ঢাকা, শনিবার,২৪ আগস্ট ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

নববর্ষের উৎসব

এবনে গোলাম সামাদ

২০ এপ্রিল ২০১৮,শুক্রবার, ১৫:৫৬


এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদ

প্রিন্ট

আজকের পৃথক রাষ্ট্র বাংলাদেশের উদ্ভব হয়েছে সাবেক পাকিস্তান ভেঙে। সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রটির উদ্ভব হয়েছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদকে নির্ভর করে। যে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হতে পেরেছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। নববর্ষের কথা আলোচনা করতে গিয়ে পাকিস্তান প্রসঙ্গ টানছি, কেননা পত্রপত্রিকায় লেখা হচ্ছে যে, পয়লা বৈশাখ হলো বাঙালি জাতিসত্তার উৎস। কিন্তু খোঁজ নিলে জানা যায় যে, এই সাল গণনার পদ্ধতি উদ্ভূত হয়েছে এমন জনসমষ্টির মধ্যে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জাতিসত্তা গঠনের কোনো যোগসূত্রই নেই। যাকে আমরা বলছি বাংলা সাল, সেটা বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলে উদ্ভূত হয়নি। আমরা এখন বারো মাসে বছর ধরি। এই রীতি কোথায় প্রথম কীভাবে সৃষ্টি হতে পেরেছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ আছে। একটি বহুল প্রচলিত মত হলো, এর উদ্ভব হয়েছিল প্রাচীন মিসরে প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের কাছাকাছি।

প্রাচীন মিসরের পুরোহিতরা লক্ষ করেছিলেন, পুবের আকাশে যখন প্রথম লুব্ধক (Sirius) নক্ষকে দেখা যায়, তখন নীলনদে বন্যা আসার সময় হয়। নীলনদের একবার বন্যার সময় থেকে আরেকবার বন্যা আসার সময়কে মিসরে ধরা হতে থাকে এক বছর। এই সময়ের মধ্যে আকাশে ১২ বার পূর্ণিমার চাঁদ উঠতে দেখা যায়। এ থেকে শুরু হয় বারো মাসে বছর গণনা অর্থাৎ একেক পূর্ণিমায় একেক মাস। যেহেতু নীলনদের বন্যার ওপর নির্ভর করে মিসরের কৃষি, মিসরবাসীর খেতে পাওয়া, তাই ভাবা আরম্ভ হয় আকাশের গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে মানুষের ভাগ্য। শুরু হয় মানুষের কোষ্ঠী বা জীবনপত্র রচনা (horoscope) । যাতে জন্ম-সময়ের গ্রহ ও নক্ষত্ররাজির অবস্থান বিচার করে মানবজীবনের শুভাশুভ নিরূপণ করা হয়। বাংলা ভাষায় পঞ্জিকা বলতে বোঝায় চাঁদের তিথি, আকাশে নক্ষত্র ও গ্রহদের অবস্থান, তারিখ, শুভাশুভ কাল প্রভৃতি জ্ঞাপক পুস্তক। বাংলা মাসের বারোটা নাম এসেছে বারোটা নক্ষত্রের নাম থেকে। যেমন- বিশাখা, জ্যেষ্ঠ, পূর্বাষাঢ়া, শ্রবণা, পুর্বভাদ্রপদ, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, মৃগশিরা, পুষ্যা, মঘা, পূর্বফাল্গুনী এবং চিত্রা। এই তারাগুলো থেকে এসেছে বাংলা বারো মাসের নাম। অর্থাৎ, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, মার্গশীর্ষ বা অগ্রহায়ণ, ফাল্গুন ও চৈত্র। আমরা মার্গশীর্ষ মাসকে এখন বলি অগ্রহায়ণ। কেননা, একসময় বাংলাদেশে বছরের আরম্ভ ধরা হতো অগ্রহায়ণ মাস থেকে, বৈশাখ মাস থেকে নয় (অগ্র+হায়ন। হায়ন শব্দের অর্থ হল বছর)। অগ্রহায়ণ মাসে উঠত হৈমিন্তীক ধান। যা ছিল সে সময় বাংলাদেশের প্রধান ফসল। যার মাধ্যমে দেয়া হতো রাজার খাজনা। কথাটা মনে রাখা দরকার। বৈশাখ মাস থেকে বছরের শুরু ধরা হতো না। যদিও এখন ধরা হচ্ছে। আর বলা হচ্ছে পয়লা বৈশাখ হলো বাংলাদেশের মানুষের জাতিসত্তার পরিচয়বহ। বাংলা মাসগুলোর সাথে পূর্ণিমা চাঁদের অবস্থান জড়িত। পূর্ণিমার চাঁদ যখন যে তারার কাছে অস্ত যায়, সেই তারার নামে হয়েছে সেই মাসের নাম। যেমন পূর্ণিমার চাঁদ যখন বিশাখা নক্ষত্রের কাছে অস্ত যায়, তখন সেই মাসকে বলে বৈশাখ।

একইভাবে পূর্ণিমার চাঁদ যখন চিত্রা নক্ষত্রের কাছে অস্ত যায়, তখন সেই মাসকে বলা হয় চৈত্র। এভাবেই সৃষ্টি হতে পেরেছে বাংলা মাসের নাম। কিন্তু এই নামগুলো যে কেবল বাংলাভাষাতেই আছে, তা নয়। উত্তর ভারতের অনেক ভাষাতেই আছে। হিন্দি ভাষার মাসের নাম বাংলা ভাষার থেকে খুব পৃথক নয়। তাই এসব নামের মধ্যে বাঙালিত্ব খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা নিরর্থক। কিন্তু এই চেষ্টা করছেন অনেকেই। এটা প্রকৃত ইতিহাস না জানারই ফল।

নববর্ষের উৎসব নানা দেশেই হয়। একসময় পাঞ্জাবেও হয়েছে বৈশাখী মেলা। সাবেক পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক স্থানে (১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ সালে) ব্রিটিশ শাসনামলে বৈশাখী মেলায় চলেছিল গুলি। মারা গিয়েছিল বহুলোক। রবীন্দ্রনাথ জালিয়ান-ওয়ালাবাগের এই গুলি চলার প্রতিবাদ করে ছেঁড়েছিলেন তার স্যার উপাধি। ব্রিটিশ শাসনামলের এটা হয়ে আছে একটা কুখ্যাত ইতিহাস। আমি এ ঘটনাটির উল্লেখ করছি, কেননা যাকে বলা হচ্ছে বাংলা সাল, তার প্রচলন সাবেক পাঞ্জাবেও ছিল। এই সাল একসময় দক্ষিণ এশিয়ার উত্তরভাগের নানা অঞ্চলেই ছিল প্রচলিত।

নববর্ষের উৎসবও নানা দেশে করা হয়ে থাকে। আমরা এখন পয়লা বৈশাখে নববর্ষ উৎসব করছি। এই নববর্ষ উৎসবের উৎস খুঁজতে গেলে আমরা গিয়ে পৌঁছায় ছাফাভিদ পারস্যে। পারস্যে তাদের সালের নববর্ষে করা হতো নওরোজ উৎসব।

মোগল আমলে আমদের দেশে প্রথম আরম্ভ হয়েছিল পারস্যের নওরোজ উৎসবের অনুকরণে নববর্ষ উৎসব। আরম্ভ হয়েছিল দোকানে হালখাতা করা। হাল শব্দটা আরবি। আরবি থেকে ফারসিতে তা গৃহীত হয়েছে। খাতা শব্দটা ফারসি। হালখাতা বলতে বুঝিয়েছে, দোকানে (দোকান শব্দটা ফারসি) নতুন হিসাবের খাতা খুলবার উৎসবকে। হালখাতার দিনে দোকানিরা তাদের ধরাবাধা গ্রাহকদের নিমন্ত্রণ করে করিয়েছেন মিষ্টিমুখ। ধরাবাঁধা গ্রাহকরা এই দিনে চেয়েছেন দোকানে কোনো ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করতে। এ হলো হালখাতার উৎসব। মুসলমান ও হিন্দু দোকানে করা হতো হালখাতা। কিন্তু হিন্দু দোকানের সাজসজ্জা আর মুসলমান দোকানের সাজসজ্জা অবিকল এক হতো না। যেমন, হিন্দু দোকানের পরিবেশ সুগন্ধি করবার জন্য পোড়ান হতো ধূপ- ধোঁমা। কিন্তু মুসলমান দোকানে সুগন্দি করার জন্য ছড়ানো হতো গোলাপ পানি এবং আতরদানিতে রাখা হতো আতর। তোড়া শব্দটা আরবি।

মুসলমান দোকানদারেরা ফুল দিয়ে তোড়া বেঁধে দোকান সাজাতেন। কিন্তু হিন্দুদের মধ্যে ফুলের তোড়া দিয়ে ঘর সাজাবার রীতি সেভাবে প্রচরিত ছিল না। গোলাপ (গুলাব) ফুলকে হিন্দুরা চিরকালই ভেবেছেন মসলমানি ফুল। গোলাপ ফুল এসেছিল মুসলিম পারস্য থেকে। হিন্দুরা তাদের কোনো পূজায় এখনো গোলাপ ফুল ব্যবহার করেন না। কিন্তু গোলাপ ফুল মুসলমানদের কাছে বিশেষ আদ্রিত। হিন্দু আর মুসলমান সংস্কৃতিতে হালখাতার দিনে একটা সাংস্কৃতিক পার্থক্য পরিদৃষ্ট হতো। এটাকে সাম্প্রদায়িকতা বলে চিহ্নিত করতে গেলে ভুল করা হবে। এটা হতে পেরেছিল বিশেষ ঐতিহাসিক কারণে। বাংলাদেশে এখন একদল বুদ্ধিজীবী পয়লা বৈশাখে পান্তাভাত খাচ্ছেন ইলিশ মাছ দিয়ে। তারা ভুলে যান, মুসলমানেরা এ দেশে একসময় রাজত্ব করেছেন। তারা কেবলই পান্তাভাত খাননি। পান্তাভাত খাওয়া নিন্দনীয় নয়। কিন্তু পান্তাভাত দিয়েই কেবল বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিকে বর্ণনা করা যায় না। তাদের ছিল একটি উন্নতমানের খাদ্য-সংস্কৃতি। স্পেন থেকে আসা খ্রিষ্টান মিশনারি পর্যটক মানরিক তার ভ্রমণবৃত্তান্তে বলেছেন যে, তাকে গৌড়ে একটি মুসলমান বাড়িতে দাওয়াত করে খাওয়ানো হয়। তারা তাকে যত পদ খেতে দিয়েছিলেন, তা খেয়ে শেষ করতে তার লেগেছিল তিন ঘণ্টা। ধনী-গরিব সব দেশেই ছিল। তাদের খাদ্য অভ্যাসেও ছিল পার্থক্য। তবে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তাভাত খাবার রীতি এ দেশে ছিল না।
গ্রাম্যকবি গান বেঁধেছেন-
লম্বা লম্বা বিচা কলা পয়দা করছেন আল্লাহতালা
বান্দারা তার পান্তা দিয়া খাইবে।

মানুষ এ দেশের কৃষিজীবী মানুষ বিচাকলা দিয়ে পান্তাভাত খেয়েছে, ইলিশ মাছ দিয়ে নয়। আমাদের দেশে শৌখিন বিপ্লবীরা এর খবর রাখেন না। রমনার বটমূলে ছায়ানট প্রতি বছরের মতো এ বছরও করল নববর্ষ উদযাপন। ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রংপুরের যাদুমিয়ার বড় ভাই সিধু মিয়া। এরা হলেন বিরাট এক জমিদার বাড়ির সন্তান। এক ভাই হয়েছিলেন চীনপন্থী কমিউনিস্ট, আরেক ভাই হয়েছিলেন মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। এরা সবাই ছিলেন শৌখিন বিপ্লবী। কথায় কথা বাড়বে। তাই এদের সম্বন্ধে যা জানি, তা বলতে চাই না। আজকের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাক নববর্ষেরই মধ্যে।

লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫