ঢাকা, বুধবার,১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অর্থনীতি

চামড়া শিল্পনগরী : তিন বছরের প্রকল্প গড়াল ১৭ বছরে

জিয়াউল হক মিজান

২১ এপ্রিল ২০১৮,শনিবার, ১৩:৫১


প্রিন্ট
চামড়া শিল্পনগরী

চামড়া শিল্পনগরী

সাভারের চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্প। লালবাগের অপরিকল্পিত ট্যানারিগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মত স্থানে স্থানান্তরের জন্যই এ উদ্যোগ। প্রকল্পটি নেয়া হয় ২০০৩ সালে। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৫ সালে। অনুমোদিত বরাদ্দ ছিল ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। বাড়তে বাড়তে বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকায়। ব্যয় বেড়েছে ৯০২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। তিন বছরের প্রকল্প গড়িয়েছে ১৭ বছরে। সর্বশেষ আরও দুই বছর সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। কাগজে-কলমে এখনো পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৯০ শতাংশ। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মারাত্মক ক্ষোভ কাজ করলেও সরকার নির্বিকার।

চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণের জন্য ভবন নির্মাণ, অগ্নিনির্বাপক যানবাহন ও সরঞ্জামাদি ক্রয় খাতে ব্যয় ১৭ লাখ টাকা থেকে ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় ৭৫ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণব্যয় চার কোটি টাকা থেকে তিন গুণ হয়ে ১২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নির্মাণ খাতের ব্যয় ২৫ কোটি টাকা থেকে ২৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা করা হয়েছে। মেইন গেট একটি করার কথা ছিল। তা এখন দুইটি করা হচ্ছে। একটি গেটের জন্য ব্যয় ১৫ লাখ ১৫ হাজার টাকা ধরা হয়। এখন দু’টি গেটের জন্য ব্যয় এক কোটি টাকা করা হয়েছে। আর ক্ষতিপূরণ খাতে রাখা হয়েছে ১০ কোটি তিন লাখ টাকা।

প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ট্যানারিগুলো এত দিন ছিল ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ হাজারীবাগ এলাকায়। ওই এলাকায় শিল্পগুলোর বর্জ্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যন্ত হচ্ছিল। তাই ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে শিল্পনগরীটি সমাপ্ত করে কারখানাগুলো স্থানান্তরের জন্য একনেক থেকে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। হাজারীবাগের ১৫৪টি কারখানা এ নগরীতে জমি বরাদ্দ পেয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা দেয়ার পরও শিল্পনগরীটি এখনো প্রস্তুত হয়নি। প্রায় ২০০ একর জমির ওপর করা ২০৫ প্লটের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত শিল্প ইউনিটের সংখ্যা ১৫৫টি।

অনুমোদনের এক বছরের মাথায় ব্যয় অপরিবর্তিত রেখেই প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০০৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। পরে আবার ছয় মাস বাড়ানো হয়। প্রকল্প চলাকালে বৈদেশিক কোনো সহায়তা না পাওয়ায় ব্যয় ৫৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা করে মেয়াদ সাড়ে তিন বছর বাড়িয়ে ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপরই প্রকল্পে যুক্ত করা হয় নতুন নতুন অঙ্গ। প্রকল্পের সিইটিপি, ডাম্পিং ইয়ার্ড, পানি উত্তোলন, পরিশোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থার কাজ জুন ২০১০ সালের মধ্যে সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে দেয়া প্রস্তাবনা অনুযায়ী মেয়াদ আবারো দুই বছর বাড়ানো হয়। ১০ বছর পরে এসে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে এক হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এর পরেও এক বছর করে দুইবার মেয়াদ বাড়ানো হয়, যা গত বছরের জুনে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় আবারও দুই বছর সময় বাড়ানো হয়।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫৫টি কারখানার মধ্যে ১৫৩টি তাদের লে-আউট প্ল্যান জমা দিয়েছে। সবগুলোরই লে-আউট অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অনুমোদিত লে-আউট প্ল্যান অনুযায়ী ইতোমধ্যে ১৪৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের কারখানা নির্মাণকাজ শুরু করেছে। বাকি ১২টি প্লটের নির্মাণকাজ মামলা ও উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণের কারণে স্থগিত রয়েছে। অন্য দিকে ৫৩টি ট্যানারি শিল্প ট্যানিং ড্রাম স্থাপন করেছে। ১৩০টি ট্যানারি শিল্প স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন করেছে। ১২০টি শিল্প-কারখানা গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন জমা দিয়েছে। দুইটি প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগের প্রক্রিয়া চলছে। ৪৫টি প্রতিষ্ঠান পানির সংযোগের আবেদন করেছে। ৪২টি শিল্পকে পানির মিটার দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, সাভারের চামড়া শিল্পনগরী দীর্ঘ ১৬ বছরেও প্রস্তুত হয়নি। এতে করে আমরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। নতুন করে সময় আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, অথচ অনেক আগে সেখানে ট্যানারি স্থানান্তরে আমাদের বাধ্য করা হয়েছে। স্থানান্তরিত চামড়া শিল্পনগরীতে পরিবেশসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এখনো নিশ্চিত হয়নি। নগরীর এ অসম্পূর্ণতার কারণে বিদেশী ক্রেতা আকৃষ্ট হচ্ছে না। তবে শিল্প নগরীতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দ্রুত দিতে পারলে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে এ খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। অবিলম্বে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।

তাড়াহুড়ো করে ট্যানারি স্থানান্তরে শিল্পমালিকদের বাধ্য করার কথা স্বীকার করেন স্বয়ং বিসিক চেয়ারম্যান। রাজধানীর ইমানুয়েল কনভেনশন সেন্টারে সম্প্রতি আয়োজিত ‘স্থানান্তরিত চামড়া শিল্পনগরীর ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে আলোচনাকালে চেয়ারম্যান মুশতাক হাসান মু ইফতিখার বলেন, চামড়া শিল্পনগরী হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরিত করার ব্যাপারে আমি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলাম যে, সাভারের নতুন চামড়া শিল্পনগরী এখনো প্রস্তুত নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, অন্যরা বলছে কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে, আর আপনি বলছেন সম্পূর্ণ হয়নি। সরকারকে এমন ভুল বোঝানোর কারণে পুরোপুরি প্রস্তুতির আগেই প্রকল্পটি সাভারে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ দিকে সাভারে চামড়া শিল্পনগরী স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ সম্প্রতি আরও দুই বছর বাড়িয়েছে সরকার। আগামী দুই বছরে ওই শিল্পনগরীর কাজ শেষ করা হবে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তৃতীয়বারের মতো সংশোধনী এনেছে। ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে এর কাজ শেষ হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারায় চামড়া শিল্পনগরী স্থাপনে আরও সময় দেয়া হয়েছে। তবে ২০১৯ সালের মধ্যে অবশ্যই এ প্রকল্প শেষ করা হবে।  

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫