ঢাকা, সোমবার,১৮ নভেম্বর ২০১৯

অপরাধ

স্ত্রীর পরকীয়ায় রথীশ খুন

খুনের পরিকল্পনা ২ মাস আগে : ঘুমের বড়ি খাইয়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা : মাটির নিচ থেকে বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার : স্ত্রী স্নিগ্ধা ও প্রেমিক কামরুলসহ গ্রেফতার ৫ : ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার পরিকল্পনা নস্যাৎ

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর অফিস

০৪ এপ্রিল ২০১৮,বুধবার, ২৩:০৯


প্রিন্ট
রথীশ চন্দ্র ভৌমিক : স্নিগ্ধা সরকার : কামরুল ইসলাম ; পরিত্যক্ত বাড়ির ফাঁকা রুমের মেঝে থেকে রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের লাশ উদ্ধারের পর ওই এলাকা পরিদর্শন করেন র‌্যাবের ডিজি (বাঁয়ে); হত্যাকাণ্ড বিষয়ে রংপুর সদর দফতরে ব্রিফিং

রথীশ চন্দ্র ভৌমিক : স্নিগ্ধা সরকার : কামরুল ইসলাম ; পরিত্যক্ত বাড়ির ফাঁকা রুমের মেঝে থেকে রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের লাশ উদ্ধারের পর ওই এলাকা পরিদর্শন করেন র‌্যাবের ডিজি (বাঁয়ে); হত্যাকাণ্ড বিষয়ে রংপুর সদর দফতরে ব্রিফিং

স্ত্রী স্নিগ্ধা সরকার দীপার পরকীয়ায় খুন হয়েছেন রংপুরের অ্যাডভোকোট রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা। রথীশকে তার নিজ বাড়িতেই স্ত্রী ও তার প্রেমিক কামরুল মিলে হত্যা করেছেন। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে স্নিগ্ধা তার স্বামীকে হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। পরে তার দেয়া তথ্য মতে নগরীর একটি ভবনের মাটির নিচ থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার করা হয় স্নিগ্ধা ও প্রেমিক কামরুলসহ পাঁচজনকে। এ ছাড়া ভ্যানচালকসহ তিনজনকে আটক করতে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মাধ্যমে অ্যাডভোকেট বাবু সোনা নিখোঁজ রহস্য নিয়ে গত পাঁচ দিনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান হলো। তবে এ ঘটনায় হতবাক নগরবাসী। তারা এ ধরনের ঘটনার কথা কল্পনাও করেননি। কারণ নিখোঁজের পর থেকেই জেএমবিকে সন্দেহ ও জমিজমা নিয়ে বিরোধকে সামনে আনা হচ্ছিল।


রংপুরের বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের অতি পরিচিত মুখ, কাউনিয়ায় জাপানি নাগরিক হোসিও কোনি ও মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলার সরকারপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী, রংপুর বিশেষ জজ আদালতের বিশেষ পিপি এবং রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন অ্যাডভোকোট রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা। মঙ্গলবার রাতে বাবু সোনার লাশ নগরীর তাজহাট মোল্লাপাড়ায় স্নিগ্ধার প্রেমিক কামরুলের বড় ভাইয়ের পরিত্যক্ত বাড়ির খোলা রুমের মাটির নিচ থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় উদ্ধার করেছে র‌্যাব। স্নিগ্ধা ও কামরুল একই স্কুলে শিক্ষকতা করেন।


র‌্যাবের প্রেসি ব্রিফিংয়ে ঘটনার চিত্র : অ্যাডভোকেট বাবু সোনার লাশ উদ্ধারের পর র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বুধবার সকালে হেলিকপ্টারে আসেন রংপুরে। তিনি স্থানীয় র‌্যাব কর্মকর্তাদের নিকট ঘটনার বিস্তারিত জানার পর দুপুর ১২টায় রংপুর র‌্যাব-১৩ সদর দফতরে প্রেস ব্রিফিং করেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাব ডিজি বলেন, প্রাথমিক তদন্তমতে স্ত্রী স্নিগ্ধা সরকার দীপা ভৌমিকের পরকীয়ার জেরে পাবিরারিক অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব, অশান্তির কারণে রংপুর বিশেষ জজ আদালতের পিপি ও আ’লীগ নেতা রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনাকে গত ২৯ মার্চ রাতে নিজ শয়ন কক্ষে হত্যা করা হয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, র‌্যাব-১৩ এর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর আরমিন রাব্বীসহ পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।


দুই মাস আগে রথীশকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় জানিয়ে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, দু’টি চাঞ্চল্যকর মামলার সরকার পক্ষের কৌঁসুলি ও রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট রথিশ চন্দ্র ভৌমিক গত ৩০ মার্চ সকাল ৬টা থেকে নিখোঁজ রয়েছেন মর্মে ওই দিন রাত ১১টায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়। এর পর থেকেই পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি র‌্যাব-১৩ এবং ঢাকা থেকে র‌্যাবের একটি বিশেষজ্ঞ টিম বিষয়টির তদন্ত শুরু করে। পরে তার ভাই সুশান্ত ভৌমিক কোতয়ালি থানায় মামলা করেন।


এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাবের গোয়েন্দা টিম তথ্য পেয়ে মঙ্গলবার রাতে বাবু সোনার স্ত্রী স্নিগ্ধাকে র‌্যাবের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে স্নিগ্ধা সরকার দীপা বাবু সোনাকে হত্যাকাণ্ডের সাথে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন ও লাশের অবস্থান জানান। এ সময় স্নিগ্ধা র‌্যাবকে জানান, পারিবারিক কলহ ছাড়াও পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হয়ে তিনি তার স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন তার প্রেমিক কামরুল ইসলাম। এ ছাড়াও লাশ গুমের মাটি খোঁড়ার সাথে কামরুল ইসলাম সহযোগিতা নেন দুই ছাত্রের।


ব্রিফিংয়ে র‌্যাব মহাপরিচালক আরো জানান, আমরা তার স্ত্রী স্নিগ্ধা এবং দুই ছাত্রকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছি। কি ধরনের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে তা মেডিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যাবে। আমরা আশা করি এ ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।


এদিকে ডিজির ব্রিফিং শেষে র‌্যাব-১৩, রংপুরের সহকারী পরিচালক সহকারী পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মর্তুজা অ্যাডভোকেট বাবু সোনা হত্যার রহস্য উদঘাটন ও লাশ উদ্ধারের বিষয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেন। এতে বলা হয়, অ্যাডভোকেট বাবু সোনা নিখোঁজের ঘটনায় গত ১ এপ্রিল তার ছোটভাই সাংবাদিক সুশান্ত ভৌমিকের দায়েরকৃত মামলার সূত্র ধরে গত মঙ্গলবার রাতে বাবু সোনার স্ত্রী দীপা ভৌমিককে র‌্যাব-১৩ সদর দফতরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে স্নিগ্ধা র‌্যাবকে জানান, পারিবারিক কলহ, সন্দেহ এবং পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হয়ে তিনি স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন তার প্রেমিক ও সহকর্মী তাজহাট উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম। দুই মাস আগ থেকেই তারা এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বাবু সোনার লাশের অবস্থান সম্পর্কেও জানান।


র‌্যাব জানায়, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৯ মার্চ বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে স্নিগ্ধা ভাত ও দুধের সাথে মিশিয়ে ১০টি ঘুমের বড়ি খাওয়ান বাবু সোনাকে। এরপর বাড়ির পেছন দরজা দিয়ে শয়ন কক্ষে প্রবেশ করান প্রেমিক কামরুল ইসলামকে। এক পর্যায়ে বাবু সোনা অচেতন হয়ে পড়লে দু’জনে মিলে বাবু সোনার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে শয়নকক্ষের আলমারিতে লাশ রেখে দেন। পরের দিন ৩০ মার্চ শুক্রবার ভোর ৫টায় শয়নকক্ষ থেকে বের হয়ে যান কামরুল। সকাল ৯টায় কামরুল মরদেহ গুম করার জন্য একটি ভ্যান নিয়ে আসেন এবং স্ত্রী আলমারি পরিবর্তন করার কথা বলে ভ্যানে করে আলমারিতে থাকা লাশ নিয়ে আগে থেকে মাটি খুঁড়ে রাখা সেই বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে নিয়ে বেলা ১১টার মধ্যে লাশ বস্তাতে ভরে পুঁতে রাখেন। বাড়ি থেকে আলমারি বহন করে ভ্যানে তোলার জন্য তিনজন লোকও ঠিক করেন কামরুল।


র‌্যাব জানায়, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৬ মার্চ রাতে প্রেমিক কামরুল ৩০০ টাকার বিনিময়ে তাজহাট উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র সবুজ ইসলাম ও রোকনুজ্জামানকে দিয়ে তাজহাট মোল্লাপাড়ায় কামরুলের বড় ভাই খাদেমুল ইসলামের পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের খোলা রুমের মেঝের বালু খুঁড়ে রাখে। মঙ্গলবার রাতে স্নিগ্ধার দেখিয়ে দেয়া স্থান থেকে বাবু সোনার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।


ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা : তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সূত্র মতে, হত্যার ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে স্নিগ্ধা ও কামরুল নানামুখী কৌশল নেন। এ জন্য তারা জাপানি নাগরিক কোনিও হোসি ও মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলার রায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামের মামলার সাক্ষী এবং ডিমলায় রাজ দেবোত্তর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের প্রসঙ্গকে সামনে নিয়ে আসেন। এরই অংশ হিসেবে তারা হত্যাকাণ্ডের দিন বেছে নেন ২৯ মার্চ বৃহস্পতিবার রাতে। ওই রাতেই বাবু সোনার ভাই সাংবাদিক সুশান্ত ভৌমিক অফিসিয়াল কাজে ঢাকায় যান।


তদন্ত সূত্রগুলো জানায়, সুশান্ত ভৌমিকের ঢাকায় যাওয়ায় ওই রাতেই তারা হত্যার পরিকল্পনা করেন। বৃহস্পতিবার রাতে বাবু সোনা বাড়ি ফেরার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী রাতের খাবারে ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়। হত্যাকাণ্ডের পরপরই তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে সিম সরিয়ে ফেলেন স্নিগ্ধা ও তার প্রেমিক কামরুল।


তদন্ত সংস্থাগুলোর সূত্র মতে, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে স্নিগ্ধা প্রেমিক কামরুলকে বাড়ির পেছনে নিয়ে এনে রাখেন। এরপর শুধু স্বামীকেই নয়, তার নবম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়েকেও তিনি চারটি ঘুমের ট্যাবলেট দুধের সাথে খাইয়ে অচেতন করে রাখেন। পরিবারের কেউ যাতে সন্দেহ করতে না পারে সে জন্য আলমারি পরিবর্তনের নাটক সাজিয়ে ভ্যানে করে মরদেহ বাড়ির বাইরে নিয়ে পুঁতে রাখেন। এরপর একই ভ্যানে একটি নতুন আলমারি এনে শয়নকক্ষের সেই জায়গায় রেখে পরিবারের লোকজনকে জানান, ওই আলমারিটা স্কুলে দিয়ে নতুন আলমারি নিয়ে এলাম। এরপর বেলা ৩টায় তিনি ঢাকায় অবস্থানরত তার দেবর সুশান্ত ভৌমিককে জানান, বাবু সোনার ফোন বন্ধ। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাতে বিষয়টি জানতে পেরে মিডিয়া কর্মীরা তার বাড়িতে ভিড় জমান।


পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঘটনাটিকে জেএমবি অথবা জামায়াত শিবিরের ওপর চাপিয়ে দিতে স্নিগ্ধা গণমাধ্যমকর্মীদের সাক্ষাৎকার দিয়ে জানান, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে গোসল শেষে কাজের কথা বলে নগরীর তাজহাট বাবুপাড়ার বাসা থেকে আমার স্বামী পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তির সঙ্গে একটি লাল মোটরসাইকেলে করে চলে যান। যাওয়ার সময় বলেছিলেন দুপুর ১২টার মধ্যেই ফিরে আসবেন। কিন্তু দুপুরে ফিরে না আসায় কল দিলে মোবাইল ফোন বন্ধ পাই। এরপর বিষয়টি আমি আমার দেবর সাংবাদিক সুশান্ত ভৌমিককে জানাই। এরপর থেকে তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। এরপর আমরা বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করি।


এ সময় তিনি সাংবাদিকদের আরো বলেছিলেন, আমার স্বামী রংপুরের জাপানি নাগরিক কোনিও হোসি এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলার সরকার পক্ষের প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন। ওই দুটি মামলায় জেএমবি সদস্যদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হওয়ার পর থেকেই আমার স্বামীকে বিভিন্নভাবে মোবাইলে হুমকি দেয়া হচ্ছিল। ওই রায়ের কারণে জেএমবি আমার স্বামীর প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। আমার স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার সাথে জেএমবি সদস্যরা জড়িত থাকতে পারে। আমি অবিলম্বে আমার স্বামীকে সুস্থভাবে ফিরে পেতে চাই।


এরপর তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী শনিবার সকালে সেখানে উপস্থিত একজন কলা ব্যবসায়ীকে দিয়ে সাংবাদিকদের বলানো হয়, সকাল ৬টার দিকে বাবু সোনার বাড়ির সামনে পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তিকে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখেছেন। তবে তাকে তিনি চেনেন না। কিছুক্ষণ পর অ্যাডভোকেট সাহেব ওই মোটরসাইকেলে চরে আরকে রোড দিয়ে জমিদার বাড়ির দিকে গেছেন বলেও শনিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন ওই কলা ব্যবসায়ী।


এদিকে ঘটনা শুনে রাতেই ঢাকা থেকে ফিরে আসেন অ্যাডভোকেট বাবু সোনার ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক। শনিবার সকালে তিনি সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি আমি পুলিশ সুপারকে অবহিত করার পাশাপাশি থানায় জিডি করেছি। যেহেতু আমার ভাই জাপানি নাগরিক ও মাজারের খাদেম হত্যা মামলার সরকার পক্ষের কৌঁসুলি। ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ড হয়েছে জেএমবি সদস্যদের। এ ছাড়াও আমার ভাই জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এ টি এম আজহারুল ইসলামের মামলারও অন্যতম সাক্ষী। আমরা মনে করছি ঘটনাটির সাথে জেএমবির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।


শনিবার রংপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানিয়েছিলেন, অ্যাডভোকেট বাবু সোনা নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তার পরিবার শুক্রবার রাত ১১টায় পুলিশকে জানিয়েছে। এরপর থেকেই আমরা তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কাজ করছে বলেও জানান পুলিশ সুপার।


তদন্ত সূত্রগুলোর তথ্য মতে, ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে শনিবার সকালে চতুর স্নিগ্ধা ও তার প্রেমিক কামরুল তাজহাট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়ক দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন। এ ছাড়াও তাদের নিজস্ব কিছু লোক দিয়ে বাবুপাড়া এলাকায় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করান। এরপর থেকে নগরীতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ পেশাজীবী বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে বাবু সোনার উদ্ধারের দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, স্মারকলিপি পেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে থাকে। এসব কর্মসূচিতে এ ঘটনার সাথে জেএমবি জঙ্গি ও জামায়াত শিবির এবং দেবোত্তর সম্পত্তির বিষয়টির প্রতিও আলোকপাত হতে থাকে।


তদন্তসূত্রগুলো জানায়, স্নিগ্ধা ও কামরুল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। কিন্তু পুলিশ বাবু সোনার সহকারী মিলন মোহন্তকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর স্নিগ্ধার পরকীয়ার বিষয়টি তদন্তে যোগ হয়। এরপর সোমবার গ্রেফতার করা হয় তার প্রেমিক কামরুল ইসলামকে। তার কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ কোন পদ্ধতিতে বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে তার কৌশল নির্ধারণ করতে থাকে। এরপর ঘটনাটির সাথে ভিন্ন কিছু আছে মনে করে পরিবারের অন্য সদস্যরা পুলিশকে অবহিত করে। তারা মঙ্গলবার পুলিশ ও র‌্যাব দিয়ে বাড়ির পেছনে গোয়ালঘরে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি ডোবা সেচিয়ে নেন। এতে বেশ কিছু আলামত উঠে আসে। এক পর্যায়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় র‌্যাব নিশ্চিত হয়, এ হত্যাকাণ্ড স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে ঘটেছে। তারা নিশ্চিত হয়ে স্নিগ্ধাকে আটক করার পর জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি স্বামীকে খুনের কথা স্বীকার করেন।


তদন্ত সূত্রগুলো জানায়, কামরুলের বড় ভাই খাদেমুল ইসলাম ১০ বছর আগে বাড়িটির ছাদ ঢালাই করার পর আর কোনো কাজ করেননি। চাকরির সুবাদে ঢাকায় অবস্থান করেন তিনি। কামরুল ওই বাড়িতেই মরদেহ গুম করার সিদ্ধান্ত হিসেবে স্কুলের কয়েকজন ছাত্রকে কৃষি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে বলে গর্ত খুঁড়িয়ে নেন। এ ছাড়াও সেখানে তিনি কোচিং কাস করাবেন বলেও স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জানান। তদন্ত সূত্রগুলোর ধারণা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই কামরুল ও স্নিগ্ধা ওই সংস্কারের নামে বাড়িটির মেঝে ঢালাই করে ফেলতেন এবং কেউ যাতে বুঝতে না পারে সেজন্য কোচিংও শুরুর পরিকল্পনা করেছিলেন। এদিকে তদন্ত সূত্রগুলোর তথ্য মতে, বাবু সোনার সহকারী মিলন মোহন্ত কামরুলের সাথে স্নিগ্ধার পরকীয়ার বিষয়টি জানত। সে কারণে মিলন মোহন্তকে স্নিগ্ধা কোনোভাবেই চটাতে চাইতেন না। এমনকি মিলন তার মেয়েকে উত্ত্যক্ত করলেও স্নিগ্ধা তাতে সায় দিতেন বলেও জানায় তদন্তরত সংস্থাগুলোর বিভিন্ন সূত্র।


রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান সাইফ জানান, অ্যাডভোকেট বাবু সোনার মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত চলছে। ভিসেরা তদন্তের জন্য আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫