ঢাকা, সোমবার,১৮ নভেম্বর ২০১৯

অর্থনীতি

সরকারি তহবিল পেতে বেসরকারি ব্যাংকের প্রতিযোগিতা

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

০৪ এপ্রিল ২০১৮,বুধবার, ০৬:৪৯


প্রিন্ট
সরকারি তহবিল পেতে বেসরকারি ব্যাংকের প্রতিযোগিতা

সরকারি তহবিল পেতে বেসরকারি ব্যাংকের প্রতিযোগিতা

সরকারি তহবিলের ৫০ ভাগ অর্থ পেতে প্রতিযোগিতায় নামছে বেসরকারি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো এই অর্থ নিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দফতরে ইতোমধ্যে যোগাযোগ শুরু করে দিয়েছে। বলা হচ্ছে, তাদের ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো, তারা মুনাফাও ভালো দেন, তাই তহবিলের অর্থ যেন এই ব্যাংকে রাখা হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই অর্থ পেতে অসুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আশ্রয় নেয়া হতে পারে অনৈতিকতার। অভিযোগ রয়েছে, এক শ্রেণীর ব্যাংক সরকারি তহবিল পেতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নানা ধরনের উপঢৌকন দিয়ে থাকে। অতীতে এই অর্থ পেতে দুর্নীতিরও আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এর প্রমাণ হচ্ছে, কোনোরূপ নিয়মনীতি না মেনে জলবায়ু তহবিলের ৫১৯ কোটি টাকা ফারমার্স ব্যাংকে রাখা। এখন সেই ব্যাংক এই অর্থ ফেরত দিতে পারছে না।

অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর এই প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে আমানত রাখার জন্য একটি গাইডলাইন তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে যাতে আর্থিক অনিয়মে জর্জরিত কোনো বেসরকারি ব্যাংক সরকারি তহবিলের অর্থ তাদের ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার সুযোগ না পায়।

বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের চাপে সরকারি তহবিলের ৫০ ভাগ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। আগে এই হার ছিল ২৫ ভাগ। অর্থাৎ সরকারি তহবিলের অর্থ ৭৫ ভাগ থাকত সরকারি ব্যাংকে এবং বাকি ২৫ ভাগ রাখা যেত বেসরকারি ব্যাংকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এ সম্পর্কে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সরকার থেকে প্রাপ্ত তহবিল এবং সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার মোট নিজস্ব তহবিল অর্থ ৫০ ভাগ পর্যন্ত বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবসায় নিয়োজিত বেসরকারি ব্যাংকগুলো রাখা যাবে। অথবা ৫০ ভাগ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) অথবা উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখা যাবে।’ এই নির্দেশনা ৩১ মার্চ ২০১৮ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

জানা গেছে, সরকারি তহবিলের অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে রাখার বিষয়ে কোনো গাইডলাইন এখন পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি। আর এই সুযোগে এক শ্রেণীর ব্যাংক এই তহবিলের অর্থ পেতে নানা নানা ধরনের অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে থাকে।

অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকগুলো সরকারি তহবিলের অর্থ পেতে উৎকোচ, উপঢৌকন, বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ করে দেয়া এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আত্মীয়দের ব্যাংকে চাকরিও দিয়ে থাকে। এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের তহবিল পেতে একটি বেসরকারি ব্যাংকের পক্ষ থেকে আকারে ইঙ্গিতে তাকে মোটা অঙ্কের উৎকোচের অফার দেয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, এই অর্থ পেতে রাজনৈতিক চাপও প্রয়োগ করে থাকে কোনো কোনো ব্যাংক। তারা সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ফোন করে এই অর্থ নেয়ার চেষ্টা করে এবং এতে তারা সফলও হন। উদাহরণ হিসেবে ফারমার্স ব্যাংকের কথা বলা যায়। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকটি জলবায়ু ফান্ডের ৫০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ আমানত হিসেবে নিয়ে নেয়। কারণ তখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলামগীর। তহবিলটি পেতে তার প্রভাব অবশ্যই ছিল। কিন্তু দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম এই ব্যাংক ফান্ডের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। বাছবিচার ছাড়াই যদি সরকারি তহবিলের ৫০ ভাগ অর্থ সমস্যাসঙ্কুল বেসরকারি ব্যাংকে দেয়া হয় তবে তা তছরুপ হবে না এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আর্থিক ও ব্যবস্থাপনার দিক থেকে শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংকে এই অর্থ দেয়া যেতে পারে। কোনোভাবে সব বেসরকারি ব্যাংককে সরকারি তহবিলের ৫০ ভাগ অর্থ দেয়া যাবে না। একটি গাইডলাইন তৈরি করে শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংককে এই অর্থ দেয়া উচিত। গত সোমবার পিআরআই প্রকাশনা ‘পলিসি ইনসাইট’ উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন।

সরকারি তহবিল ব্যবহারের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমান গত বৃহস্পতিবার এই প্রতিবেদকে বলেন, এই বিষয়টি মনিটর করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাদের সেই জনবল ও সক্ষমতা রয়েছে। কোনো ব্যাংক সরকারি তহবিলের কত টাকা পেল তাও মনিটরিং করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫