ঢাকা, শুক্রবার,২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অবকাশ

চারাগল্প একজন মর্জিনার গল্প

মোনোয়ার হোসেন

২৯ এপ্রিল ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

খবরটা শুনলাম বিকেলে।
তৌফিক ফোন করে বলল, শুনেছিস?
কী?
আজ ঢাকায় খ্বু গণ্ডগোল হয়েছে।
কেন?
ন্যায্য বেতনের দাবিতে গার্মেন্টকর্মীরা রাস্তায় নামলে পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ আন্দোলনকারী মিছিলের ওপর রাবার বুলেট, গুলি ছোড়ে। এতে সাতজন গার্মেন্টকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। অনেক কর্মী আহত হয়েছেন।
আমার নাম পলাশ। আমি একজন রিপোর্টার। ঢাকায় একটি জনবহুল পত্রিকায় চাকরি করি। একটা বিশেষ রিপোর্ট সংগ্রহ করতে ঢাকার বাইরে এসেছি গত দুই দিন আগে।
আজ মে মাসের এক তারিখ। মহান মে দিবস।
শ্রমিক-কর্মচারীদের নায্য মজুরি আদায়ের দিবস।
ঢাকায় গণ্ডগোলের খবর শুনে বুকটা ধক করে উঠল। মর্জিনার কিছু হয়নি তো?
মর্জিনা?
হুম, মর্জিনা। ঢাকায় গার্মেন্টে চাকরি করে। আমার সাথে পরিচয় সপ্তাহখানেক আগে। মহান মে দিবসের জন্য একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়েছিলাম গার্মেন্টে। সেখানেই এক গার্মেন্টে পরিচয় তার সাথে। দারুণ প্রতিবাদী মেয়ে। গলায় যেন অগ্নি ঝরে।
যে হারে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করি, সে হারে মজুরি পাই না। সংসার চলে না। বড় বাবুরা আমাদের ঠকাচ্ছে। আসছে মে দিবসে এবার আমরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব। আমরা আমাদের নায্য মজুরির অধিকার আদায় করে ছাড়ব।
আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশ যদি মিছিলের ওপর লাঠিচার্জ করে, গুলি ছোড়ে, যদি মারা যান?
মরলে মরব। মরেই তো গেছি। এভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে একবারেই মরে যাওয়াটা অনেক ভালো নয় কি?
যে মেয়ের কণ্ঠ থেকে এ রকম প্রতিবাদের আগুন ঝরে, সেই মেয়ে তো মিছিলে সবার আগে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
তাই ভয় হলো, আমার মর্জিনাকে নিয়েই।
মেয়েটার কিছু হয়নি তো?
আমি যেহেতু ঢাকার বাইরে আছি, তাই কারা মারা গেল সঠিক পরিচয় জানতে পারছি না। একে ওকে ফোন করছি। জিজ্ঞাসা করছি। কেউ মৃতদের সঠিক পরিচয় দিতে পারছে না। কাজেই শেষ ভরসা হিসেবে টিভির সামনে বসলাম। একে একে চ্যানেল পরিবর্তন করছি। যদি কেউ মৃতদের পরিচয় জানাতে পারে। হঠাৎ একটা চ্যানেলে চোখ আটকে গেল।
তারা মৃতদের লাইভ দেখাচ্ছে। পরিচয় দিচ্ছে।
হঠাৎ একটা মুখ দেখে শরীর হিম হয়ে গেল।
মর্জিনা কি?
হুম মর্জিনা-ই তো।
রিপোর্টার বলছেন, মেয়েটি অল্প বয়সে মাকে হারা। সৎমার অত্যাচার দেখে বাবা তাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন। স্বামী ছিলেন রাজমিস্ত্রি। বড় দালানে কাজ করতে গিয়ে দালান থেকে পড়ে স্বামীও মারা গেল। অল্প বয়সে মা-বাবা আর স্বামীকে হারিয়ে পেটের তাগিদে ছুটে আসে ঢাকায়। চাকরি নেন গার্মেন্টে। কিন্তু গার্মেন্টেও তাকে দিতে পারেনি তার নায্য মজুরি। তাই ন্যায্য মজুরির দাবি আদায় করতে গিয়ে হাসিমুখে প্রাণ দিলো হতভাগ্য মর্জিনা।
খবরটা শুনে চোখের পাতা ভিজে এলো আমার।
বিড়বিড় করে বললাম, আমাদের মাফ করে দাও মর্জিনা। এই পৃথিবীতে আমরা তোমাকে কিছুই দিতে পারলাম না।
সেতাবগঞ্জ, দিনাজপুর

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫