ঢাকা, বুধবার,২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ইসলামী দিগন্ত

স্রষ্টাভীতিই নিরাপত্তার উপায়

ইয়াসমিন নূর

২৭ এপ্রিল ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

‘একমাত্র স্রষ্টার কাছে একদিন সবকিছুর হিসাব-নিকাশ দিতে হবে, কেননা তিনি সর্বজ্ঞাতা, সর্বস্রষ্টা এবং চূড়ান্ত শাস্তিদাতা।’ Ñমানুষের মনে এ বিশ্বাসটা অর্থাৎ স্রষ্টার ভয় থাকলে সমাজের চিত্রটা অন্যরকম হতো! তখন না থাকত অন্যায়-অবিচার, না প্রয়োজন হতো আইন-আদালতের আর না থাকত অভাব-অশান্তি! এতে যে মানুষ একালেই নিরাপদ থাকত এমন নয় বরং পরকালেও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো। পবিত্র কুরআন মাজিদে গ্যারান্টিসহকারে বলা হয়েছেÑ ‘যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে রাখে নিশ্চয়ই জান্নাত হবে তার আবাসস্থল’ (সূরা নাযি’আত : ৪০-৪১)। দয়াময় আল্লাহ তাঁর বান্দাহকে চিরস্থায়ী নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে বারবার তাগিদ দিয়ে, উৎসাহিত করে বলেছেন, ‘তোমরা পাথের সংগ্রহ করে নাও। তবে মনে রাখবে তাকওয়াই (স্রষ্টাভীতি) উত্তম পাথেয়’ (সূরা বাকারাহ্ : ১৯৭)। ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আর মনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের (আল্লাহভীরু) সাথে আছেন (সূরা তাওবা : ৪)। ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি’ (সূরা-হুজুরাত : ১৩)।
বলাবাহুল্য, মানুষকে স্রষ্টাভীতির প্রতি উৎসাহিত করার পেছনে স্রষ্টার নিজের কোনো স্বার্থে নেই। কারণ তিনি অমুখাপেক্ষী, মানুষের কোনো আচরণই তাঁর সৃষ্টিলীলায় কোনো পার্থক্য ঘটাতে পারে না। বাকি থাকে মানুষের নিজের স্বার্থের বিষয়। হ্যাঁ, নিজের কল্যাণের স্বার্থেই তার মনে স্রষ্টাভীতি থাকা প্রয়োজন। স্রষ্টার নির্দেশ পালনের জন্যই হোক বা বিনিময়ে স্রষ্টার নৈকট্য, ভালোবাসা, সম্মান বা নিরাপদ পরকাল লাভের আশায়ই হোক, স্রষ্টাভীরুর সাফল্য অনিবার্য অথচ স্রষ্টার এতে লাভ বা ক্ষতি নেই।
জাগতিক ক্ষেত্রেও স্রষ্টাভীতি মানুষের কল্যাণ সাধন করে। কেননা চারিত্রিকভাবে মানুষকে নিষ্কলুষ লাখার মূল চাবিকাঠিই হলো স্রষ্টাভীতি। কারণ যে মানুষ অভিভাবক, সমাজ বা প্রশাসনের ভয়ে অপরাধ থেকে বিরত থাকে সে ফাঁক পেলেই অপরাধ করে বসেÑ যার প্রভাব ধীরে ধীরে গোটা মানবজাতির ওপর পড়ে ও বিশ্ব সমাজের অকল্যাণ সাধিত হয়। কিন্তু যে শুধু স্রষ্টার ভয়ে ভীত সে কোনো অবস্থাতেই এমন কোনো কাজ করতে পারে না যা স্রষ্টার অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। কারণ সে জানে স্রষ্টা সূক্ষ্মদর্শী, সৃষ্ট জগতের কোনো কিছুই তাঁর কাছে গোপন থাকে না। এ কারণেই স্রষ্টাভীরু নিজে বলিষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের পাশাপাশি সমাজের সবার বিশ্বাসযোগ্যতাও অর্জন করে। তাই সমাজের স্রষ্টাভীরুর সংখ্যা বেশি হলে পারস্পরিক আস্থা, সম্প্রীতি, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে। অপর দিকে স্রষ্টাভীতির অভাবে সমাজের চরিত্রহীন মানুষগুলো লোকচুর অন্তরালে নানা অপরাধ ঘটিয়ে সমাজজীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। যার প্রভাব পড়ে সমাজ থেকে রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র থেকে সারাবিশ্বে। যার নজির বর্তমান বিশ্বে বেশ স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে। বিশ্বকে এ অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে ব্যক্তিগতভাবে সবার স্রষ্টাভীতি অবলম্বন ছাড়া কোনো উপায় নেই। পরিশেষে একজন স্রষ্টাভীরুর কাহিনী দিয়ে ইতি টানছি। এ কাহিনীতে এক গুরু তার কয়েকজন শিষ্যের মধ্যে একজনকে একটু বেশিই ভালোবাসতেন, যা বাকিদের নজরে পড়ত। ফলে একদিন সবাই গুরুর কাছে এ নিয়ে অভিযোগ করল। এর উত্তরে তিনি কিছু না বলে সবার হাতে একটি করে কবুতর দিয়ে বললেনÑ ‘তোমরা প্রত্যেকে এমন কোনো জায়গায় গিয়ে কবুতরগুলো জবাই করে নিয়ে আস যেখানে তোমাদের কেউ দেখতে না পায়।’ গুরুর আদেশ পালনপূর্বক সবাই কবুতরগুলো জবাই করে নিয়ে এলো কিন্তু সেই প্রিয় শিষ্যটি জীবিত কবুতর নিয়ে ফিরল। এ নিয়ে সবার চোখে মুখে প্রশ্ন দেখে গুরু তাকে জিজ্ঞেস করলেনÑ ‘তুমি আমার কথা অমান্য করলে কেন?’ উত্তরে শিষ্যটি বললÑ ‘গুরুজি! আমি এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাইনি যেখানে আমাকে কেউ দেখতে পায় না।’ এ উত্তরে সন্তুষ্ট হতে না পেরে বাকিরা একে একে বলতে লাগল। ‘কেন ওই পাহাড়ের পেছনে তো কেউ ছিল না। কেউ বলল, নদীর তীরে তো কেউ ছিল না! আর একজন বলল, জঙ্গলের ভেতরে তো আমাকে কেউ দেখেনি। শেষে গুরু প্রিয় শিষ্যটিকে বললেন, এবার তুমি কী বলবে? উত্তরে সে বলল, ‘গুরুজি! আপনি শিখিয়েছেন স্রষ্টা আকাশ-পাতালের সব কিছুই দেখেন, সব কিছুই শোনেন, তাহলে স্রষ্টা তো আমাকেও দেখছেন! এ অবস্থায় আমি কোথায় গিয়ে কবুতর জবাই করব?’ এ শিষ্যের মতো যদি আমরা সবাই স্রষ্টাকে ভয় পেতাম তাহলে কি সমাজে নিরাপত্তা, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এত আইন-আদালত, শাসনব্যবস্থা, রক্ষীবাহিনী ইত্যাকার সব কিছুর প্রয়োজন হতো?
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫