ঢাকা, বুধবার,১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অপরাধ

ইঞ্জিনিয়ার থেকে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াত : নিমিষেই কোটি কোটি টাকা গায়েব

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৬ এপ্রিল ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ০৬:৫০


প্রিন্ট
ইঞ্জিনিয়ার থেকে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াত : নিমিষেই কোটি কোটি টাকা গায়েব

ইঞ্জিনিয়ার থেকে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াত : নিমিষেই কোটি কোটি টাকা গায়েব

সুপার শপ স্বপ্নের কর্মচারী শরিফুল ইসলাম (৩৩)। গ্রাহকদের ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ডের পিন নম্বর চুরি করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় সেই রুমমেটের কাছে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির হাতেখড়ি হয় তার। দেশে ফিরে এ কৌশল প্রয়োগ করে বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা বলছেন, সুপার শপে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করার সময় শরিফুল ব্যবহার করতেন ডিজিটাল হাতঘড়ি, যাতে সংযুক্ত ছিল বিশেষ মিনি কার্ডরিডার। সেটি দিয়েই গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করতেন শরিফুল।

জানা গেছে, হাতঘড়িতে সংযুক্ত বিশেষ মিনি কার্ড রিডারের মাধ্যমে গ্রাহকের এটিএম কার্ডের অভ্যন্তরীণ তথ্য স্ক্যান করা হতো। তারপর গ্রাহক যখন পিন নম্বর দিতেন, কৌশলে সেটিও টুকে নেয়া হতো এবং বিলের রি-প্রিন্ট দিয়ে ওই কপির পেছনে লিখে রাখা হতো। এভাবেই এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করত প্রতারক শরিফুল ইসলাম। পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শরিফুলকে সিআইডি গ্রেফতারের পরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার রাতে মিরপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট। এ সময় তার কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, এক হাজার ৪০০টি কোন কার্ড, একটি ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ কার্ড রিডার ও রাইটার, তিনটি পজ মেশিন, সচল ডিজিটাল হাতঘড়ি (গ্রাহকদের তথ্য চুরিতে ব্যবহৃত), দু’টি মিনি কার্ড রিডার ডিভাইস, ১৪টি পাসপোর্ট, আটটি মোবাইল ফোন সেট, ডাচ বাংলা ব্যাংকের একটি নেক্সাস ক্রেডিট কার্ড, তিনটি এনআইডি কার্ড, একটি পরচুলা ও একটি কালো রঙের সানগ্লাস জব্দ করা হয়।

গতকাল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, চলতি বছরের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সঙ্ঘটিত পাঁচটি (ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইবিএল, ইউসিবিএল, ব্যাংক এশিয়া) ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি ঘটনার তদন্ত হয়। আমরা জানতে পারি, ব্যাংকের গ্রাহকেরা বিভিন্ন সুপার শপ ও ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে পণ্য কেনার পর কার্ড পাঞ্চ করার সময় একটি চক্র সুকৌশলে গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে কোন কার্ড তৈরি করে। পর এসব কোন কার্ড দিয়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরি করে নিচ্ছে। সেই অভিযোগে আসামি শরিফুলকে মিরপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়।

মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, শরিফুলের গ্রামের বাড়ি মেহেরপুরের হেমায়েতপুর। তিনি হাট বোয়ালিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় হতে ২০০১ সালে এসএসসি এবং গাঙনি ডিগ্রি কলেজ হতে ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করেন এবং রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি নিয়ে ২০১০ সালে বাংলাদেশে ফেরত আসেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় তার রাশিয়ান রুমমেট ইভানোভিচ-এর কাছ থেকে ক্রেডিট কার্ড প্রতারণার কৌশল শিখে আসেন।

তিনি আরো জানান, দেশে আসার পরপরই সে কার্ড জালিয়াতি শুরু করে। ২০১৩ সালে এ-সংক্রান্ত দু’টি মামলা হয় এবং সেই মামলায় প্রতারক শরিফুল ১৮ মাস জেলে থাকে। এরপর সে স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি ফার্ম খুলে, সেখানে তেমন সুবিধা করতে না পেরে রুমমেটের কাছ থেকে শিখা কৌশল আবারো কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। শরিফুলের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং মামলার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান সিআইডির এ বিশেষ পুলিশ সুপার।

সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, শরিফুল সুপার শপ স্বপ্নের বনানী শাখায় কাজ করার সময়ে নিজের হাতঘড়িতে সংযুক্ত বিশেষ স্কিমিং মিনি কার্ড রিডারের মাধ্যমে গ্রাহকের কার্ডের অভ্যন্তরীণ তথ্যাবলি নিয়ে নিতো। তারপর গ্রাহক যখন পিন নাম্বার দিতো তখন কৌশলে পিন নাম্বার দেখে নিয়ে বিল পরিশোধের পর আবার গ্রাহকের যাবার পর রি-প্রিন্ট দিয়ে কপিটা সংগ্রহ করে তার পেছনে পিন নাম্বারটি লিখে রাখতো। পরে সে তার বাসায় গিয়ে ল্যাপটপ এবং ডিভাইসের মাধ্যমে কাস্টমারের তথ্যাবলি ভার্জিন কার্ড বা খালি কার্ডে স্থাপন করে কোন এটিএম কার্ড বানিয়ে কোনো একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিতো। বুথে টাকা তোলার সময় সিসি ক্যামেরায় যাতে তাকে চেনা না যায় সে জন্য পরচুলা এবং চশমা ব্যবহার করত।

তিনি বলেন, সুপার শপে চাকরি করলেও তার মূল পেশা ছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। এই জালিয়াতি মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ টাকায় সে বিলাসবহুল জীবন যাপন করত। শরিফুল ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য টয়োটা এলিয়ন মডেলের গাড়ি ব্যবহার করে এবং তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে এ পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে।
এ সময় ব্র্যাক ব্যাংকের হেড অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিস কোয়ালিটি জারা জাবীন মাহবুব বলেন, কয়েকজন গ্রাহক তাদের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারেন যে ব্যাংক থেকে কেউ তাদের টাকা তুলে নিয়েছে। তখন তারা আমাদের জানালে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখে তাদের টাকা ফেরত দিয়ে দেই। পরে আমরা বিষয়টি সিআইডিকে জানাই। মার্চ মাসে এ-সংক্রান্ত ৯টি অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫