ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ নভেম্বর ২০১৯

মতামত

পান্তা-ইলিশ ও পুঁজিবাদ

মাসউদুর রহমান চৌধুরী

২২ এপ্রিল ২০১৮,রবিবার, ১৮:৫৫ | আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০১৮,রবিবার, ২০:১৫


প্রিন্ট
পান্তা-ইলিশ ও পুঁজিবাদ

পান্তা-ইলিশ ও পুঁজিবাদ

পয়লা বৈশাখ। বাঙালি জাতিসত্তার এক অনন্য পরিচায়ক। এ দিনকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতি বছর শুরু করতে পারে নতুন করে। আমাদের এই উপমহাদেশে বিভিন্ন জাতির বসবাস রয়েছে। তার মধ্যে বাঙালি জাতির বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য গুরুত্বপূর্ণ বৈকি। যেসব বৈশিষ্ট্য বাঙালি জাতিকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে রেখেছে তার মধ্যে অন্যতম, বৈশাখ উৎসব তথা বাংলা বর্ষবরণ। প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি থাকে। নিজেদের স্বতন্ত্র বর্ষপঞ্জি সবার নেই। এ দিক থেকে বাঙালিদের সৌভাগ্যবান বলা যায়। এটি এ জাতির জন্য গর্বের, আনন্দের।

বাংলা বর্ষ বা সন শুরু হয় পয়লা বৈশাখ দিয়ে। এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে উচ্ছ্বাসটা হতে হবে জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যের নিরিখে। অন্যথায় স্বকীয়তাটা হারিয়ে যাবে। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা ও উৎসব এখন নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ঐতিহ্য সংরক্ষণে অনেকে উৎসবের দিকে ধাবিত হচ্ছে, আবার এই উৎসবকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে অনেকে। কারো প্রশ্ন উৎসবের আয়োজন নিয়ে। কারো প্রশ্ন পদ্ধতি নিয়ে। এর মধ্যে পয়লা বৈশাখ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়।

আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে বৈশাখের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তাই বঙ্গাব্দের প্রথম দিন তথা পয়লা বৈশাখে বর্ষবরণ একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। সেই সুযোগে উৎসবের লেবাসে বাংলার সংস্কৃতিতে এমন কিছু আচার অনুপ্রবেশ করেছে, যেগুলোর সাথে এ জাতির সংস্কৃতির দূরতম সম্পর্কও নেই। অথচ নতুন প্রজন্ম সেগুলোকেই মনে করছে জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

অপর দিকে, আমাদের সংস্কৃতির এমন কিছু উপাদানকে ভুলতে বসেছে সবাই যেগুলো ছাড়া এ দেশের সংস্কৃতি দাঁড়াতেই পারে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বৈশাখ উদযাপনে বিভিন্ন প্রাণী যেমন কুমির, বাঘ, হাতি ইত্যাদির প্রতিকৃতি নিয়ে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র আয়োজন হয়। এসব তো আমাদের সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত কিছু নয়। শোভাযাত্রায় কালীর লোহিত জিহ্বা, গণেশের মস্তক এবং মনসার সর্পমূর্তির উল্কি ইত্যাদি থাকে যা সম্পূর্ণরূপে সম্প্রদায় বিশেষের ধর্মীয় সংস্কৃতি; গোটা বাঙালি জাতির সংস্কৃতি নয়। অথচ ‘বৈশাখী’ সম্পর্কিত কোনো কিছু বোঝাতে এগুলোকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আসলে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার সাথেই বৈশাখের কার্যত সম্পর্ক নেই। বিগত আশির দশকে দুর্গতদের সাহায্য করতে এমন একটি আয়োজন করা হয়েছিল। ১৬ এপ্রিল ২০১৬ সালে দৈনিক নয়া দিগন্তে একটি লেখায় দেখুন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মনে করা হয় শৈাখী উৎসবের অন্যতম অঙ্গ।

বাংলাদেশে লোকজ সংস্কৃতিতে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ শব্দের অস্তিত্ব নেই। যতদূর জানা যায়, চারুকলা ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জয়নুল জন্মোৎসব শোভাযাত্রা আয়োজন করে। উদ্দেশ্য, কাপড়-চোপড়, টাকা-পয়সা ও খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ। শোভাযাত্রা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে পহেলা বৈশাখে ঠাঁই করে নিয়েছে। পান্তা-ইলিশের সাথেও বাঙালি সংস্কৃতির কোনো আত্মীয়তা নেই। মঙ্গল শোভাযাত্রা আর পান্তা-ইলিশ কোনোভাবেই আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়।’

বাংলা একাডেমি প্রণীত ব্যবহারিক বাংলা অভিধান সপ্তদশ পুনর্মুদ্রিত সংস্করণে কোথাও ‘পান্তা-ইলিশ’ ও ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ শব্দ দু’টি নেই। বাংলা একাডেমির বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে প্রাচীন সাহিত্য চর্যাপদ থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্য পর্যন্ত বিখ্যাত লেখকদের উদ্ধৃতিসহ রয়েছে শব্দের ব্যুৎপত্তি, সেখানেও নেই ‘পান্তা-ইলিশ’ আর মঙ্গল শোভাযাত্রা’ শব্দদ্বয়।”

অনেকের মতে, বৈশাখী উৎসবের নামে বাড়াবাড়ি পুঁজিবাদের একটি কৌশলী খেলায় পরিণত হয়েছে এবং পুঁজিবাদ তার উন্মাদনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ারই একটি প্রয়াস এটা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে হেয় করা পান্তা-ইলিশ উৎসবের ফ্যাশান চালু হয়েছে। রমনা বটমূলে এবং বৈশাখী শোভাযাত্রায় প্রচুর লোক সমাগম দেখে বসতে শুরু করে ইটালিয়ান (ইট-খুঁটি ও ত্রিপলযোগে বানানো) হোটেল। মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার সখ এদের আবিষ্কার। পুঁজিবাদের ‘চাকা’ হলো বস্তু বা পণ্য। অবিকৃত ও সুস্থ সংস্কৃতির ওপর ভর করলে পুঁজিবাদ টিকতে পারবে না। আর একেকটি উৎসব মানে ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদের সুযোগসন্ধানীদের আখড়া। সুতরাং তার স্বার্থসন্ধানী চোখ জনপ্রিয় পয়লা বোশেখ উদযাপনকে এড়িয়ে যাবে, এমন ভাবনার কোনো অবকাশ নেই। সে মহলের খপ্পরে এখন আমাদের বৈশাখ। নববর্ষ অনেকাংশে মেলাসর্বস্ব হয়ে পড়েছে। বৈশাখ মানে পান্তা-ইলিশ উৎসব কিংবা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা নয়। বৈশাখের দিন এমন উৎসব বাংলাদেশে আবহমান কাল ধরে কখনোই ছিল না। ষাটের দশক থেকে পয়লা বৈশাখের বর্তমান ধাঁচের উৎসবের প্রচলন। সেই উৎসবটিই ধীরে ধীরে আজ মুনাফালোভী করপোরেটের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। নববর্ষ ছিল বাঙালিদের ঐতিহ্যবাহী মেলা ও হালখাতার দিন। পুরাতন সব ঘুচিয়ে নতুন করে শুরু করা হতো এ দিবসে। হিন্দু-মুসলিমদের ঘরে ভিন্নভিন্নভাবে হলেও এসব উদযাপিত হতো। মুসলমানেরা মাওলানা মৌলভী আনিয়ে দোয়া, মিলাদ ও মাহফিল করত, ঘরের মেঝেতে গোলাপজল ছিটাত। আর হিন্দু বাড়িতে গোবর লেপন, ধূপ জ্বালানো, শঙ্খধ্বনি ইত্যাদি করা হতো। বাংলা সনের যা উৎসব অতীতে হতো তা চৈত্র মাসে। বর্ষের শেষ বলে খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব হতো।

পয়লা বৈশাখে বা বঙ্গাব্দের শুরুতে মানুষ ‘হালখাতা’ করাসহ সবকিছু নতুন করে শুরু করার প্রস্তুতি নিত। আজ সংস্কৃৃতির কথা বলে ধুমধাড়াক্কা মেলা জমিয়ে পাঁচ টাকার পান্তা তরুণী হাতে অনেক বেশি দামে খাওয়ানো আর দারিদ্র্যের প্রতি উপহাস করে ইলিশ ভক্ষণের নামে যা করা হচ্ছে- এ সবই মুনাফাবাজ মহলের খেলা। প্রচারণার বর্ণাঢ্যতায় লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে করপোরেট গোষ্ঠী। হলুদ মিডিয়ার কল্যাণে পয়লা বৈশাখকে যেভাবে খাই খাই করে তোলা হচ্ছে প্রকৃত বাঙালিয়ানার সাথে এর সম্পর্ক নেই। সুতরাং একজন বাঙালি হিসেবে এর প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে। সতর্ক করুন বিশেষত অসচেতন নবীন প্রজন্মকে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে সাধ্যমতো প্রতিরোধ করুন।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫