ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অর্থনীতি

বারো হাজার কোটি টাকা বাজারে সুদহার কমা নিয়ে অনিশ্চয়তা

আশরাফুল ইসলাম

১৯ এপ্রিল ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ০৬:৩৫


প্রিন্ট
বারো হাজার কোটি টাকা বাজারে সুদহার কমা নিয়ে অনিশ্চয়তা

বারো হাজার কোটি টাকা বাজারে সুদহার কমা নিয়ে অনিশ্চয়তা

সুদহার এক অঙ্কের ঘরে অর্থাৎ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার শর্তে আমানতকারীদের সুরক্ষায় বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমানো হয়েছিল। ব্যবসায়ী ব্যাংক পরিচালকদের চাপে এ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ায় ১২ হাজার কোটি টাকা বাজারে ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু সুদহার কমা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি ব্যাংকের পরিচালক বা এমডিরা। বলা হচ্ছে সুদহার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনতে ৭-৮ মাস সময় লাগতে পারে। কেউ কেউ বলছেন, উচ্চ সুদে (ডাবল ডিজিটে) আমানত নিয়ে ঋণের সুদহার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনা মোটেও সম্ভব নয়। তাই অনেকটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে সুদহার কমা নিয়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, মুষ্টিমেয় কিছু ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট সৃষ্টি করেছিল। এ সঙ্কটকে সামনে রেখে তারা ঋণের সুদহার বাড়িয়ে বাজার থেকে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছে। আবার এ সঙ্কটকে সামনে রেখেই সরকারের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। সিআরআর হার কমিয়ে যে বাড়তি টাকা তারা হাতে পেয়েছে তা ঋণ আকারে আবার বের হয়ে যাবে। এটা ওই সব ব্যাংকের কারসাজি বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, সুদহার তারা মোটেও কমাবে না। শুধু সুবিধা নেয়ার বেলায় তা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সিআরআর হার কমিয়ে বাড়তি টাকা সঠিক কাজে ব্যবহার করতে না পারলে আবারো ব্যাংকিং খাতে নগদ টাকার সঙ্কট দেখা দেবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।

প্রসঙ্গত, গত ১ এপ্রিল হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক বৈঠকের আয়োজন করে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (বিএবি)। ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উপস্থিতিতে তারা বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের কাছ থেকে এক শতাংশ সিআরআর হার কমিয়ে নেয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলার জারি করে ১৫ এপ্রিল থেকে তা কার্যকর করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী গত সোমবার থেকে নতুন হারে অর্থাৎ সাড়ে ৬ শতাংশের পরিবর্তে সাড়ে ৫ শতাংশ হারে সিআরআর হার কার্যকর হয়েছে। এক শতাংশ সিআরআর হার কার্যকর করার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা চলে গেছে ব্যাংকের হাতে।

ঋণের সুদহার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সিআরআর হার কমানোর মতো বড় ধরনের সুবিধা নেয়া হলেও ঋণের সুদহার কমানো নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বাস্তবেও কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন ব্যাংকাররা। এ বিষয়ে গতকাল এক অনুষ্ঠানে প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাহেল আহমেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, সিআরআর হারের পরিবর্তিত হার গতকাল থেকে কার্যকর করা হয়েছে। রাতারাতিই এর প্রভাব পড়বে না। তিনি মনে করেন এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে ৭-৮ মাস সময় লাগতে পারে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, কিছু কিছু ব্যাংক ডাবল ডিজিটে অর্থাৎ ১০ শতাংশের ওপরে আমানত নিচ্ছে। পরিচালন ব্যয় যোগ করলে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ১৩ শতাংশের ওপরে চলে যাবে। এ অবস্থায় ১০ শতাংশের নিচে কিভাবে ঋণের সুদহার আনা হবে তা মোটেও বোধগম্য নয়। ওই এমডি জানিয়েছেন, আসলে এটি কথার কথা। সুবিধা নেয়ার জন্য বলা হয়েছিল। প্রতিশ্রুতি দেয়া আর বাস্তব অবস্থা এক কথা নয়। তিনি বলেন, এখনো কিছু কিছু ব্যাংকের নগদ টাকার তীব্র সঙ্কট রয়েছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে ফারমার্স ব্যাংকের জন্য আস্থার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বেশির ভাগ আমানত চলে যাচ্ছে সরকারি ব্যাংকগুলোতে। ফলে সিআরআর কমানোর সুবিধা আপাতত কিছু ব্যাংক পেলেও দীর্ঘ মেয়াদে তারল্য সঙ্কট কাটছে না। বরং দিন দিন এ সঙ্কট বেড়েই যাবে।

এ দিকে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের নিয়ে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে তারল্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, সরকারি ব্যাংকগুলোতে এমনিতেই টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। বিশেষ করে ফারমার্স ব্যাংক সমস্যায় পড়ার কারণে সরকারি ও বেসরকারি আমানত দেদার আসছে সরকারি ব্যাংকগুলোতে। ভালো উদ্যোক্তা না পাওয়ায় সরকারি ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে আসছে। কলমানি বাজারের মাধ্যমেও সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করে আসছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও ৯ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ শতাংশ সুদে আমানত রাখছে। সিআরআর হার এক শতাংশ কমানোর ফলে চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বাড়তি হাতে এসেছে। এ অর্থ কিভাবে তারা বিনিয়োগ করবেন এ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫