ঢাকা, সোমবার,১৮ নভেম্বর ২০১৯

আমার ঢাকা

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও মানবেতর জীবনযাপন

০৩ এপ্রিল ২০১৮,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে কাজের খোঁজে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে দলে দলে মানুষ আসছে প্রতিদিনই। এটি ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ঢাকায় এসে তারা নানা ধরনের অস্থায়ী কাজ করে। জীবিকার তাগিদে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা এসব গরিব মানুষ থাকার জায়গা হিসেবে ঠাঁই করে নেয় ঢাকার অসংখ্য বস্তির কোনো একটিতে। ফলে রাজধানীতে অপরিকল্পিত নগরায়নের চাহিদা পূরণ না হওয়ায় ক্রমেই বাড়ছে অনিয়মতান্ত্রিক আবাসস্থল বস্তির সংখ্যা। আর এই বস্তিবাসীর জীবনমান খুবই নিম্ন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিরাপত্তাহীন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার এক মানবেতর জীবনযাপন। থাকার জায়গা পেলেও এই বস্তিবাসীর অবস্থা দুর্বিষহ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। ক্ষমতার পালবদলে ঘুরে যায় অনেকের ভাগ্যের চাকা। শুধু ঘোরে না সমাজের এই প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষের ভাগ্য। উল্টো প্রতি বছরই উচ্ছেদ কিংবা অগ্নিকাণ্ডে সর্বস্ব হারাতে হয় হাজারো বস্তিবাসীকে। বহুতল ভবন নির্মাণ করতে বস্তিতে আগুন লাগানোর অভিযোগ আছে বিস্তর। আবার বস্তির এসব মানুষকে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও। ভোটের সময় ভোট প্রার্থীদের তাদের দ্বারস্থ হতে দেখলেও সারা বছর আর কেউ খোঁজ রাখে না। গত দুই দশকে দেশে বস্তির সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সবার আগে আঘাত আসে বস্তিবাসীর ওপর। স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর ১২ নম্বরের ইলিয়াস মোল্লা বস্তিতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় হাজারো ঘর। সর্বস্ব হারিয়ে পথে নামতে হয় বস্তিবাসীকে। ঢাকার বস্তিগুলোয় নানা কারণে প্রায়ই আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এসব অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, গ্যাসের লিকেজ বা অসচেতনভাবে গ্যাসের লাইন থেকে আগুন ধরাসহ নানা কারণ দেখানো হয়; যদিও এর পেছনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় স্বার্থান্বেষীমহলের নানা চক্রান্ত।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উল্টো দিকে কুমিল্লা বস্তি। কুমিল্লা থেকে আসা মানুষের হাত ধরে বস্তিটি গড়ে ওঠায় এটি এখনো কুমিল্লা বস্তি হিসেবে পরিচিত; যদিও ময়মনসিংহ, বাগেরহাট ও খুলনা থেকে আসা মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
রাজধানীর শেরেবাংলানগরে একসময় বিএনপি বস্তি বেশ বড় ছিল। কিন্তু সরকারি অনেক অফিস হয়ে যাওয়ায় এটি এখন অনেক ছোট হয়ে গেছে। সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষই বেশি। রাজধানীর বিএনপি বস্তি, কুমিল্লা বস্তি, তেজকুনিপাড়া বস্তি এবং সবচেয়ে বড় কড়াইল বস্তির মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেল, জীবিকার সন্ধানে প্রতিনিয়ত গ্রাম ছেড়ে শহরে ছুটছে দেশের ছিন্নমূল, ভূমিহীন ও বেকার মানুষ। নিরুপায় হয়ে গ্রামের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে শহরমুখী হচ্ছে এসব খেটে খাওয়া মানুষ। নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও গ্রাম ছাড়ছে অসংখ্য মানুষ। ঢাকায় এলে কাজ পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তায় অনেকে নাড়ির সম্পর্কে ইতি টেনে চলে আসে রাজধানীতে। খেটেখাওয়া হতদরিদ্র মানুষগুলো কাজের আশায় শহরে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে আশ্রয় নিচ্ছে বস্তিতে।
এসব বস্তিতে বসবাসকারী নানা পেশার সাথে জড়িত। কেউ রিকশা চালায়, কেউ ভ্যান, কেউ বাসাবাড়িতে বুয়ার কাজ করে। কেউ রান্না করে বিভিন্ন স্থানে দিয়ে আসে। পোশাকশিল্প, নির্মাণশিল্প, সেবা খাতের বড় একটি অংশে বস্তির মানুষ কাজ করে। আবার বস্তিকে ঘিরে আছে মাদকের জমজমাট ব্যবসায়ও। বেশ কয়েকটি বস্তি ঘুরে জানা গেল, দিনদুপুরে বস্তিতে প্রকাশ্যে চলে মাদক ব্যবসায়। এর সাথে পুরুষ-নারী-শিশু সবাই জড়িত। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে প্রকাশ্যেই চলছে এ ব্যবসায়।
অনেক বেসরকারি সংস্থার মতে, দেশের বস্তিগুলোয় এখন ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস করছে। কেন মানুষ বস্তিতে আসে তার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ৫১ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, কাজের সন্ধানে এসেছে তারা। ২৯ শতাংশ বলেছে, দারিদ্র্যের কারণে। কেউ বলেছে নিরাপত্তাহীনতার কথা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক খবর হলো বস্তিতে বসবাসকারীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার (সাত বছরের ঊর্ধ্বে) মাত্র ৩৩ শতাংশ। পয়ঃনিষ্কাশনের সুবিধা আছে মাত্র ২৬ শতাংশ পরিবারে। আর ৫০ শতাংশ পরিবারে খাবার পানির প্রধান উৎস নলকূপ। বস্তিতে প্রতিদিনই ডায়রিয়া, কলেরা, ঠাণ্ডা, কাশি, অ্যাজমাসহ নানা রোগ লেগেই থাকে। এর কারণ দূষিত পানি ও পরিবেশ। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি কখনো আলোচনায় আসে না। বস্তিতে বসবাসকারী এসব অসহায় মানুষের দরিদ্রতার সুযোগে তাদের ব্যবহার করে প্রভাবশালীরা। বস্তির ছোট শিশুদের দিয়ে মাদক ব্যবসায় করানোর অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। আবার সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা এসব বস্তি। যেকোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সেমিনারে ডাক পড়ে বস্তিবাসীর।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫