ঢাকা, মঙ্গলবার,১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আমার ঢাকা

হাসপাতালে রোগী নিয়ে দুর্ভোগ

মাহমুদুল হাসান

২৪ এপ্রিল ২০১৮,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট
আর্কাইভ ছবি : আয়াতুল আমিন

আর্কাইভ ছবি : আয়াতুল আমিন

রাজধানীর হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের দুর্ভোগের শেষ নেই। হাসপাতালের অবস্থা এখন হ-য-ব-র-ল। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে উন্নত চিকিৎসা আর ভালো ব্যবহারের নামে গলাকাটা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে একদল। অপর দিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে ডাক্তার-আয়াদের দুর্ব্যবহারে প্রতিদিন অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত রোগীদের। রাজধানীর হাসপাতাল ঘুরে লিখেছেন মাহমুদুল হাসান
প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্য এখনো বন্ধ হয়নি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালগুলোতে। এ ছাড়া দালালদের দৌরাত্ম্য ও যন্ত্রপাতির কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করছে হাসপাতালেরই একটি চক্র। এসব কারণে কাক্সিক্ষত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের।
বেশির ভাগ ডাক্তারই ব্যস্ত নিজেদের তৈরি করা হাসপাতাল নিয়ে। প্রায় সবাই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে। এ কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকেরা নিজেরাই রোগীদের বলেন, এখানে ভালো অবস্থা নেই। আপনারা অমুক ক্লিনিকে চলে যান। সেখানে আমি নিজেই দেখে দিতে পারব। অসহায় রোগীরা ডাক্তারদের সে কথাই শোনেন।
হৃদযন্ত্রে প্রচণ্ড সমস্যা নিয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি হয়েও এ কিশোরকে যেতে হচ্ছে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে। বেলা ১১টাতেই এক্স-রে মেশিন নষ্ট হওয়ায় তার এ ভোগান্তি। এখানে আসা রোগীদের রয়েছে আরো অভিযোগ। মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে আসা এক রোগী দালালদের কথামতো অন্য হাসপাতালে না যাওয়ায় চিকিৎসা মেলেনি। সকাল ৮টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত চেষ্টা করে পরিচালকের হস্তক্ষেপে চিকিৎসার অনুমতি মেলে তার। নিউরো সাইন্স হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে কয়েক হাজার রোগী আসেন। ভর্তি হতে না পেরে ফেরত যান অনেকেই। এসব রোগীর শেষ আশ্রয়স্থল হয় বেসরকারি হাসপাতাল। তবে বেসরকারি বেশির ভাগ হাসপাতালের ওপরও আস্থা নেই অনেকের। এর জন্য যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই দায়ী।
মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডে ৯তলা ভবনের আটতলাজুড়ে বিডিএম হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ৩০০ বর্গফুটের একে একটি কক্ষে চার-পাঁচটি শয্যা। হাসপাতালে রোগী থাকলেও অনুপস্থিত মানসম্মত অপারেশন থিয়েটার। মোহাম্মদপুরের পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটিতে কার্যক্রম চালাচ্ছে সেবিকা জেনারেল হাসপাতাল। তিনতলা ভবনের নিচতলায় অভ্যর্থনা ও চিকিৎসকদের বসার স্থান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো যন্ত্রপাতি নেই এখানে। নামমাত্র অপারেশন থিয়েটার থাকলেও সেটিও ব্যবহার উপযোগী নয়। কোনো রোগীর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়লে বাইরের কোনো হাসপাতাল থেকে অপারেশন করিয়ে আনা হয়।
বিডিএম ও সেবিকা জেনারেল হাসপাতালের মতোই মোহাম্মদপুরের বাবর রোড, খিলজি রোড ও হুমায়ুন রোডের অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল কার্যক্রম চালাচ্ছে লাইসেন্সের এসব শর্ত পূরণ ছাড়াই। শর্ত পূরণ না হওয়ায় লাইসেন্সও নবায়ন হয়নি। ফলে অবৈধ হয়ে পড়েছে এসব হাসপাতাল। এ তিন সড়কের মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যেই যার সংখ্যা ১৪টি। আর লাইসেন্স রয়েছে এমন হাসপাতালসহ এর সংখ্যা ২৬টি।
১৯৮২ সালের দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্সেই বলা আছে, কোনো হাসপাতালে রোগী প্রতি ফ্লোর স্পেস থাকতে হবে ন্যূনতম ৮০ বর্গফুট। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটারের পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে শয্যা সংখ্যার বিপরীতে নির্দিষ্টসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স। সেই সাথে অপরিহার্য হিসেবে ঘোষিত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা থাকলেই কেবল কার্যক্রম চালাতে পারবে বেসরকারি কোনো হাসপাতাল। তবে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং পঙ্গু হাসপাতালের রোগীদের কেন্দ্র করেই মূলত গড়ে উঠেছে এসব হাসপাতাল। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা নিয়মিত রোগীও দেখছেন অবৈধ এসব হাসপাতালে।
মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের জনসেবা নার্সিং হোম অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, সাততলা বাড়ির নিচতলার রিসিপশনে একজন যুবক বসা। আবাসিক ভবনের মধ্যে ১৫০-২০০ বর্গফুটের একেকটি কক্ষকে ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে, যেখানে শয্যা রাখা হয়েছে চারটি করে। অর্থাৎ রোগীপ্রতি ৫০ বর্গফুট জায়গাও বরাদ্দ নেই। এ হাসপাতালও কার্যক্রম চালাচ্ছে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই। জনসেবা নার্সিং হোমের ঠিক উল্টো দিকেই লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম। সাততলা আবাসিক ভবনে গড়ে তোলা হাসপাতালটিতে গিয়ে দু-একজন ওয়ার্ডবয় ছাড়া কাউকে পাওয়া যায়নি। এমনকি খালি ছিল রিসিপশনও। ওয়ার্ডবয়দের সাথে কথা হলে তারা জানান, রোগী আসার খবর পেলে হাসপাতালের কর্মকর্তারা আসেন। বাকি সময়টা আমরাই চালাই।
লাইসেন্স না থাকলেও নামীদামি চিকিৎসকদের দিয়েই কার্যক্রম চালাচ্ছে বাবর রোডের আরেক হাসপাতাল রয়্যাল মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটাল। তিনতলা ভবনের নিচতলা ও দ্বিতীয়তলা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনাকারী হাসপাতালটিতে রোগী দেখেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা।
হুমায়ুন রোডে বিডিএম হাসপাতালের পাশেই সড়কটির বি ব্লকে চারতলা ভবনে কার্যক্রম চালাচ্ছে নবাব সিরাজউদদৌলা মানসিক ও মাদকাসক্ত হাসপাতাল। লাইসেন্স নবায়ন না করলেও হাসপাতালটিতে নিয়মিত রোগী দেখেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। একই এলাকার লাইসেন্স না থাকা সেবিকা জেনারেল হাসপাতালেও নিয়মিত রোগী দেখছেন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। অনুসন্ধানে জানা যায়, অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এসব হাসপাতাল গড়ে তোলার পেছনে রয়েছেন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। কখনো নিজের নামে, কখনো আবার অন্যের নামে এসব হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা। হুমায়ুন রোডের বিডিএম হাসপাতালটিরও প্রতিষ্ঠা সাত চিকিৎসকের হাতে। এদের মধ্যে একজন পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসক। বাকিরাও সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক। চিকিৎসকদের মালিকানায় গড়ে ওঠা হাসপাতালটির বেশির ভাগ রোগীই পঙ্গু হাসপাতাল থেকে ভাগিয়ে আনা। কাজটি করছেন হাসপাতালটির মালিকানায় থাকা চিকিৎসকেরা নিজেই।
এসব হাসপাতালের বাইরেও মোহাম্মদপুরের ওই তিন সড়কে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে মনমিতা মানসিক হাসপাতাল, প্লাজমা মেডিক্যাল সার্ভিস অ্যান্ড ক্লিনিক, শেফা হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ইসলামিয়া মানসিক হাসপাতালও। সম্প্রতি র্যাব অভিযান চালিয়ে ক্রিসেন্ট হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স, মক্কা মদিনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতাল ও বাংলাদেশ ট্রমা স্পেশালাইজড হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছে।
হাসপাতালের অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। নবায়নও করে তারাই। প্রতি বছর ৩০ জুনের মধ্যে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। পরিদর্শন করে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নবায়ন করা হয়। লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে হাসপাতালের পর্যাপ্ত জনবল, যন্ত্রপাতি, হালনাগাদ পরিবেশ ছাড়পত্র, আয়কর সনদ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র দেখা হয়।
অবৈধ এসব হাসপাতালের ভিড়ে মোহাম্মদপুরের এ তিন সড়কে বৈধ হাসপাতালের সংখ্যাও কম নয়। ৫০০ মিটারের মধ্যেই বৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে আরো ১২টি হাসপাতাল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আশিক মাল্টি স্পেশালাইজড হাসপাতাল, এলিট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আল মারকাজুল ইসলামী হাসপাতাল, প্রাইম অর্থোপেডিক অ্যান্ড জেনারেল হসপিটাল, ডায়োমেট হার্ট সেন্টার, ইজি লাইফ ফর বাংলাদেশ ও ইউকে ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটি সেন্টার।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫