ঢাকা, সোমবার,১৮ নভেম্বর ২০১৯

অর্থনীতি

ব্যাংকিং খাতের অনিয়মে এক বছরে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি টাকা

সানেমের গবেষণা প্রতিবেদন

বিশেষ সংবাদদাতা

০৪ এপ্রিল ২০১৮,বুধবার, ২৩:২৭ | আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০১৮,বুধবার, ২৩:৪০


প্রিন্ট
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সানেমের সংবাদ সম্মেলন

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সানেমের সংবাদ সম্মেলন

ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের কারণে এক বছরে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা ও রাজনীতির লোককে ব্যাংক খাতে নিয়োগদান। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং’ (সানেম)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতে একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি অনেক মানুষের আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিককালে হোটেলে বসে সিআরআর কমানো এবং সরকারি তহবিলের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে।


বাংলাদেশে অর্থনীতির ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা –শীর্ষক প্রতিবেদনটি গতকাল গুলশানের এক হোটেলে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন সানেমের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. বজলুল হক খোন্দকার, সানেমের পরিচালক ড. বিদিশা ও ইফফাত তানজুম।
অনুষ্ঠানে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বেসরকারি ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট দূর করার জন্য সরকার সিআরআর কমিয়ে মোটেও ভালো কাজ করেনি। এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত এবং যে প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে তা যথাযথ হয়নি।


প্রতিবেদনে বলা হয়, জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম মডেল ব্যবহারের মাধ্যমে মূল্যায়ন করে দেখা গেছে যে, ব্যাংকিং সেক্টরে অদতা বর্তমান পর্যায়ে জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ বার্ষিক তি, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন এ পরিমাণ অর্থ সিআরআর কমিয়ে ব্যাংকগুলোকে দেয়া হচ্ছে।


সাম্প্রতিক সময়কার ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট অনেক দিন ধরে চলমান কাঠামোগত সমস্যার ফল হিসেবে উল্লেখ করে এতে বলা হয়, এ খাতে অত্যধিক মাত্রায় অনাদায়ী ঋণ রয়েছে, যা বর্তমানে ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর সাথে ঋণ পুনঃতফসিল ও অবলোপন ধরলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ (এক লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা) হবে। বাংকিং খাতে একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি অনেক মানুষের আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে অত্যধিক মাত্রায় ঋণ দেয়ার কারণে এডিআর (অ্যাডভান্স ডেপোজিট অনুপাত) রেশিও ৯০ ভাগের ওপরে দাঁড়িয়েছে।


সানেমের প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, এ ধরনের অত্যধিক ঋণদানের কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। এখানে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এ ঋণের একটি বড় অংশ অপচয় হচ্ছে। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেণ ব্যাংকিং খাতের একটা বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দ্বারা সমর্থিত অনিয়মের কোনো দৃশ্যমান শাস্তি পরিলতি হচ্ছে না। এ ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারায় এ সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।


এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো তাদের তহবিলের ৫০ শতাংশ প্রাইভেট ব্যাংকগুলোতে জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সিআরআর ১ শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশে আনার ফলে ব্যাংকিং খাতে বড় সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে।

 

সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানো উচিত নয় : সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার কমানো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয় উল্লেখ করে সেলিম রায়হান বলেন, কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, ব্যাংক আমানতের সুদের হার ও সঞ্চয়পত্রের সুদের হারের অসামঞ্জস্য থাকার জন্য ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কিন্তু এ পর্যবেক্ষণ ঠিক নয়। কারণ কয়েক বছরের ব্যাংক আমানতে গড় সুদের হার বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি সঞ্চয়পত্রের সুদের হারের সাথে তার খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। এর পরও মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্র কিনেছে। এর কারণ ব্যাংকগুলোর ওপর মানুষের আস্থার অভাব। তাই সঞ্চয়পত্রে সুদের হার এ মুহূর্তে কমানো ঠিক হবে না। কারণ এখানে পেনশনাররা বিনিয়োগ করে থাকেন।

 

আগামী বছরের বাজেট : পূর্ববর্তী বাজেটের অভিজ্ঞতার আলোকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলো করের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ কমানো, আয়কর প্রক্রিয়ায় দুর্বল কর্মদক্ষতা, এডিপি বাস্তবায়নে ঘাটতি, জনস্বাস্থ্যের মান ও মানব উন্নয়নে স্বল্প ব্যয়।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ গত মাসে প্রথম পর্যালোচনায় স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের তিনটি শর্ত পূরণ করেছে। আশা করা যায়, ২০২১ সালে দ্বিতীয় পর্যালোচনায়ও বাংলাদেশ এসব শর্ত পূরণ করে ২০২৪ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নীত হবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে দেশের সমতার ভাবমর্যাদার ইতিবাচক পরিবর্তন হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সি দ্বারা নির্ণীত উচ্চমাত্রার বিনিয়োগের হার বৃহৎ আকারের বৈদেশিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে। তবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের কিছু আশঙ্কার কারণও রয়েছে। গ্লোবাল ডায়নামিক ইকুইলিব্রিয়াম মডেলের অনুকরণ ফলাফলটি সুপারিশ করে যে, ২০২৭ সালের মধ্যে (বাংলাদেশ ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা পেলে ২০২৭ পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায়, জাপান, ভারত ও চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য তখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রবেশের সুবিধা হারাবে। এর ফলে দেশের মোট রফতানি ১১ শতাংশ কমে যাবে, যা রফতানি বৃদ্ধির বর্তমান প্রপেণের সাপেক্ষে ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমতুল্য হতে পারে। এ ছাড়াও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শুল্কমুক্ত সুবিধা, ভর্তুকি ও মেধাস্বত্ব সম্পর্কিত (যেমন- ওষুধ শিল্পের ক্ষেত্রে) অনেক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে। স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ার কারণে যেসব সুবিধা বাংলাদেশ ভোগ করছে, সেগুলো ২০২৭ সালের পর আর থাকবে না। উপরন্তু বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংকের ‘নিম্ন আয়’ থেকে ‘নিম্ন মধ্য আয়’ এর ক্যাটাগরিতে উন্নীত হওয়ায় স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা সীমিত পরিসরে নেমে আসবে। এ ক্ষেত্রে এসব সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টি ‘স্বয়ংক্রিয়’ না হলেও উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়ে গেলে ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে’ এসব সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ।


অতএব এসব সুবিধা ছাড়াই সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আগামী ৯ বছরে প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫