ঢাকা, সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অবকাশ

সে দিন সকালে

জীবনের বাঁকে বাঁকে

এস আর শানু খান

০৬ মে ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

হঠাৎ আম্মুর ফোন। আম্মু যে ফোন দেবে এটা আমি আগে থেকেই জানতাম। ইদানীং সকালে ঘুম থেকে উঠে কেন জানি কিছুই গিলতে পারি না। একটা বদ অভ্যাস হয়ে উঠেছে আমার। আম্মুর ফোন দেখেই বুঝেছিলাম না খেয়ে বাজারে চলে আসার জন্য বকা দেবে। অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে ! ফোন রিসিভ করতেই আম্মু বললেন। আমি জানতে চাইলাম কোথায়? বাড়ির সামনে একটা বাস উল্টে গিয়ে পুকুরের ভেতর পড়েছে। দুনিয়ার মানুষ এখানে আর তুই কোথায়?
আমি তখন বাজারে একদম স্ট্যান্ডে। এর আগের গাড়িতে গিয়ে নেমেছি। আমি দৌড়ে স্ট্যান্ডে গিয়ে জানতে চাইলাম কোন গাড়িটা আসতেছে এখন? কাউন্টার থেকে জানালো জ্যোতি গাড়ি, ড্রাইভার চঞ্চল। আমি বললাম ঘটনা। মুহূর্তের মধ্যেই স্ট্যান্ডে চাঞ্চল্য শুরু হয়ে গেল। আমি এক ভাইয়ের বাইকে করে হাজির হলাম। ততক্ষণে মানুষে মানুষে ভরে গেল গ্রাম। মানুষের হই হুল্লোড় চেঁচামেচি ও দৌড়াদৌড়ির মধ্যেও কানে ভেসে আসছে ভুক্তভুগীদের আহাজারি। কান্না আর আল্লাহ আল্লাহ রব। গাড়িটি নড়াইল থেকে এসেছে। সকাল সাড়ে ৯টার গাড়ি। গাড়িভর্তি স্কুলের ছাত্রছাত্রী। গালর্স স্কুল, হাইস্কুল, কিন্ডারগার্টেন, কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মজীবীও রয়েছে গাড়িতে। বেশ কয়েকজন শিক্ষকও রয়েছেন।
গাড়ি একদম রাস্তার বাম পাশের ভরা পুকুরের ভেতর উল্টে পড়েছে। পানিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন আমার চাচাতো কয়েক ভাই ও গ্রামের বেশ কয়েকজন যুবক। সবাইকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এনায়েত ভাই। গাড়িটা উল্টে যেতে একটু সময় নিয়েছিল বলে যাত্রীরা কাচ ভেঙে বের হতে পারলেও কেউই নিশ্চিত হতে পারছিল না যে মানুষ কি এখনো গাড়িতে রয়েছে কি না।
অকান্ত পরিশ্রম করে পানিতে ডুবিয়ে চলছে মানুষ খোঁজার মিশন। কেউ বলছে জনতা ব্যাংকের ম্যানেজার ছিল গাড়িতে। তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ এসে বলছে হাঁড়িগড়ার এক জেলে ছিল মাছ নিয়ে পেছনের ছিটে বসা। তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরছে। চোখ যেন কপালে ওঠার মতো অবস্থা। হঠাৎ কেউ একজন বলল গাড়ি উল্টে দিয়ে দেখতে হবে তলে কেউ আছে কি না। দৌড়ে গেলাম বাড়ি। বাড়ি থেকে আমাদের বাইচের নৌকার কাছি নিয়ে গেলাম। এখন চার চাকা উপর দিকে থাকা একটা দোদুল্যমান ঝুঁকিপূর্ণ গাড়ির ভেতর গিয়ে কে বেঁধে দেবে এই কাছি। তোষামোদ শুরু হওয়ার টাইম দিলো না এনায়েত ভাই। সবার নিষেধ উপেক্ষা করে ভাঙা কাচের ভেতর দিয়ে গাড়ির ভেতর ঢুকে কাছি বেঁধে দিলো এনায়েত ভাই। তার পর উপস্থিত জনতা টেনে-হিঁচড়ে আর এক পল্টি দিলো গাড়ি। পুকুরভর্তি কচুরিপানা। ডুব দিয়ে পা দিয়ে খোঁজাখুঁজি চলল। বেশ কয়েকজনের পা কেটেও গেল। গাড়ির সব কাচ ভেঙে পানিতে।
এরই মধ্যে চার-পাঁচটি গ্রামের মানুষ এসে হাজির। মানুষ আর মানুষ। অঞ্চলের যেসব ছেলেমেয়ে গাড়িতে করে স্কুলে যায় সবার মা-বাবাসহ পুরো পরিবার এসে হাউ মাউ করে কান্নাকাটি শুরু করেছে। কেউ বলছে আমার মেয়ে ছিল এই গাড়িতে। কেউ বলছে তার ছেলে। কেউ বলছে তার ভাইপো। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অনেককেই। মানুষের মাঝে আতঙ্ক উত্তর উত্তর বাড়ছেই। অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন যদি কেউ থাকে তাহলে আর বেঁচে নেই। স্কুলে ফোন দেয়া হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে পরিবারের লোকদের সাথে কথা বলে দেয়া হচ্ছে। তবুও ভয় কাটছে না।
ভুক্তভোগী যাত্রীদের কাউকে সিঙিয়া বাজারে কাউকে গঙ্গারামপুর বাজারে। আর বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠানো হয়েছে নড়াইল সদরে। উদ্ধারকৃত অনেকই মারাত্মক ভয় পেয়েছে। কান্না থামছে না কোনোভাবেই। ওরা স্কুলে পড়ে। ছোট মানুষ। ওদের হাত-পা কাটা, রক্তে রঞ্জিত শরীর আর কাপড় দেখে বুকের ভেতর জ্বলছিল। সহ্য করতে পারছিল না অনেকেই।
দৌড়াদৌড়ি করে এসে হাজির হলো উত্তরপাড়ার দেবদাস কাকার বউ। উনি এসে জানাল চঞ্চল ড্রাইভারের মাথায় আঘাত লেগেছে, খুব রক্তবমি হচ্ছে। ও বলেছে ইঞ্জিন কভারের ওপর বসা ছিল মালাইওয়ালা।
এ কথা শুনে চেঁচামেচি শুরু হলো আবার। কই মালাইওয়ালাকে তো পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে সাইরেন বাজাতে বাজাতে নড়াইল থেকে ফায়ার সার্ভিসের লোক এসে গেছে। গ্যাট গ্যাট করে নেমে গেল। বাসকে আর এক পল্টি দিলো। কিন্তু মালাইওয়ালার কোনো হদিস মিলল না। শালিখা থানা থেকে পুলিশ এসে হাজির। ফোন দিয়েছে গাড়ির মালিক। সবাই ধরেই নিয়েছে মালাইওয়ালা চাচা মারা গেছে এবং কচুরির তলে কোথাও হয়তো গাড়ির কোনো ছিটের নিচে আটকে রয়েছে।
এমন সময় কেউ একজন বলল মালাইওয়ালা ওই যে ভ্যানে করে আসতেছে। উনি আগের স্টপে নেমে গিয়েছিল। মানুষ এক হাঁফ ছাড়ল। বড্ড ভালো মনের মানুষ মালাইওয়ালা চাচা।
পুলিশের সাথে সাথে এলো গাড়ির মালিকের এক আত্মীয়ও। আত্মীয়র কথাবার্তা ছিল মরুষত্বহীন। ভদ্রলোক নাকি রাজনীতি করেন। এসেই উল্টা পাল্টা কথা বলছেন। বলছেন গাড়ি ভাঙচুর করেছে কারা কারা। গাড়ি তো রাস্তার সামান্য খাদে পড়েছিল। ইচ্ছা করে পাল্টি দিয়েছে সাধারণ মানুষ। পুলিশকে বলছেন বেচারি। সাধারণ মানুষ চটে গেল। সে কী অবস্থা। ওই লোককে তো মারবেই। আহম্মক কোথাকার। মানুষের জীবন নিয়ে টানাটানি আর বেটা এসেছে চামচাগিরি করতে। অবশেষে পুলিশ অবস্থা সামাল দিলো। বিকেলে লোক এনে চেটিকল দিয়ে পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে গাড়ি উঠিয়ে দিলো। ট্রাকে করে টেনে নেয়া হলো শহরের দিকে। এরপর আমি গেলাম চঞ্চল ভাইয়ের কাছে। চঞ্চল ভাই একজন অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ড্রাইভার। শুধু তা-ই নয়, চঞ্চল ভাই অত্যন্ত নম্রভদ্র ও হাসিখুশির একটা মানুষ। এর আগে কোনো অ্যাক্সিডেন্টের রেকর্ড নেই। অনেকেই বলাবলি করছিল নেশা করে গাড়ি চালাচ্ছিল। কেউ বলছিল ফোনে কথা বলছিল। এভাবেই একটা দুর্ঘটনা ভেঙে দেয় হাজারো স্বপ্ন, বিপন্ন করে দেয় হাজার হাজার সম্ভাবনা।
শালিখা, মাগুরা

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫