ঢাকা, সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অবকাশ

চারাগল্প

প্রতিশোধ

জোবায়ের রাজু

২২ এপ্রিল ২০১৮,রবিবার, ১১:৩৭


প্রিন্ট

একটু পর আরেকটি অকালমৃত্যু ঘটবে। এক বছর আগে এমনই একটি অকাল মৃত্যু ঘটেছে। তবে সেই মৃত্যুটা ছিল শ্রাবণীর আত্মহত্যা। পল্লবকে জীবন দিয়ে ভালোবেসেছে মেয়েটা। কিন্তু পল্লব শ্রাবণীর সেই ভালোবাসার মর্যাদা না দিয়ে টাকার লোভে রুমা নামে এক বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে করে সংসার বেঁধেছে।
টাকার লোভে রুমাকে বিয়ে করে পল্লব বাড়ি গাড়ি সব পেয়েছে সত্য, কিন্তু মন থেকে রুমাকে ভালোবাসতে পারেনি। দাঁত উচু, কালো, রুমাকে দাম্পত্য জীবনে এই এক বছরে মনে এক ইঞ্চিও জায়গা দেয়নি পল্লব। সে মনে করে, তার মতো স্মার্ট ছেলের জন্য বিশ্ব সুন্দরী নায়িকাদের মতো মেয়েরাই উপযুক্ত, রুমা নয়। রুমার বাবার অটেল সম্পত্তির হাতছানিতে সে রুমাকে বিয়ে করেছে। বিয়ের পরপরই গোলজার সাহেব জামাতাকে ছয়তলা বাড়ি আর গাড়িসহ লাখ টাকার চেক লিখে দিয়েছেন।
স্বামীর প্রতি পরম ভক্তি রুমার। সেই ভক্তির মূল্যায়ন করে না পল্লব। পল্লবের এমন আচরণে রুমা ভেঙে না পড়ে নিজে নিজে শান্ত্বনা পায়- মানুষটা একদিন ঠিক হয়ে তাকে বুকে জায়গা দেবেই। কিন্তু রুমা জানে না পল্লবের মনে আজকাল আরেক নারীর জায়গা হয়ে গেছে। সে নারীর নাম প্রেমা। ক’দিন আগে পল্লব ফেসবুকে প্রেমার রিকোয়েস্ট পায়। একসেপ্ট করার পর প্রেমার দৃষ্টিনন্দন সব ছবি দেখে পল্লব প্রথমে ভেবেছে এটি একটি ফেস আইডি এবং আইডির মালিক প্রোফাইলে কোনো অপরিচিত মডেল কন্যার পিকচার ব্যবহার করেছে।
ফেসবুকে পল্লবের বন্ধুর তালিকায় প্রেমা স্থান পাওয়ার পর প্রেমাই প্রতিনিয়ত পল্লবকে ইনবক্সে ডাকে। অল্প দিনে সে ডাকাডাকি প্রেমে রূপান্তরিত হয়। ধানমন্ডি লেকে দু’জনে একদিন সাক্ষাৎপর্বও সেরে নেয়। প্রেমাকে সামনাসামনি দেখে পল্লব মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে মনে মনে বলে- তুমি নারী নাকি পরী!
হ্যাঁ, পরীরমতো সুন্দরী প্রেমা। এমন নারীর প্রেমে জড়ানো যেকোনো পুরুষের ভাগ্যই বটে। পল্লব ভাগ্যবান।
দু’জনের প্রেমের শুরুতে প্রেমার আগ্রহই ছিল বেশি। প্রপোজটা প্রথম সে-ই করে। প্রেমার সে ভালোবাসার আলোতে পল্লব মোমের মতো গলতে থাকে। ফলে খুব অল্পতেই দু’জনের প্রেম হয়ে যায়।
হঠাৎ একদিন পল্লবের মনে হলো প্রেমা আবেগের কারণে পল্লবকে এত কাছে টানছে। তাই সে স্ত্রী রুমার প্রসঙ্গটি অকপটে বলে যায় প্রেমাকে। কিন্তু প্রেমার কোনো পরিবর্তন হয় না। ভালোবাসার দাবি নিয়ে সে স্পষ্ট জানায়- ‘তোমার ওপর আর কারো অধিকার থাকতে পারে না। তুমি তাকে ত্যাগ করো। তুমি শুধু আমারই।’ প্রথমে প্রেমার এ কথার গুরুত্ব দেয়নি পল্লব। পরে মনে হলো প্রেমা ঠিকই বলেছে। রুমার মতো বদসুরত কালো বউ তার জীবনে থাকবে কেন? তাকে ত্যাগ করাই শ্রেয়। তার জীবনে কেবল প্রেমার মতো রূপবতীকেই মানায় আর কেউ না।
প্রেমাকে কল করে পল্লব বলে- ‘রুমাকে কিভাবে ত্যাগ করব? ডিভোর্স?’ শুনে কিছুক্ষণ নীরব থাকে প্রেমা। তারপর নিচু গলায় বলে- ‘না। খুন।’
খুনের কথা শুনে আতকে ওঠে পল্লব। পরে ভেবে দেখল, প্রেমার ফন্দি খারাপ না। খুন করলে একবারেই ঝামেলা শেষ। ডিভোর্স হলে আইন-আদালতের ব্যাপার স্যাপার আছে। অতএব খুনই সঠিক পন্থা।
রুমাকে কিভাবে মারা হবে, তাও শিখিয়ে দেয় প্রেমা। রাতে প্রথমে ছল করে ছাদে নিয়ে যাবে। তারপর সুযোগ বুঝে নিচে ধাক্কা মারবে। ব্যাস, তারপর পল্লবের জীবনে প্রেমার আগমনের পথে কোনো কাঁটা থাকল না।
আজ সেই অঘটন ঘটানোর রাত। একটু পর আরেকটি অকাল মৃত্যু ঘটবে। রুমার জীবনের শেষ মুহূর্তের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে পল্লব। এখন রাত ১০টা। আজ স্বামীকে এত তাড়াতাড়ি বাসায় দেখে তাজ্জব গলায় রুমা বলল- ‘তুমি তো মধ্যরাতে বাসায় আসো। আজ এত তাড়াতাড়ি?’ মধুমাখা কণ্ঠে পল্লব বলল- ‘আজকের চাঁদটা অনেক সুন্দর। তোমায় নিয়ে ছাদে আজ সারা রাত চাঁদ দেখব।’ পল্লবের কথায় বড় সুখে রুমার চোখে পানি চলে এলো।
পল্লবের হাত ধরে সাত তলার সিঁড়ি ডিঙিয়ে ছাদে যেতে যেতে রুমা মনে মনে বলল- আমি জানতাম গো, তুমি একদিন আমাকে ভালোবাসবেই। কিন্তু রুমা জানে না সে ছাদে নয়, যাচ্ছে মৃত্যুর মুখে।
ছাদে এসে রুমা বলল- ‘কই, আজ তো চাঁদ উঠেনি।’ পল্লব রুমাকে জড়িয়ে ধরে রেলিংয়ের কাছে নিয়ে যেতে যেতে বলল- ‘তুমিই তো আমার চাঁদ।’ লাজুক হেসে রুমা বলল- ‘কি যা তা বলছ। হি হি হি।’
পরের ঘটনাটা খুব সহজে ঘটল। পল্লব ছয় তলার ছাদ থেকে রুমাকে সজোরে ধাক্কা মেরে নিচে নেমে বাসায় এসে প্রেমাকে কল দেয়-
-প্রেমা, কাজ সমাধা হয়ে গেছে। এতক্ষণে রুমা হয়তো বেঁচে নেই। তুমি কবে এবার আমার হবে?
-কখনোই নয়। আমার প্রতিশোধ নেয়া শেষ হয়েছে।
-মানে? কিসের প্রতিশোধ?
-তোকে একতরফা ভালোবেসেছে আমার বান্ধবী শ্রাবণী। কিন্তু তুই তার সাথে প্রতারণা করে অন্যত্র বিয়ে করে আমার বান্ধবীর বিশ্বাস নষ্ট করেছিস। সে দুঃখ সইতে না পেরে শ্রাবণী আত্মহত্যা করে। মামলা করেও শ্রাবণীর পরিবার কিছু করতে পারেনি। ভেবেছিস তুই সহজে পার পেয়ে যাবি? অনেক কষ্টে তোকে ফেসবুকে পেয়ে প্রেমের নাটক করেছি। আমার উদ্দেশ্য আজ সফল হয়েছে। তোর ক্ষতি করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। গুডবাই।
বলেই লাইন কেটে দিয়ে প্রেমা ফেসবুক থেকে পল্লবকে চিরতরে ব্লক করে দেয়। দুই কুল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে পল্লব। হঠাৎ নিচ থেকে জনতার শোরগোল- ‘হায় হায় মেয়েটা আত্মহত্যা করেছে কেন? আহারে...!’ কথাগুলো কানে আসতেই ধপাস করে সোফায় বসে যায় পল্লব। কী হবে এখন? পল্লবের অস্থিরতা বাড়ছে।


আমিশাপাড়া, রাজু ফার্মেসি, নোয়াখালী।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫