়ে গেছে। বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই এসব ব্যবস্থা। আইনজীবীরা আরো মন্তব্য করেন, এটি একটি নজিরবিহীন রায়।

আদালতের পূর্বাপর ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে এটা কারো বুঝতে কষ্ট হয় না যে, ‘কর্তার ইচ্ছায় কীর্তন’ হচ্ছে। অথচ সরকার বলছে, জামিনের বিষয়টি রাজনৈতিক নয়। গুজব রটেছে, পর্দার অন্তরালে সিংহহৃদয়কে বশীভূত করার প্রচেষ্টা চলছে। বিভিন্ন রকম দেন দরবারে আসন ভাগাভাগির প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। আইনজ্ঞমহল মনে করেন, তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের কূটচাল আর ষড়যন্ত্র পরিচালিত হচ্ছে। অথচ বেগম খালেদা জিয়া অনঢ়, অবিচল ও আপসহীন। ‘জ্বলে পুড়ে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়’। সরকার তাকে ভয় পায়। যেহেতু তার জনপ্রিয়তা সমধিক, সেহেতু তার কারণে শাসকদলের ভরাডুবির আশঙ্কা। সরকার ২০১৪ সালে জেতার জন্য যে নির্বাচন কৌশল গ্রহণ করেছিল, তা এবারে কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। নির্বাচন কারসাজির যে নীলনকশা নিয়ে সরকার অগ্রসর হচ্ছে, তা ১৯৮৮ সালের এরশাদীয় নির্বাচনের সাথে তুলনীয়। ওই নির্বাচনে এরশাদ অনেক সাইনবোর্ডসর্বস্ব দলকে নির্বাচনে আনার মাধ্যমে ‘বহুদলীয় অংশগ্রহণ’ প্রমাণ করতে চেয়েছেন। বিগত নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় ক্ষমতাসীনেরা দেশে ও বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাননি। তাই ক্ষমতাসীনদের রণকৌশলÑ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ দৃশ্যমান করা এবং তাদের পরাজয় সুনিশ্চিত করা। ক্ষমতাসীনদের ধারণা, বিএনপিকে বিভাজন করা সম্ভব হবে। যদি তা করা যায় তাহলে দেখানো যাবে, দেশের প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ নির্বাচনে শামিল হয়েছে। এ ধরনের অপচেষ্টা অতীতেও হয়েছে। এক-এগারোর সরকারের সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংস্কারবাদী বিএনপিকে নিবন্ধন দিয়েছিলেন। তা কাজে আসেনি। পরে অবশ্য তিনি ‘স্যরি’ বলেছিলেন। এ ধরনের বিভাজন সম্ভব না হলে অনেক ভুঁইফোড় দল সৃষ্টি করে জাতীয় পার্টির মতো ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ সৃষ্টি করা হবে। ইতোমধ্যে জিনজিরা মার্কা জাল বিএনপি তথা বিএনএফ নামের একটি বোগাস দলের সৃষ্টি করা হয়েছে। ভোট নষ্ট করার জন্য ধানের শীষের মতো দেখতে গমের শীষ মার্কা হিসেবে তাদের দেয়া হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, একই সময়ে শহীদ জিয়াউর রহমানের নিকটজনকে ভাড়া করা হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়াকে জিরো করার জন্য। উল্টো তারা নিজেরা জিরো হয়ে গেছে।

জনগণের পক্ষ থেকে নির্বাচনের পূর্বক্ষণে গণ-আন্দোলন সৃষ্টির সম্ভবনা রয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে সরকার সহিংসতার অভিযোগ তুলে অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাচন স্থগিত করতে পারে। শক্তি প্রয়োগে যদি গণ-আন্দোলন মোকাবেলা করা সম্ভব না হয়, তাহলে তৃতীয় শক্তিকে হস্তক্ষেপের সুযোগ দিয়ে ‘সসম্মানে’ পশ্চাদ পসরণ ঘটতে পারে। আরেকটি বিকল্প হচ্ছে, বশংবদ বুদ্ধিজীবী এবং অনুগত গণমাধ্যম দিয়ে জাতীয় সরকারের ধুয়া তোলা। এভাবে নিজেদের বাঁচার পথ বেছে নেয়া হতে পারে। এসব চিন্তাভাবনা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চিন্তার ফসল মাত্র।

গণমাধ্যমে যেসব খবরাখবর আসছে, তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। একদল পর্যবেক্ষক মনে করেন, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতায় দীর্ঘকাল থাকা সম্ভব। তারা এ ক্ষেত্রে নিকট অতীতের স্বৈরাচারী হোসনি মোবারক, গাদ্দাফি এবং সুহার্তোর উদাহরণ দেন; কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল তারা ওই ধারণার বিপরীত কথা বলেছেন। বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক মনমগজ, সচেতন শক্তিশালী সিভিল সোসাইটি এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অর্থনৈতিক অবস্থান-সবসময়ই সমতা ও মানবিকতাকে ধারণ করেছে। সুতরাং সুকান্তের ভাষায় বলা যায়, ‘বাংলার মাটি দুর্জয় খাঁটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।’ আর এসবই সম্ভাবনার কথা। গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার কথা। এমনি আশা-আশঙ্কার মায়া মরীচিকায় অপেক্ষমাণ আমরা। আবারো রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ ‘আধেক কায়া আধেক ছায়া জলের পরে রচিছে মায়া/দেহেরে যেন দেহের ছায়া করিছে পরিহাস।’ দেশের মানুষ আবেগের ও ব্যাকুলতার সাথে প্রশ্ন করে- কবে তিনি আসবেন? রাত পোহাবার কত দেরী? বেনজামিন ডিজরাইলির ভাষায় উত্তর, ‘যে অপেক্ষা করতে জানে, তার কাছে সব কিছুই আসে।’ সুতরাং ‘অপেক্ষা- একটি রাত্রি শেষের, অপেক্ষা একটি সূর্যোদয়ের।’

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫