ঢাকা, সোমবার,১৮ নভেম্বর ২০১৯

মতামত

কৃষকের কান্না ও বৈশাখের বিষাদ

এম জে এইচ জামিল

২৪ এপ্রিল ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৬:০০


প্রিন্ট
এপ্রিল মাস প্রবেশ করতে না করতেই দেশব্যাপী শুরু হয়ে যায় কালবৈশাখী ঝড়।

এপ্রিল মাস প্রবেশ করতে না করতেই দেশব্যাপী শুরু হয়ে যায় কালবৈশাখী ঝড়।

আমি হাওরপাড়ের সন্তান। গ্রামের কৃষকের ছেলে আমি- এটা গর্ব করেই বলি। এসএসসি পাস করে গ্রাম থেকে যখন সিলেট শহরে এসে এইচএসসিতে ভর্তি হই, তখন আমাদের বেশভূষা এবং কথা বলার ভঙ্গি দেখে অনেকেই মজা করত। শহরের বন্ধু ও সহপাঠীরা মনে করত- আমরা হাওর থেকে উঠে এসেছি, যেন ‘গেঁয়োভূত’। তবে কখনোই মন খারাপ করিনি এই ভেবে যে, আমার লক্ষ্য বহুদূরে। এসব দিকে নজর দিলে লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হবে না। হয়তো বড় কোনো চাকরি কপালে জোটেনি, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামাতে পারিনি; তবে দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। আর এটাই ছিল আমার গ্রাম থেকে শহরে আসার প্রধান লক্ষ্য। আলহামদুলিল্লাহ।

এপ্রিল মাস প্রবেশ করতে না করতেই দেশব্যাপী শুরু হয়ে যায় কালবৈশাখী ঝড়। এতে কেউ কেউ মারা যাওয়ার খবরও মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। আর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নাই বললাম। তবে সবচেয়ে কষ্ট পেলাম, যখন দেখি আকাশ থেকে শিলাবৃষ্টি ঝরছে। তখন মনে হয়েছিল, এই শিলাবৃষ্টি যেন প্রতিটি কৃষক পরিবারের সদস্যের বুকে আছড়ে পড়ছে। কারণ, পর পর দু’বার কষ্টের ফসল হারিয়ে হাওরপাড়ের বিশাল জনগোষ্ঠী নীরব দুর্ভিক্ষের দুর্দিন পার করছে। মনে জমা রয়েছে যন্ত্রণা ও কষ্টের পাহাড়। তা হয়তো কেউ দেখবে না। এমন কি, হয়তো সহযোগিতা করতে হবে, এমনটা মনে করে এ নিয়ে জানতেও চাইবে না। তবুও বেঁচে আছে হাওরপাড়ের মানুষ। আশায় বুক বেঁধেছে, এ বছর অন্তত কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে পারবে। এলাকায় এলাকায় মসজিদে মসজিদে এবং বাড়িতে বাড়িতে ওয়াজ এবং তাফসির মাহফিল, শিরনি-সালাত করে সবাই মুনাজাত করছে, এবার যেন আল্লাহ পাক তার কুদরতি শক্তি দিয়ে হাওরবাসীর কষ্টের সোনালি ধান গোলায় তোলার তাওফিক দেন। আমিন।

এপ্রিল মাস আসতে না আসতেই ফেসবুকের মেসেঞ্জারে লক্ষ করলাম, কতিপয় বন্ধু বাংলা নববর্ষের আগাম শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। নানা রঙ-ঢঙের মেসেজ দিয়ে তারা নতুন বছরকে স্বাগত জানালেন । পয়লা বৈশাখ প্রশাসনের নির্দেশেও সরকারি অর্থে দেশব্যাপী আয়োজন থাকে নানা উৎসবের। আবালবৃদ্ধবনিতা সেদিন মেতে ওঠে বাঙালিয়ানার মহোৎসবে। এক দিনের বাঙালি সাজার উৎসবে সেদিন বিদেশীরাও অবাক হয়, লজ্জা পায়। বৈশাখের প্রথম দিনে দেখা যায়, যারা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দেন, তারাই ফ্যাশন হিসেবে পান্তাভাত আর ইলিশ মাছ খেয়ে মজা করছেন। মনে হয় গোটা কৃষকসমাজের সাথে এটা ফাজলামোর শামিল।

কৃষকের নতুন ধান তোলার সাথে যদি বৈশাখের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পৃক্ত থাকে, তাহলে ধান ওঠার আগেই কেন এত উল্লাস? এটা কি কৃষকের সাথে উপহাস নয়? এমন প্রশ্ন সচেতন মহলের কাছে অবশ্যই করা যায়। গত বছরও বৈশাখী উৎসব হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল কৃষকের কষ্টের সোনালি ফসল বোরো ধান। কিছু শহরে বৈশাখ উদযাপনকারী আর কৃষকদের অনিশ্চিত অবস্থা দেখে মনে হয়, এক পক্ষ উপহাস করবে আর অপর পক্ষ সোনার ফসল হারিয়ে কপালে হাত দিয়ে বসে থাকবে।

এ লেখার কারণ যে ছবি, তা ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা। এর ঘটনা এমন, একজন কৃষক ক্ষেতে কাজ করার সময় হঠাৎ বজ্রপাতে মারা যান। এই কৃষকের আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই সমবেদনা ও সহমর্মিতামূলক পোস্ট করেছেন। কিন্তু প্রকৃত বিষয় হলো শেষ বিদায়ের রেশটা। কৃষক জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তার বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন কষ্টের ধানের চারা। ছবিটির দিকে ভালো করে তাকালে মনে হবে নিজের কষ্টের ফসল রক্ষা করতে তিনি প্রতিপক্ষের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শেষ পর্যন্ত ধানের চারাকে নিজের পতাকা হিসেবে জড়িয়ে ধরে পৃথিবীকে চির বিদায় জানাচ্ছেন। শেষ বিদায়ে এই কৃষক বীরের মনের কথা ছিল এটাই- আমার কষ্টের ধান যদি গোলায় তুলতে না পারি, কী হবে এই পৃথিবীতে বেঁচে থেকে?’

আসল কথা হলো- বৈশাখের যন্ত্রণা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ জানে না। সেই কৃষিজীবীকে বলতে ইচ্ছা করে, তোমার জন্য দোয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না, হে বীর কৃষক। আমাদের অক্ষমতাকে ক্ষমা করো। কথা দিলাম; যতই শিক্ষিত হই, যতই কোটিপতি হই, কোনো দিন নিজেকে ‘কৃষকের সন্তান’ পরিচয় দিতে মোটেও লজ্জাবোধ করব না। আর যারা তোমাদের সাথে, কৃষকের সাথে উপহাস করবে, কৃষকের সন্তান হয়ে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করবে; তাদের প্রতি থাকবে অজস্র ঘৃণা। স্যালুট হে বিপ্লবী কৃষক। তুমিই হাওরপাড়ের নায়ক।

লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫