ঢাকা, বুধবার,২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ইসলামী দিগন্ত

শ্রমিক-মালিক সম্পর্কে ইসলাম

মো: তৌহিদুল ইসলাম

২৭ এপ্রিল ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

মালিক-শ্রমিক সমস্যা মানব সমাজের এক সুপ্রাচীন সমস্যা। সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করলেও সবার সামাজিক অবস্থান একই রূপ নয়। কেউ ধনী, কেউ গরিব, কেউ উঁচু বংশের, কেউ নিচু বংশের, কেউ দ, কেউ অদ। মানুষ বিশেষ করে গরিব, অশিতি, শ্রমিক, কুলি-মজুরের মর্যাদা কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন কোন বিষয় দিয়ে নিরূপিত হবে, আর তার দৃষ্টিভঙ্গিই বা কিরূপ হবে, এই মৌলিক বিষয়ে পার্থক্য থাকার কারণে শ্রমিকের অধিকার, মালিকের সাথে সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের মাপকাঠিতে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অধিকার প্রতিষ্ঠা দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সুসম্পর্ক ও সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। পারস্পরিক সমঝোতা ছাড়া কোনোক্রমেই তা সম্ভব হয় না। এ জন্য মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক রা করার ব্যাপারে ইসলাম জোর তাগিদ দিয়েছে।
জীবনযাত্রার জন্য, সমাজ ও জাতির উন্নতি-অগ্রগতির জন্য শ্রম এক অপরিহার্য উপাদান। অর্থনীতিতে উৎপাদন কাজে পরিশ্রমের বিনিময়ে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যকে ব্যবহারের নাম শ্রম। শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তি শ্রমিক। কর্মনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রমিক হলো সেই যে নিয়োগদাতার আবেদনের পরিপ্রেেিত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শ্রম দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রম দুই ধরনেরÑ ক. হালাল শ্রম, খ. হারাম শ্রম। ইসলামে শুধু হালাল শ্রমকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। উন্নয়নের জন্য শ্রমের বিকল্প নেই। তাই শুধু মসজিদে বন্দেগিতে মশগুল না থেকে সালাত শেষে জীবিকার্জনের জন্য পৃথিবীতে বের হয়ে পড়ার কথা আল্লাহ বলেছেন (আল কুরআন; ৬২ : ১০)। আজ অবধি পৃথিবীতে যা কিছু গড়ে উঠেছে তা সবই শ্রমের ফল। হজরত আদম (আ:) ছিলেন দুনিয়ার প্রথম চাষি, হজরত নূহ (আ:) ছিলেন রাখাল, রাসূল (সা:) মজুরের বিনিময়ে মক্কার লোকদের ছাগল চরিয়েছেন। পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহকারীকে রাসূল (সা:) আল্লাহর বন্ধু বলেছেন (বুখারি)। রাসূল (সা:) শ্রম দিয়ে জীবিকার্জনের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘কারো জন্য নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম আহার্য আর নেই।’ আল্লাহর নবী দাউদ (আ:) নিজ হাতের কামাই খেতেন (মিশকাত শরিফ, হা/২৭৫৯)।
ইসলাম শ্রম ও শ্রমিকের যথার্থ মূল্যায়ন করেছে। আইয়্যামে জাহেলিয়াতের সময় শ্রমজীবীকে পশুর মতো হাটবাজারে বিক্রি করা হতো। রাসূল (সা:) সেই সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। রাসূল (সা:) সব সময় গরিবের সাথে থাকতেই পছন্দ করতেন। তিনি মনিব-গোলাম প্রথাকে ঘৃণা করতেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার সব আদম সন্তানকেই সম্মানিত করেছি আর কাউকে অন্যের ওপর বেশি মর্যাদা দিয়েছি’ (আল কুরআন; ১৭:৭০)। ইসলাম সব বৈধ পেশাকে উৎসাহিত করে এবং সব পেশার মানুষকে সমান সম্মান করে। সম্পদ, বংশ ও পেশার কারণে মানুষের মর্যাদা নিরূপিত হয় না। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নিরূপিত হয় নৈতিকতা, নিষ্ঠা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে (আল কুরআন; ৪৯:১৩)। ইসলাম শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে মূলনীতি ও বিধান প্রবর্তন করেছে। হজরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা:) বলেন, ‘সর্বোত্তম উপার্জন হচ্ছে মজুরের উপার্জন, যদি সে মনিবের সদিচ্ছা ও ঐকান্তিকতার সাথে সম্পন্ন করে’ (মুসনাদে আহমদ)।
পুঁজিবাদী সমাজে মালিকের সম্পত্তিতে অধিকার নেই শ্রমিকের। তাই একদিকে ধনীরা আরো ধনী, গরিব আরো গরিব হয়। শ্রমিকের সাথে মালিক ততটুকুই সম্পর্ক রাখে যতটুকু তার স্বার্থের জন্য দরকার। অন্য দিকে সমাজতান্ত্রিক সমাজে সম্পত্তির মালিক রাষ্ট্র। কিন্তু সেই সম্পত্তির সুষম ও ইনসাফভিত্তিক বণ্টন না হওয়ায় ক্রমেই বন্ধ হয় ব্যক্তি উদ্যোগ। আর বণ্টন ব্যবস্থায় অদতার কুফল ভোগ করে মূলত শ্রমিক ও গরিব শ্রেণী।
ইসলামে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক হবে পিতা-সন্তানের মতো। নিজের পরম আত্মীয়ের মতো শ্রমিকের সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করা, পরিবারের সদস্যের মতোই তাদের আপ্যায়ন করা, শ্রমিকের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার প্রতিটি মুহূর্তের প্রতি মালিকের খেয়াল রাখা এবং তাদের সুযোগ-সুবিধার প্রতি ল রাখা মালিকের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। শ্রমিকদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সামান্য মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিতকারীদের ব্যাপারে রাসূল (সা:) বলেন, তাদের ব্যাপারে কিয়ামতের দিন অভিযোগ করা হবে। শ্রমিকের কাজে ফাঁকি দেয়া অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এ জন্য তাকেও কিয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে। আর শ্রমিক যদি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করে তার জন্য দ্বিগুণ পুরস্কারের ঘোষণায় রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন, ‘ওই শ্রমিক যে নিজের মালিকের হক আদায় করে সে আল্লাহর হকও আদায় করে’ (মিশকাত শরিফ : হা/১১)। হজরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা:) বলেন, যেই সত্তার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার কসম! যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ, হজ ও আমার মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের ব্যাপারগুলো না থাকত, তাহলে আমি শ্রমিক হিসেবেই মৃত্যুবরণ করতে পছন্দ করতাম’ (বুখারি শরিফ : হা/২৫৮৪)। বিশ্ব ইতিহাসে রাসূল (সা:)-ই সর্বপ্রথম মানবিক শ্রমনীতি প্রণয়ন করেন।
ইসলাম মালিকের কাঁধে যেসব বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রমের মূল্য বা মজুরি। কুরআনে দেড় শ’ স্থানে ‘আজর’ তথা শ্রমের মূল্য বা বিনিময় শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রমের এই পবিত্র দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে ইসলাম শ্রমিকের মজুরি বা পারিশ্রমিককেও পবিত্র ঘোষণা করে, উদ্বুদ্ধ করে যাতে সব শ্রমিককে তার পারিশ্রমিক দেয়া হয়। সবগুলোই কর্মজীবনে পারস্পরিক বিনিময়ের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন সূরা কাসাসে হজরত মূসা (আ:)-এর ঘটনা বর্ণনায় বলা হয়েছে ‘অতঃপর নারীদ্বয়ের একজন তার কাছে এসে বলল, আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন, যেন তিনি আপনাকে পশুগুলোকে পানি পান করানোর বিনিময়ে পারিশ্রমিক দিতে পারেন।’ রাসূল (সা:) পারিশ্রমিক নির্ধারণ ছাড়া শ্রমিক নির্বাচন করে শ্রমিকের কাছ থেকে কাজ আদায় করাকে নিষেধ করেছেন।
কাজের আগে মালিক শ্রমিকের সাথে চুক্তি করে। সেই চুক্তির আওতায় শ্রমিক কাজ করে, বিনিময়ে মালিক তাকে মজুরি দেয়। এখানে মালিক ও শ্রমিক পরিপূর্ণভাবে চুক্তি বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবে। শ্রমিক নিজের ওপর মালিকের দায়িত্ব নিয়ে এমন এক নৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে, এ কাজ সে অর্থ উপার্জনের জন্য করে না, বরং এর সাথে পরকালের সফলতা জড়িত বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। চুক্তি পূর্ণ করার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা প্রতিশ্র“তি পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই প্রতিশ্র“তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে’ (আল কুরআন; ২৮ : ২১৬, ৫ : ১)। শ্রমিকের দায়িত্ব চুক্তি মোতাবেক মালিকের প্রদত্ত কাজ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে সম্পাদনা করা। রাসূল (সা:) বলেন ‘ধনী ব্যক্তির প থেকে কারো পাওনা প্রদানে টালবাহানা করা জুুলুম, আর যখন তোমাদেরকে কোনো সম ব্যক্তির প্রতি ন্যস্ত করা হয় তখন সে যেন তা অনুসরণ করে’ (বুখারি : হা/২২৮৭)। অন্য হাদিসে এসেছেÑ মহান আল্লাহ বলেন, ‘কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিপে থাকব তার মধ্যে একজন হচ্ছে ওই ব্যক্তি যে কাউকে কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করার পর তার থেকে কাজ বুঝিয়ে নিয়েছে অথচ তার প্রাপ্য দেয়নি’ (বুখারি : হা/২২২৭)।
হজরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা:) বলেন, ‘তোমাদের অধীনস্থ ব্যক্তিরা দাস-দাসী, শ্রমিক, কর্মচারীরা তোমাদের ভাই। সুতরাং আল্লাহ যে ভাইকে যে ভাইয়ের অধীন করে দিয়েছেন সে তার (শ্রমিকের) ভাইকে যেন তাই খাওয়ায় যা সে নিজে আহার করে, আর তাই পরিধান করায় যা সে নিজে পরিধান করে’ (আবু দাউদ ২/৩৩৭)। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব ভাইয়ের সাথে সর্বদাই সদ্ভাব স্থাপন করবে’ (আল কুরআন; ৪৯:১০)। মালিক-শ্রমিক কর্মচারীদের এমন সব আচরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে যা দ্বারা সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। এমন ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক একটি সুস্থ ও সভ্য সমাজ ব্যবস্থার পূর্বশর্ত।
ইসলামের আলোকে শ্রমনীতি হলোÑ ক. মালিক-শ্রমিক পরস্পরকে ভাই ভাই মনে করবে। খ. মৌলিক মানবিক প্রয়োজনের েেত্র শ্রমিক ও মালিক উভয়ের মান সমান হবে। গ. কাজে নিযুক্তির আগে শ্রমিকদের সাথে যথারীতি চুক্তি হবে এবং তা যথাসময়ে পালিত হবে। ঘ. শ্রমিকের অসাধ্য কাজ তার ওপর চাপানো যাবে না। ঙ. শ্রমিকের স্বাস্থ্য, শক্তি ও সজীবতা বজায় রাখার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ব্যয়ের নিচে মজুরি নির্ধারণ হবে না। চ. উৎপন্ন দ্রব্যের অংশবিশেষ শ্রমিকদের দান করতে হবে। ছ. পেশা বা কাজ নির্বাচনের ও মজুরির পরিমাণ বা হার নির্ধারণ সম্পর্কে দর দস্তুর করার পূর্ণ স্বাধীনতা শ্রমিকের থাকবে। জ. অনিবার্য কারণ বা নিয়ন্ত্রণ ঘটনার বহির্ভূত ঘটনার পরিপ্রেেিত কাজে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটলে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন না চালানো। ঝ. মালিকপ দুর্ঘটনা ও য় এড়ানোর সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। ঞ. কোনো অবস্থাতেই শ্রমিকদের অসহায় করে ছেড়ে দেয়া যাবে না, অম ও বৃদ্ধ হয়ে পড়লে উপযুক্ত ভাতার ব্যবস্থা করা। ট. পেশা পরিবর্তনের অধিকার শ্রমিকের থাকবে। ঠ. পরিবার গঠনের অধিকার শ্রমিকের থাকবে। ড. স্বাধীনভাবে ধর্মীয় অনুশাসন পালনের অধিকার শ্রমিকের থাকবে। ঢ. স্থানান্তর/গমন/ছুটি নেয়ার অধিকার শ্রমিকের থাকবে। ন. স্বাস্থ্য সংরণ ও চিকিৎসার উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে সামাজিক শান্তি ও রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধি তখনি কেবল সম্ভব হবে যখন শ্রমিকের প্রতি ইসলামের উদার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবে রূপায়িত হবে। কারণ, ইসলামে শ্রম যদি হয় ব্যক্তির দায়িত্ব, তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিটি ব্যক্তির জন্য কর্মের সংস্থান করা। ব্যক্তির যদি দায়িত্ব হয় কাজে নিষ্ঠার পরিচয় দেয়া, তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পদ ও মালিকানায় সুষম বণ্টন করা। কাজ যদি হয় উৎপাদনের প্রধান স্তম্ভ তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটানো। শ্রমিক যদি হয় প্রকৃত সম্পদ, তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব খেটে খাওয়া লোকগুলোর ওপর চলমান জুলুম বন্ধ করা। তাদের অধিকার আদায় নিশ্চিত করা। শ্রমিক যদি হয় খেটে খাওয়া শ্রেণী, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইসলাম মানুষের কাজ করার অধিকারের সাথে সাথে শ্রমিকের মর্যাদাকেও স্বীকৃতি দেয়। ইসলাম মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের যে নীতিমালা দিয়েছে উভয়েই যদি তা অনুসরণ করে তাহলে পৃথিবীতে বঞ্চিতদের আর্তনাদ শোনা যাবে না, দেখা দেবে না শ্রমিক অসন্তোষও।
লেখক : ব্যাংকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫