ঢাকা, রবিবার,১৬ জুন ২০১৯

দেশ

সিলেটে মা-ছেলে খুন : নেপথ্যে দেহব্যবসা

এনামুল হক জুবের সিলেট ব্যুরো

১০ এপ্রিল ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৮:২৫


প্রিন্ট
সিলেটে মা-ছেলে খুন : নেপথ্যে দেহব্যবসা

সিলেটে মা-ছেলে খুন : নেপথ্যে দেহব্যবসা

সিলেট নগরীর মিরাবাজারের খারপাড়ায় মা-ছেলের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিজেদের সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন গ্রেফতারকৃত তানিয়া ও তার কথিত স্বামী মামুন। জবানবন্দিতে তারা অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ইয়াবা ব্যবসার কথা তুলে ধরেছে। সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) অমূল্য কুমার চৌধুরী।

মঙ্গলবার দুপুরে জানান সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হরিদাস কুমারের আদালতে নিজেদের জড়িয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় জোড়া খুনের মামলার গ্রেপ্তার হওয়া তানিয়া-মামুন দম্পতি। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন । এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় পিবিআই থেকে গ্রেফতারকৃত তানিয়া ও মামুনকে বুঝে পান সিলেট কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গৌসুল হোসেন। এরপর রাতেই ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তারা দীর্ঘক্ষণ জবানবন্দি দনয় বলে জানান ওসি।

জবানবন্দিতে তারা দু’জন কেন এবং কীভাবে খুন করে তা আদালতকে জানান। তারা জানান, রোকেয়া বেগম ও তার ছেলে রবিউল ইসলাম রোকনকে অচেতন করে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে তারা। তাদের পরিকল্পনায় ছিলো রোকেয়ার পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলা। ভাগ্যবশত বেঁচে যায় শিশু রাইসা। খুনের পর তারা ওই দিন রাতেই রোকেয়ার বাসা ত্যাগ করে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা রাস্তায় ফেলে দেয়। পুলিশ জানায়, রোকেয়ার ইয়াবা ব্যবসা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি জবানবন্দিতে তুলে ধরা ছাড়াও বিশদ বর্ণনা দেয় তারা।

জানা গেছে, মামুন ও তানিয়াকে গ্রেফতারের পর সিলেটের উপশহরস্থ পিবিআই’র কার্যালয়ে তাদেরকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এতে মিরাবাজারের খারপাড়ায় মা-ছেলে খুনের ঘটনায় তারা সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তানিয়া এবং তার স্বামী মামুনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে সোমবার সন্ধ্যা রাতে প্রেস ব্রিফিং করেন পিবিআই সিলেটের বিশেষ পুলিশ সুপার রেজাউল করিম মল্লিক।

তিনি বলেন, রোকেয়া ও তার ছেলে রোকনকে নিজ হাতে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন তানিয়া ও তার স্বামী। তারা বলেছেন, রোকেয়ার সাথে তানিয়ার পরিচয় বছর দু’য়েক আগে। কুমিল্লার তিতাস উপজেলার মেয়ে তানিয়া সিলেটে মাজারে এলে সেখানে তার সাথে পরিচয় হয় রোকেয়ার। তাদের মধ্যে গড়ে উঠে ছোট বোন-বড় বোন সম্পর্ক। পরে নিজের বাসায় তানিয়াকে আশ্রয় দেন রোকেয়া। সেখানে থেকেই রোকেয়ার মাধ্যমে তানিয়া দেহ-ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পরেন। রোকেয়ার বাসায় দেহ ব্যবসা ছাড়াও চলত মাদক বিক্রি ও সেবন। বছর খানেক আগে মামুনের সাথে তানিয়ার বিয়ে হলেও বিষয়টি জানত না মামুন। বিয়ের পর প্রায়ই তানিয়া রোকেয়ার বাসায় আসত। এর পেছনে কারণ ছিল তার দেহ ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ততা। মাস খানেক আগে মামুনকে না বলেই রোকেয়া এবং আরো কয়েকজনের সাথে কক্সবাজার ঘুরতে যায় তানিয়া। মামুন বিষয়টি বুঝতে পেরে তানিয়ার কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সে সবকিছু খুলে বলে । তানিয়ার ভাষ্য, রোকেয়াই তাকে এসবের সাথে সম্পৃক্ত করেছে। এরপর থেকেই রোকেয়ার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে মামুন ও তানিয়া। এর কিছু দিন পরই রোকেয়া ও তার পরিবারকে হত্যার পরিকল্পনা করে তানিয়া দম্পতি।

পিবিআই’র এ শীর্ষ কর্মকর্তা আরো জানান, পূর্ব পরিকল্পনা থেকেই ঘটনার দিন শুক্রবার (৩১ মার্চ) সন্ধ্যার দিকেই তানিয়া ও তার স্বামী মামুন রোকেয়া বেগমের বাসায় যায়। ওইদিন রাতে তারা রোকেয়া এবং তার ছেলে-মেয়েকে খাবারের সাথে ঘুমের ওষুধ খায়িয়ে অচেতন করে। রাত আনুমানিক ২টার দিকে মামুন ছুরি দিয়ে রোকেয়ার গলায় আঘাত করে এবং পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে রোকেয়ার শরীরে শতাধিক ছুরিকাঘাত করেন। এরপর তারা রোকেয়ার ছেলে রোকনকে ছুরিকাঘাত করে এবং গলাটিপে মৃত্যু নিশ্চিত করে। জীবিত উদ্ধার হওয়া রোকেয়া বেগমের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে রাইসাকেও তারা হত্যার উদ্দেশ্যে ঘুমের ঔষধ খাওয়ায় এবং গলা চেপে ধরে। রাইসাও মারা গেছে এমন ধারণায় তারা রাতেই ওই বাসা ত্যাগ করে। এর পর তারা কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় তানিয়ার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। পথিমধ্যে কোনো এক যায়গায় তারা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও কাপড় ফেলে যায় বলেও জানান পিবিআই’র এ কর্মকর্তা।

উল্লেখ্য, গত ১ এপ্রিল দুপুরে নগরীর মিরাবাজার খাঁরপাড়ার মিতালী আবাসিক এলাকার একটি ভবনের নিচতলা থেকে রোকেয়া বেগম ও তার ছেলে রবিউল ইসলাম রোকনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় রোকেয়ার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে রাইসা বেগমকে আহতাবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ওই বাসায় তানিয়া থাকলেও হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি উধাও ছিলেন। ঘটনার দিন রাতেই নিহত রোকেয়া বেগমের ভাই জাকির হোসেন কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার পর গত ৪ এপ্রিল শহরতলীর বটেশ্বর এলাকা থেকে নাজমুল হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে ৭ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেয়া হয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫