ঢাকা, বুধবার,২০ নভেম্বর ২০১৯

মতামত

‘রবিদাস’ : একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠী

শিপন রবিদাস প্রাণকৃষ্ণ

২১ এপ্রিল ২০১৮,শনিবার, ১৮:১১


প্রিন্ট
‘রবিদাস’ : একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠী

‘রবিদাস’ : একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠী

অবহেলিত, অনুন্নত, মূল স্রোত থেকে পিছিয়ে পড়া রবিদাস জাতিগোষ্ঠী শুরু থেকেই পদে পদে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। নিষাদ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, সুপরিচিত এ জাতিগোষ্ঠী ভারতে ‘মূল নিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃত। দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দিন দিন রবিদাসরা তাদের স্বকীয়তা হারাচ্ছে। বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে একটি সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী।

রবিদাস জাতির নামকরণ হয়েছে তাদের আদি ধর্মগুরু সন্ত রবিদাসের নামানুসারেই। ইতিহাসবিদ বুকানন বিহারের পুর্নিয়ায় ‘ঋষি’ নামে একদল উপজাতির সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। বঙ্গদেশের চর্মকাররা (চামার) আসল পরিচয় গোপন রেখে নিজেদের ঋষি (ঋষির সন্তান) নামে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। ১৮৭২ সালের প্রথম আদমশুমারিতে ঋষিদের চামার বা মুচি হিসেবে উল্লেখ করা হয় আধা-হিন্দু উপজাতির পর্যায়ে।

রবিদাস জাতিগোষ্ঠীর চামড়ার কাজের প্রসঙ্গে ‘মিথ’ চালু আছে। তা হলো- একদিন ভগবান বিভিন্ন জাতির লোকদের ডেকে তাদের নিজ নিজ পছন্দমতো পেশা ভাগ করে দিচ্ছিলেন। সব শেষে রবিদাস জাতি দেরিতে উপস্থিত হলে তিনি বললেন, ‘সবাইকে তো পেশা ভাগ করে শেষ করে দেয়া হয়ে গেছে। তোমাদের আর কী দেবো? এই লোহার সুঁই আর সূতাটুকু নিয়ে যাও। রাস্তায় বসে এটা দিয়ে চামড়ার পাদুকা তৈরি ও মেরামতের কাজ আর আমার নাম জপ করবে। সেই থেকে তারা জুতা সেলাই আর চামড়ার কাজ শুরু করে। এরা নিজেদের রবির (সূর্য) দাস মনে করে ভক্তিভরে সূর্যদেবের পূজা করত বলে নিজেদের রবিদাস বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত।

উৎপত্তির দিক থেকে রবিদাস জাতি অনার্য বলে বিবেচিত। রবিদাসরা মনে করে, তাদের আদি নিবাস অবিভক্ত বাংলা ছাড়াও বিহার প্রদেশের দ্বারভাঙ্গা, মুজাফফরপুর, বালিয়া, ছাপড়া, আরে, পাটনা, মুঙ্গের, ভজনপুর জেলাগুলোতে। ব্রিটিশ শাসনামলে কর্মসূত্রে রবিদাসরা বাংলার বিভিন্ন্ স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হয়, দেশের প্রত্যেকটি জেলা, উপজেলায় এমনকি ইউনিয়নপর্যায়ে রবিদাসদের অবস্থান রয়েছে। অন্যান্য পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মতো নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ডে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে থাকা তাদের জীবিকার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা। রবিদাস সম্প্রদায় রাজ দরবারে পালকি বহনের কাজে নিযুক্ত ছিল। পরে এরা জুতা তৈরি, মেরামত, চামড়ার কাজসহ (জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগ, বেল্ট) কৃষিকাজ করত। বর্তমানে এরা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত।

রবিদাসরা নিজেদের মধ্যে নাগরী ভাষায় কথা বলে, যা স্থানভেদে ভোজপুরিয়া, দেবনাগরী, ভূতনাগরী বা দেশওয়ালী ভাষা নামেও পরিচিত। এর বর্ণমালা হিন্দি বর্ণমালার মতো হলেও উচ্চারণের সময় তা হিন্দি ভাষাকে পুরোপুরি অনুসরণ করে না।

রবিদাসদের ধর্মের নাম ‘রবিদাসীয়া’। এরা পূজা নিজস্ব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি আন্তরিকতার সাথে পালন করে থাকে। ধর্মগুরুরা ‘সন্ত’ বা ‘মহন্ত’ নামে পরিচিত। তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে সমাজের মান্যগণ্য ব্যক্তি ও মহন্তরা মিলে সেই সমস্যার সমাধান দেন। এতে কারো শাস্তি বা জরিমানা হলে তা ওই ব্যক্তি মানতে বাধ্য। রবিদাস সম্প্র্রদায়ের নিজস্ব পুঁথিসাহিত্য রয়েছে। হাতে লেখা ধর্মগ্রন্থগুলো হলো- গুরুআন্যাস (মূলগ্রন্থ ও জ্ঞানদীপক), বিলাস, সন্তাক্ষরী, সন্তসুন্দর, সন্তমহিমা, লও পারয়ানা, বারহ বাণী, জবাব-সওয়াল, ব্রহ্মবিচার, মন্ত্রাওলী, মূলসাগর, জ্ঞানচাচারী, রূপসার।
তারা শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, শাকালু, বেতফল ইত্যাদি খেয়ে জীবন ধারণ করত। বর্তমানে সাধারণ বাঙালিদের মতোই ভাত, মাছ, সবজি, রুটি, মাংস ইত্যাদি খায়। এদের একাংশ শূকরের মাংস খেলেও আরেকটি অংশ সযত্নে তা এড়িয়ে চলে। ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে বিশেষ খাবার তৈরি করা হয়ে থাকে। অন্যান্য আদিবাসীর মতো রবিদাসদের মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে (বিশেষ করে নবজাতকের অনুষ্ঠানে, বিয়ে ও মৃত-সৎকারের সময়) মদ পানের রেওয়াজ আছে। তবে শিক্ষার প্রসারের ফলে মাদকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত হতে শুরু করেছে।

পুরুষরা ধুতি, পাঞ্জাবি পরলেও এমন পোশাকে তাদের শুধু ধর্মীয় পার্বণের দিনেই দেখা যায়। নারীরা একটু ভিন্ন কায়দায় শাড়ির আঁচল বামদিকে না নিয়ে ডানদিকে টেনে পরেন। ইদানীং বাঙালিদের পোশাকের প্রভাব লক্ষণীয়। রবিদাস পরিবার পিতৃতান্ত্রিক।

সম্পত্তি বা বংশপরিচয় পিতা থেকে পুত্রে বর্তায়। মেয়েরা মায়ের সম্পত্তির অধিকারী হন। দিন দিন একক পরিবার বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। নবজাতকের জন্মের ছয় দিনের দিন ‘ছাটিয়ার’ ১২ দিনে ‘বরাইয়া’ ও ২১ দিনে ‘একুশা’ নামে অনুষ্ঠান করে পর্যায়ক্রমে নবজাতকের নামকরণ, পাড়া-প্রতিবেশীকে নিমন্ত্রণ ও সবাই মিলে আনন্দ-উল্লাস করে থাকে। রবিদাসদের নিজ বংশের মধ্যে বিয়ে হয় না। তবে ঈৎড়ংং ঈড়ঁংরহ বিয়ে প্রচলিত। বহুবিয়ে নেই, তবে কোনো কারণে বিয়ে ভেঙে গেলে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সমাজের লোকদের খাওয়াতে হয়। সমাজের অনুমতি ছাড়া অন্যত্র ধর্ম ও জাতি পরিবর্তন করে বা প্রণয়ঘটিত হঠাৎ বিয়ে করলে জরিমানা অথবা সমাজে আটক (সমাজচ্যুত বা একঘরে) করে রাখা হয়। এরা যৌতুকপ্রথার দিকে ঝুঁকছে। বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ডেকে দোষী পক্ষকে জরিমানা করা হয়।

মৃত্যুর পর সমাজের সবাই একত্র হয়ে মৃত ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে বন্দেগি বাজায় (গুরুমন্ত্র জপ)। মৃত ব্যক্তিকে স্নানশেষে সাদা কাফনের কাপড় পরিয়ে আতর ও গোলাপজল ছিটিয়ে দেয়া হয়। এরপর মৃত ব্যক্তিকে সামনে রেখে পুনরায় বন্দেগি বা গুরুমন্ত্র জপ করে পাঁচটি ভজন (মৃত্যু সঙ্গীত) গাওয়া হয়। এরপর জ্যেষ্ঠপুত্র বা কনিষ্ঠপুত্র মুখাগ্নি করে। এ সময় মৃত ব্যক্তির মুখে আতপ চাল, ঘি, মধু, কর্পুর, তেল ইত্যদি একত্র করে দেয়া হয়। মুখাগ্নি শেষে সিন্ধুক কবরে সূর্যের দিকে মুখ করে কবর দেয়া হয়। রবিদাসরা পুনর্জন্মে বিশ্বাসী। তারা মনে করে, যে পৃথিবীতে পুণ্যের কাজ করে, সে গুরুর সান্নিধ্য লাভ করে। ফলে তাকে আর পুনর্জন্ম নিতে হয় না। তবে যারা কম-বেশি পাপ কাজ করে, তারাই পুনরায় বিভিন্ন জীবজন্তুর বেশে জন্ম নেয়।

রবিদাসরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গ্রাম বা পাড়ার এক প্রান্তে বিশেষ করে পুকুর, নদীর বা দীঘির ধারে অথবা মাঠের কোণে বাস করে। মনে করা হয়, তারা গ্রামের একপাশে বাস করলে অন্যদের অসুবিধা হবে না।

ধর্মগুরু রবিদাসের জন্মজয়ন্তীর দিন মাঘি পূর্ণিমা হলো তাদের প্রধান উৎসব। কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাতে ‘দেওয়ালী পূজা’, ‘ভূতপূজা’ ভাদ্র মাসের পূর্ণিমায় ‘ঝুমুর নৃত্যগীত’ ফাল্গুন মাসে ফাগুয়া, কালিপূজার পর ছটপবনী (সূর্যপূজা), বটপূজা, নারায়ণীপূজা, শীতলা মায়ের পূজা, নওমী (রামনবমী), চৈত নওমী, নবান্ন উৎসব, পুষরা (পৌষপার্বণ), পদ্মামাই কে পূজা (মনসাপূজা) ইত্যাদি পালন করে থাকে। চা বাগানের রবিদাসরা বনশক্তি মা, শিবরাত্রি, বাসন্তী, হোলিয়া উদযাপন করে থাকে। ফাগুয়াতে রবিদাসরা সবাইকে রঙ ও কাদা মাখিয়ে আনন্দ করে।

রবিদাসরা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত। ধুসিয়া : এরা মূলত চামড়া দিয়ে জুতাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে। বিয়ে অনুষ্ঠানে বাদকের কাজ করে। গুরিয়া : নিজেদের জমিতে কৃষিকাজ করে অথবা অন্যের জমিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে। ধার : অতীতে পালকি বহনের কাজ করত। দোহার : দোহাররা চামড়া দিয়ে পাদুকা সেলাই করে। তবে সুতা দিয়ে এ কাজ করে না। জয়সুরিয়া : সহিসের কাজ করে। তাঁতি : বস্ত্র বয়নের কাজ করে। তারা মৃত পশু-পাখির মাংস স্পর্শ করে না। সারকি : কসাইয়ের কাজ এবং চামড়া খসানোর কাজ করে। চুনিহার : চুন প্রস্তুতের কাজ করে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে রবিদাস সম্প্রদায়ের লোকেরা ১৩টি উপগোত্রে বিভক্ত। যেমন- চর্মশিল্পী; অস্তি; ধার; ধুলিয়া; দোহার; গোরিয়া; জৈমবর; জনকপুরী; মৌনপুরী; খাটি সাহার; কোরার; লোরকের; মগ-হিয়া পাচ্ছিয়ান।
লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ রবিদাস ফোরাম
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫