ঢাকা, সোমবার,১৮ নভেম্বর ২০১৯

মতামত

শহীদ মাহফুজের মা স্কুলটি কি দেখে যেতে পারবেন না?

ড. মোজাফফর হোসেন

১৮ এপ্রিল ২০১৮,বুধবার, ১৬:০৪


প্রিন্ট
প্রতিকী ছবি

প্রতিকী ছবি

২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল। কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী সীমান্তের বড়ইবাড়ী গ্রামে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ আন্তর্জাতিক আইনকে উপক্ষো করে অবৈধভাবে বাংলাদেশ সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়ে গ্রামবাসীর ওপর নির্যাতন ও লুটতরাজ চালায়। অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এসব হামলাকারীকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে বিডিআরের (বর্তমান নাম বিজিবি) ৩৩ ব্যাটালিয়ানকে সম্মুখযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়। তখন বিএসএফের ১৬-২৬ জন (মতান্তর) সদস্য নিহত হয়। বাংলাদেশ রাইফেলসের তিনজন সদস্য ল্যান্স নায়েক মো: ওয়াহিদ মিয়া (৩৯৮০৯), সিপাহী মো: মাহফুজুর রহমান(৫৫৯৪৪) এবং সিপাহী মো: আব্দুল কাদের (৪৮৯৮৫) ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এ ঘটনা সমগ্র বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয় এবং উল্লেখযোগ্য খবর হয়ে ওঠে বিশ্বগণমাধ্যমে। ঘটনার অব্যাহতি পরপরই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শুরু হয় শহীদ পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেয়া। শহীদ পরিবারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সমবেদনা জানানো হলেও সেসব প্রতিশ্রুতি পূরণ তো দূরের কথা, এখন আর কেউ তাদের খোঁজখবরই রাখেন না। শহীদ ল্যান্স নায়েক মো: ওয়াহিদ মিয়া (৩৯৮০৯) স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। শহীদ সিপাহী মো: আব্দুল কাদেরও (৪৮৯৮৫) মৃত্যুর সময় স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তান রেখে যান। এই এতিম স্ত্রী-সন্তানদের অভিভাবক যে রাষ্ট্র, সে কথা বারবার ভুলে যেতে থাকে। রাষ্ট্র এখন আর এই শহীদদের স্ত্রী-কন্যাসন্তানদের খোঁজখবর রাখার প্রয়োজন মনে করে না।

শহীদ সিপাহী মাহফুজুর রহমান দেশমাতৃকার সম্মান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়েছে। শহীদ হওয়ার সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৩০ বছর। অবিবাহিত এ সৈনিক ছয় সদস্যের পরিবারের প্রথম সন্তান। বাবা স্কুল মাস্টার ও মা গৃহিণী। প্রথম সন্তানকে হারিয়ে মা-বাবা শোকে স্তব্ধ হলেও ছেলে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য শহীদ হয়েছেন জেনে আনন্দবেদনায় নিজেদের কোনো রকমে সামলে রাখেন। জ্যেষ্ঠপুত্রের অকাল মৃত্যু বাবার হৃদয়কে ক্রমান্বয়ে ব্যথাতুর করে তোলে। ২০০৭ সালে বাবা আমজাদ হোসেন পরলোকগমন করেন। স্বামী-সন্তানকে হারিয়ে মা মাহফুজা রোগেশোকে বাকরুদ্ধ ও মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় ছোট ছেলে মাহমুদুল হাসানের কাছে আছেন। কিন্তু মাঝে মাঝেই তিনি মাহফুজুর রহমানকে স্মৃতিতে দেখতে পান। মাহফুজ আসছে এই ভেবে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য চাবি হাতে করে দাঁড়িয়ে থাকেন।

উল্লেখ্য, তৎকালীন সরকারপ্রধান কর্তৃক শহীদ সিপাহী মাহফুজুর রহমানসহ সবাইকে (মরণোত্তর) বাংলাদেশ রাইফেলস পদকে ভূষিত করা হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ পরিবারের মধ্যে চেক বিতরণ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ মাহফুজুর রহমানের বাবা-মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন তারা কী চান? সে দিন ‘শহীদ মাহফুজুর রহমানের নামে একটি স্কুল’ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছাপোষণ করেন। এর কয়েক দিন পর জয়পুরহাট ০৩ রাইফেলস্ ব্যাটালিয়নের সামনের রাস্তার পশ্চিম পাশে ওই সময়ের বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল ফজলুর রহমান শহীদ মাহফুজুর রহমানের বাবা-মাকে সাথে নিয়ে তার নামে বিদ্যালয়ের ভিত্তিস্থাপন করেন। তবে সতেরো বছর পরে স্কুল নির্মাণের কাজ এখনো শুরু করা হয়নি। কেন কাজটি শুরু করা গেল না, তারও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না। ওই সময় স্কুলের যে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল তা আর চোখে পড়ে না। অথচ সে সময়ে সরকারি দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের অনেক মন্ত্রী, এমপি ও নেতারা মাহফুজুর রহমানের পরিবারকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য তাদের বাসায় ছুটে গিয়েছেন। সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ঢাকার পিলখানার এক অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারকে দাওয়াত করে তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু আজ আর কেউ বড়াইবাড়ি সীমান্তের শহীদ পরিবারের ভালোমন্দের খোঁজখবর রাখেন না; এমনকি স্কুলটিও আলোর মুখ দেখতে পেল না। মাহফুজের বাবা শহীদ ছেলের নামে স্কুলের ভিত্তিস্থাপন দেখে গেছেন কিন্তু স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার ব্যথা নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন। মাও যেকোনো সময় পরপারে চলে যেতে পারেন। যাওয়ার আগে তিনিও স্কুলটি দেখে যেতে পারবেন কি না সন্দেহ রয়েছে। যারা সন্তানের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ধনসম্পদ, টাকাপয়সা, অর্থকড়ি কোনো কিছুই না চেয়ে জাতির জন্য একটি স্কুলের প্রত্যাশা করলেন; এ দেশ তাদের সে প্রত্যাশাও পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে কেন? এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হলে বিজিবি সদস্যদের ছেলেমেয়েরাই সেখানে পড়ালেখা করবে, এতে মাহফুজুর রহমানের প্রতি হয়তো একটু সম্মান প্রদর্শন করা যাবে।

স্থানীয় নেতৃবৃন্দের অনেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মাহফুজুর রহমানের নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হবে। সময়ের ব্যবধানে কাউকেই সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে না। অথচ তার মা সে প্রত্যাশা পূরণের জন্য নিভু নিভু চোখে আজো মুখ চেয়ে বসে আছেন।

কুড়িগ্রামের রৌমারির বড়াইবাড়ি সীমান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনা ভারতের প্রতিবেশীসুলভ আচরণ নয়। প্রতিবেশীর স্বভাবচরিত্র ভালো হলে সে প্রতিবেশীর হৃদ্যতায় অন্যরা শান্তিতে ঘুমানোর নিশ্চয়তা পায়। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে, প্রতিবেশী ভারতের কাছ থেকে সে হৃদ্যতা বারবার চেয়েও বাংলাদেশী জনগণ পায়নি। ভারত বরাবরই সীমান্তে অবৈধভাবে শক্তি প্রদর্শন করে বাংলাদেশকে পরাস্ত করতে চেয়েছে। প্রতিবেশী বড় রাষ্ট্র হওয়ার ক্ষমতায় ভারত সীমান্তের অদূরে বসবাসরত নিরীহ বাংলাদেশীদের ওপর গুলি চালিয়ে বাংলাদেশী বহু হত্যা করছে। ধরে নিয়ে নির্যাতন চালিয়েছে; খুন করে কাঁটাতারের বেড়াতে লাশ ঝুলিয়ে রেখেছে। এসব ঘটনা বিএসএফর অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে অসংখ্যবার দেনদরবার হলেও ভারত বরাবরের মতোই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাদের স্বভাবসুলভ বৈরি প্রদর্শন করেছে। ২০০১-এর ১৮ এপ্রিলও পূর্ব অভ্যাসবশত রাতের অন্ধকারে ভারতের বিএসএফ আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে ঢুকে পড়লে প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষায় সীমান্তের অতন্দ্রপ্রহরী বিডিআর জোয়ানরা অসম সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলে দেশ রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেন। বিডিআরের সে দিনের সাহসিকতার সাথে একাত্ম হয়েছিলেন স্থানীয় হাজার হাজার জনতা। তারা মাতৃভূমি রক্ষার দৃপ্তপ্রত্যয়ে যার কাছে যা ছিল তাই নিয়ে বিডিআরকে সাহায্য করেছিলেন। হতাহতের ঘটনার পর বিএসএফকে হত্যার অভিযোগ এনে ভারত সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে বিডিআরের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার অভিযোগে গ্রামবাসীও বিএসএফের বিরুদ্ধে রৌমারী থানায় মামলা দায়ের করেছে।

রৌমারী সীমান্তে বাংলাদেশ অংশে ভারতীয় বিএসএফ ঢুকে পড়ার কারণ হিসেবে জানা গেছে বড়াইবাড়ীর বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ৩৫০ একর জমি দখল করাই ছিল তাদের মূল টার্গেট। বাংলাদেশের বীর সৈনিকেরা যে দিন সিলেটের সীমান্তের পাদুয়া পুনরুদ্ধার করেন, তার পরপরই বিএসএফ বড়াইবাড়ী দখলের নীলনকশা আঁকে। বড়াইবাড়ীর সেদিনের ঘটনায় আত্ম উৎসর্গকারী জোয়ানদের বীরত্বের প্রশংসায় জাতি সরব ছিল। এ ঘটনার পরে গোটা জাতি নতুন করে জেগে উঠেছিল। দাবি উঠেছিল- সীমান্তবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি বাস্তবায়নের। কিন্ত সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হওয়া না হওয়ার বিষয়টি ভারত সরকারের একক ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশের জনগণ সীমান্তে রক্তঝরা বন্ধ দেখতে চায়। ভারত সরকার প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিবে বলে আমরা আশা করতে পারি কি?

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫