ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অবকাশ

ভূস্বর্গ কাশ্মির

মোস্তফা কামাল গাজী

২২ এপ্রিল ২০১৮,রবিবার, ১১:৩৭


প্রিন্ট
লেকের মাঝে পানির ফোয়ারা ; ডাল লেকে ভেসে চলা সিকারা

লেকের মাঝে পানির ফোয়ারা ; ডাল লেকে ভেসে চলা সিকারা

কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরে যখন ট্রেন এসে থামল, তখন মধ্যদুপুর। আকাশে গনগনে রোদ। তবুও বেশ ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছিল গায়ে। ট্রেন থামতেই সবাই একরকম দৌড়ে বের হচ্ছিল স্টেশন থেকে। বেশ অবাক হলাম। নতুন জায়গায় বুঝে উঠতে পারছিলাম না তাদের দৌড়ানোর কারণ। পরে জানতে পারলাম, নিরাপত্তার খাতিরে কাউকে স্টেশনে দাঁড়াতে দেয়া হয় না। বাইরে বেরোতেই দেখলাম, ইন্ডিয়ান আর্মিদের কয়েকটি সাঁজোয়া যান দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে পজিশন নিয়ে বসে আছেন আর্মিরা। বাইরেও টহল দিচ্ছেন কয়েকজন। প্রথম ভড়কে গেলেও মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়নি। কারণ, পুরো সফরেই তাদের এমন তৎপরতা নজরে পড়েছে। দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কাশ্মির যুদ্ধকবলিত এলাকা।
রাস্তার পাশে সারি সারি ফাস্টফুডের দোকান। মুখরোচক খাবার দেখে ক্ষুধার্ত পেট আরো যেন চোঁ চোঁ করে উঠল। বসে খেয়ে নিলাম ভেড়ার গোশত দিয়ে তৈরি কাশ্মিরের বিশেষ খাবার ‘চিশতা’। স্থানীয় ছেলে এজাজ ভাই আমাদের স্টেশন থেকে রিসিভ করার কথা। কিন্তু তার দেখা নেই। তিনি আমাদের সাথে দারুল উলুম দেওবন্দে পড়েছেন। সেখান থেকেই পরিচয়। খুব ভালো মানুষ। তাকে না পেয়ে ফোন দিলাম। রিসিভ করে বললেন, একটা ট্যাক্সি নিয়ে একটু সামনে এগিয়ে যেতে। তার কথামতো ট্যাক্সি নিয়ে এগোলাম সামনে। ঝিলাম নদীর তীরে তার সাথে সাক্ষাৎ হলো। ঝিলাম নদীর আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখালেন। নদীর ওপর মাঝারি আকৃতির একটি ঝুলন্ত সেতু। তাতে চড়ে দেখে নিলাম দূরে বয়ে চলা নদীর শেষ মোহনা। দিগন্তে গিয়ে মিশেছে যেন। ব্রিজ পার হয়ে এজাজ ভাই একটি ট্যাক্সি ভাড়া করলেন। এবার আমাদের গন্তব্য শ্রীনগরের অপরূপ সৌন্দর্যের জলাভূমি ডাল লেক। মিনিট বিশেক পর আমাদের গাড়ি লেকের পাড় ধরে চলতে লাগল। লেকের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। চার দিকে পাহাড়বেষ্টিত লেকটি হ্রদের মতো। লেকের শান্ত জলে বয়ে চলছে সারি সারি এক ধরনের ছোট নৌকা। নৌকাগুলো দেখতে বেশ চমৎকার। যেন সাজানো বাসরঘর। বিভিন্ন বলিউড সিনেমায় দেখা যায় এগুলো। এজাজ ভাই বললেন, এগুলোর স্থানীয় নাম ‘সিকারা’। এমন নৌকায় চড়ার ইচ্ছে ছিল বহুদিন। একটি ঘাটে ড্রাইভারবাবু গাড়ি থামালেন। হুড়মুড় করে নেমে ছুটে গেলাম ঘাটে। সারি সারি বাঁধা রয়েছে কয়েকটি সিকারা। পানির মাঝখানে পানির ফোয়ারা। সেটি পেছনে রেখে ফটো তুললাম। মোশতাক ভাই মাঝির সাথে দাম দরাদরি করলেন। ঠিক হলো, এক ঘণ্টা ঘুরিয়ে জনপ্রতি ১০০ রুপি করে। দুটো সিকারা ভাড়া করে চড়ে বসলাম। লেকের ঠাণ্ডা পানিতে হাত ঢুবিয়ে লেকের সাথে মিতালি করতে করতে এগোতে থাকলাম সামনে। মাঝি জানালেন, শীতকালে লেক এলাকার তাপমাত্রা মাইনাস ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। এর পানি তখন জমে বরফে পরিণত হয়।
লেকের পানিতে একটু পরপর ভাসতে দেখা যায় ঘরের আকৃতির বড় বোট। যেন আলিশান ফ্ল্যাট। মাঝি চাচাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, এগুলো হাউজবোট; অর্থাৎ ভাসমান বাড়ি। ডাল লেকে এমন সাত শতাধিক হাউজবোট আছে। এর ভেতরে অত্যাধুনিক হোটেলের মতো নানা ব্যবস্থা আছে। শোবার ঘর, বসার ঘর, বাথরুম কোনোটাই বাদ নেই। সব কিছুই সুসজ্জিত।
লেকের নির্মল পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে কিছু পানকৌড়ি, সাদা বক ও মাছরাঙা। লেকের অপরূপ সৌন্দর্য ওরা যেন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
লেকের মধ্যে রয়েছে ভাসমান বাজার। শাকসবজি থেকে নিয়ে ফলমূল ও চা-নাশতাও মিলে স্বল্প দামে। এভাবেই জীবিকা নির্বাহ করে এখানের মানুষ। এক ঘণ্টা লেকের অপূর্ব সৌন্দর্য অবলোকন করে ফের চড়ে বসলাম গাড়িতে।
একটা চেকপোস্ট পেরিয়ে পৌঁছলাম চশমেশাহি গেটে। ২০ রুপির টিকিট নিয়ে কয়েক ধাপ পাহাড়ি সিঁড়ি চড়লাম। চার দিক নাম না জানা রঙিন ফুলের সমারোহ। ছোট ছোট সবুজ গাছগুলো বাগানটির সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আরো সামনে এগোতেই দেখলাম স্বচ্ছ পানির নালা। এর উৎস খুঁজতে এগোতে থাকলাম সামনে। সিমেন্ট দিয়ে তৈরি মসজিদের গম্বুজের মতো একটা ছোট্ট ঘর থেকে বেরোচ্ছে এ পানি। পাহাড়ি ঝরনাকে কৃত্রিম আকারে বানানো হয়েছে। এর নামই চশমেশাহি। একে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাগানটি। মোঘল সম্রাট শাহজাহান তার বড় ছেলে দারাশিকোকে উপহার দেয়ার জন্য ১৬৩২ সালে এই সুদৃশ্য বাগানটি তৈরি করেন। এই ঝরনার পানি নাকি ভারতের সবচেয়ে সুস্বাদু পানি। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু এই পানি পান করতেন। তথ্যগুলো জানালেন এজাজ ভাই।
চশমেশাহি দেখে ফের চড়লাম গাড়িতে। ডাল লেকের কূল ধরে এগোতে থাকলাম সামনে। লেকের মোহনীয় রূপ দেখে মন ভরছিল না যেন। যতই দেখছি মনের পিপাসা যেন ততই বাড়ছে। এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছলাম জামে মসজিদের গেটে। একতলাবিশিষ্ট এশিয়ার সর্ববৃহৎ জামে মসজিদটি দেখতে অনেকটা রাশিয়ার সেইন্ট পিটারসবার্গের মতো। বাইরে থেকে এর নির্মাণশৈলী দেখে ভেতরে প্রবেশ করার আগ্রহ তীব্র থেকে তীব্রতর হলো। সংরক্ষিত জায়গায় জুতা রেখে প্রবেশ করলাম ভেতরে। মসজিদের ভেতরের আশ্চর্য নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলাম বারবার। ১৩৯৪ সালে সুলতান শিকান্দার শাহ মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের ভেতর রয়েছে ৩৭৮টি সম্পূর্ণ গাছের পিলার, যার মধ্যে ২১ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট পিলার ৩৪৬টি ও ৪৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট পিলার রয়েছে ৩২টি। কথায় কথায় তথ্যগুলো জানালেন এজাজ ভাই। প্রাচীন আমলে এত বিশাল পিলারগুলো কিভাবে দাঁড় করিয়ে ফিট করা হয়েছে, সেটাই বিস্ময়ের।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫