ঢাকা, সোমবার,১৮ নভেম্বর ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

তিস্তা এবং কল্যাণ রুদ্র

কারার মাহমুদুল হাসান

০৭ মে ২০১৮,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বিগত প্রায় এক মাস (মার্চ-এপ্রিল ২০১৮) তিস্তা নদীর পানি বিষয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এক ধরনের ইতিবাচক ও ধারণানির্ভর খবর হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত ১১ মার্চ ২০১৮ নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সোলার সম্মেলনে যোগদানকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যু সমাধানের আশ্বাস দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ওই সম্মেলনের ফাঁকে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে উল্লিখিত সংক্ষিপ্ত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১১ মার্চ। এর প্রায় তিন বছর আগে (জুন ২০১৫) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তার সাথে একান্ত বৈঠক, ত্রিপক্ষীয় বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে তিস্তা প্রসঙ্গটি এসব বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় আসেনি। শেখ হাসিনার এ দিল্লি সফরে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষা, পরিবেশ, সীমান্ত ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৯টি চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং ছিটমহল হস্তান্তর সংক্রান্ত অনুস্বাক্ষর দলিল হস্তান্তর করা হয়। এ সফরকালে চুক্তি দূরে থাক, তিস্তা প্রসঙ্গে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে কোনো আলোচনাই হবে না বা করা যাবে না, সে বিষয়ে মমতা ব্যানার্জির একক ইচ্ছায় আগেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল।
উল্লেখ্য, এর প্রায় চার-পাঁচ বছর আগে ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হলেও তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতায় আর চুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয়, তিস্তা চুক্তির বিষয়েও যেকোনো ধরনের আলোচনা বন্ধ হয়ে যায় তখন। এরপর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে (১৯-০২-২০১৫) মমতা ব্যানার্জির ঢাকা সফরে তিস্তা আবারো হালকাভাবে আলোচনায় আসে। তিস্তা বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য মমতা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের তার ওপর আস্থা রাখতে বলেন। একইভাবে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ (জুন ২০১৫) সফরের সময়ও তিস্তা চুক্তি ছিল অন্যতম সর্বোচ্চ আগ্রহের বিষয়। অবশ্য সফরের আগেই প্রকাশ্যে ঘোষণা ছিল, তিস্তা চুক্তি এবার স্বাক্ষর হচ্ছে না; কিন্তু নরেন্দ্র মোদির ঢাকায় দেয়া দুই ভাষণেই এসেছে তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গ। মমতা ব্যানার্জির মাস কয়েক আগে ঢাকা সফরের মতোই মোদির এ সফরেও তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো সময়সীমা ঘোষিত হয়নি। কলকাতার কূটনৈতিক সূত্রের খবর, ২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জি বা পশ্চিমবঙ্গকে না জানিয়ে পানিবণ্টনের হিসাব চূড়ান্ত করা হয়েছিল অভিযোগ এনে শেষ মুহূর্তে চুক্তিটি স্বাক্ষরের বিরোধিতা করেছিলেন মমতা।
কে সেই ড. কল্যাণ রুদ্র? যাকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অনেক বছর ধরে অনেকবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একাধিক নদীর পানিসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা কাজে নিয়োজিত করেছেন, সেবা নিয়েছেন, ব্যবহার করেছেন। ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের ইনভেস্টিগেটর ড. কল্যাণ রুদ্র হলেন ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক। তাকে ভারত ও বাংলাদেশের গাঙ্গেয় অববাহিকার ‘অথরিটি’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ভারত ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন জার্নালে গঙ্গার ওপর অসংখ্য কারিগরি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। নদ-নদীর গতিবিষয়ক ইতিহাস ও তদসংক্রান্ত তার নিরলস চর্চা ও গবেষণা তাকে শিখিয়েছে কিভাবে বিজ্ঞান অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে মানুষের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জ্ঞানবুদ্ধিকে সমৃদ্ধ করতে সহায়ক হয়েছে।
এখন তিস্তার পানি ভাগাভাগি বিষয়ে ড. কল্যাণ রুদ্র বিভিন্ন সময় যে মতামত ব্যক্ত করেছেন, তার কিছু বিবরণ বা উদ্ধৃতি নিম্নে দেখা যেতে পারে। ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বরে প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের লক্ষ্যে চলতি মাসের শেষে প্রতিবেদন জমা দেবে কল্যাণ রুদ্র কমিশন। কল্যাণ রুদ্র বলেন, ‘তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের লক্ষ্যে সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি প্রস্তাব উপস্থাপনের জন্য আমাকে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাকে আরো কিছু গবেষণার কাজ করতে হবে। আশা করছি, চলতি ডিসেম্বর মাসের শেষে সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে পারব।’
তিস্তার পানিবণ্টনে বাংলাদেশ ও ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য হিস্যার বিষয়টি সুরাহার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি গত ১৫ নভেম্বর ২০১১ কল্যাণ রুদ্রের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন।
মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০১১ ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে তিস্তার পানি চুক্তি সই হয়নি। শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হয়, তিস্তার পানিপ্রবাহ কমেছে। তাই বাংলাদেশকে ২৫ ভাগের বেশি পানি দেয়া সম্ভব নয়। অথচ দিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, অভিন্ন নদীটির পানির একটি অংশ স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য রেখে বাকি অংশ প্রায় সমান দুইভাগে ভাগ হবে।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত (১৬-১২-২০১১) এক দৈনিক পত্রিকায় ‘বর্ষাকাল ছাড়া বাংলাদেশকে জল দেয়া সম্ভব নয়Ñ কল্যাণ রুদ্র’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গের অংশে তিস্তা প্রবাহের অবস্থা দেখে এসে নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র বলেছেন, ‘উত্তরবঙ্গের বিপুল পরিমাণ জলের চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশকে জল দিতে গেলে বর্ষাকাল ছাড়া জল দেয়া সম্ভব নয়। তবে এটা রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। এ বিষয়ে তারাই সময়মতো উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেবেন’ বলেও জানিয়ে দেন তিনি। এ দিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নির্দেশে সম্প্রতি তিস্তার প্রবাহের অবস্থা দেখতে জলপাইগুড়িসহ উত্তরের বিভিন্ন জেলা সফর করেন কল্যাণ রুদ্র। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সাথে একটি সমাধান সূত্র খোঁজার লক্ষ্যেই মমতা এ নির্দেশ দেন।
www.thedhakapost.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খবরটিতে (৭-১২-২০১১) বলা হয়, তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগিতে বাংলাদেশের সাথে চুক্তি না হওয়ার কোনো কারণ দেখছেন না বলে বার্তা ২৪ ডটনেটকে জানিয়েছেন ভারতের রুদ্র কমিশনের প্রধান ড. কল্যাণ রুদ্র। অন্য দিকে ডিসেম্বরের ২০১১-এর মধ্যে কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে বলে বুধবার যে খবর দিয়েছে একটি ভারতীয় দৈনিক, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে টেলিফোনে ওই খবরের প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় হিসাব নয়, তিস্তা নদীর জলের প্রবাহ কিংবা এর সাথে বাংলাদেশের চুক্তি হলে লাভ-ক্ষতি কী হবে, সেটা বিবেচনা করা হচ্ছে একজন বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিতে। তাই চুক্তি না হওয়ার কোনো কারণ দেখছি না।’
ড. রুদ্র ভারতের অন্যতম প্রবীণ নদী বিশেষজ্ঞ। গত ১৫ নভেম্বর ২০১১ দেশটির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার তাকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির ভালো-মন্দের বিশ্লেষণ করতে গঠিত এক সদস্যের কমিশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করেন। কমিশনটি শুধু তাকে নিয়ে গঠিত হলেও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সেচ ও জল সম্পদ দফতরের প্রকৌশলীরা সহযোগিতা করছেন ড. রুদ্রকে। অবশ্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার দেয়া হয়েছে রুদ্রকেই। ড. রুদ্র জানান, প্রতিবেশী দু’টি দেশের সাথে সুসম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক নদী আইন দুটোই বিবেচনা করে এগোচ্ছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘তিস্তা চুক্তি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছেন। তিস্তা নদীর জল নিয়ে যাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ জীবন-জীবিকা নির্ভর করছে, সেটা এপার (পশ্চিমবঙ্গ) কিংবা ওপার (বাংলাদেশ) কারো স্বার্থেই যেন আঘাত না লাগে, এভাবেই একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে।’
কল্যাণ রুদ্র বলেন, ‘আমি গত সপ্তাহেও সরেজমিন উত্তরবঙ্গে, যে অঞ্চলে তিস্তা নদী প্রবাহিত, সেখানে গিয়েছিলাম। আবার এই সপ্তাহে আরেক দফায় যাবো। এটা খুবই সংবেদনশীল কাজ। দুই দেশের সম্পর্ক নির্ভর করছে এখানে। ফলে পুরো বিষয়টি নানা দিক থেকে ভেবেচিন্তে কাজ করতে হচ্ছে। ভারতীয় নাগরিক হিসেবে নয়, বরং পৃথিবীর একজন বাসিন্দা এবং বিজ্ঞানীর দৃষ্টি দিয়ে এগোচ্ছি।’
এর আগে তিস্তা চুক্তিতে মমতা আপত্তি জানানোর পর ড. রুদ্র তাকে যুক্তিসঙ্গত বলেছিলেন। গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০১১ ভারতের স্টার আনন্দের বিতনু চট্টোপাধ্যায়কে ড. রুদ্র বলেছিলেন, ‘জল কম থাকার কারণে যেখানে প্রকল্প এলাকার মাত্র ১৪ শতাংশ এলাকায় জল পৌঁছানো যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত জল দিতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত হতো উত্তরবঙ্গ। ফলে মুখ্যমন্ত্রী এ ব্যাপারে যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, তা রাজ্যের স্বার্থে যুক্তিসঙ্গত।’ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষুদ্র সেচ ও জলসম্পদ মন্ত্রী ড. সৌমেন মহাপাত্রকে তিস্তা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বার্তা ২৪ ডটনেটকে নিশ্চিত করে বলেন, ‘জটিলতা কেটে যাবেই। বাংলাদেশের সাথে তিস্তা চুক্তি সম্পাদনও হবে। সেই দিকেই এগোচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘কল্যাণ রুদ্র অত্যন্ত অভিজ্ঞ নদীবিজ্ঞানী। তার অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লাগানো হবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সঠিক একজন বিশেষজ্ঞ দিয়ে তিস্তা চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই করেছেন।’
তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে মমতার ক্রমাগত অনিচ্ছা প্রকাশ পেলেও কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সাথে এই চুক্তি সই করতে আপাতদৃষ্টিতে আগ্রহী। এ দিকে কল্যাণ রুদ্রও ২০১১ সালের পর থেকে গণমাধ্যমের সামনে আসছেন না। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি ‘একটি কথাও উচ্চারণ করবেন না’। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, তিস্তা নিয়ে রুদ্রের পর্যবেক্ষণে মুখ্যমন্ত্রী খুশি হননি। কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের কাছ থেকে তিস্তার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য না পাওয়ায় একটি ‘পূর্ণ প্রতিবেদন’ দাখিল করতে না পারলেও পশ্চিমবঙ্গ সেচ বিভাগসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিজের পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরেছেন ড. রুদ্র। তার উদ্ধৃতি দিয়ে খবরে বলা হচ্ছে, তিস্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে হবে।
রুদ্র কমিটি মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছে, গজলডোবায় তিস্তার ওপর বাঁধ থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত ৭২ কিলোমিটারের মধ্যে নদীতীরে আছে জলপাইগুড়ি ও হলদিবাড়ির মতো শহর। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বাস সেখানে। বাংলাদেশকে পানি না দিয়ে গজলডোবা ব্যারাজ থেকেই যদি সেচের জন্য পানি সরিয়ে ফেলা হয়, তাহলে এ রাজ্যের ১৫ লাখ বাসিন্দার জীবনেও প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। তবে মনে হচ্ছে, রুদ্রের প্রস্তাব মমতার ভালো লাগেনি। গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, তিনি রুদ্রকে এ বিষয়ে চুপ থাকতে বলেছেন। এ দিকে সূত্রগুলো বলছে, পূর্ণ প্রতিবেদন না পাওয়ায় মমতা অখুশি। পানি কমিশনের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য চেয়েও তা না পাওয়ায় রুদ্রের পক্ষে সম্পূর্ণ প্রতিবেদন দেয়া সম্ভব হয়নি; কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে কোনো তথ্যও চায়নি। তবে অন্য পানি বিশেষজ্ঞদের মতো রুদ্রও তিস্তায় স্বাভাবিক পানিপ্রবাহের পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করায় তা মমতার অবস্থানের সাথে মেলেনি।
চুক্তির খসড়া তৈরির কাজে থাকা ভারত সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও কল্যাণ রুদ্রের মতোই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার পক্ষে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মমতা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া তার রাজ্যের জন্য একটা আর্থিক প্যাকেজ আদায় করতে চান কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে। সেজন্যই তিস্তা চুক্তিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
এ দিকে আনন্দবাজার পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় জল কমিশনের কাছ থেকে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান না পাওয়ায় রাজ্য সরকারকে দেয়া রিপোর্টে তিস্তার জলবণ্টন নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সুপারিশই করতে পারেনি কল্যাণ রুদ্র কমিটি। বদলে মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করে অসম্পূর্ণ রিপোর্ট ও নিজের কিছু মতামত জানিয়েছেন নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র। সব শুনে মমতা ব্যানার্জি তাকে বলেছেন, আপনাকে আর কিছু করতে হবে না।’ সরকারি সূত্রের খবর, এ ঘটনার পর মাস চারেক কেটে গেলেও রাজ্যের তরফে কল্যাণের সাথে আর কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। তিস্তা নিয়ে তিনি আদৌ কোনো চূড়ান্ত রিপোর্ট দেবেন কি না, তা-ও জানা নেই রাজ্য সরকারের।
কল্যাণ রুদ্র কমিটির অসম্পূর্ণ রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে কতটা জল দেয়া যায় তা নির্ধারণ করার আগে নদীর প্রবাহমানতা, তিস্তার জলের সঠিক পরিমাণ এবং এ দেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনÑ বিষয়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরি; কিন্তু কেন্দ্রীয় জল কমিশন থেকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়া হয়নি। ফলে কমিটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। সুতরাং রুদ্র কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট যেমন সরকারের হাতে জমা পড়েনি, তেমনি রাজ্য সরকারও বাংলাদেশের সাথে তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি; এমনটিই মহাকরণ সূত্রে বলা হচ্ছে।
তিস্তার কতটা জল বাংলাদেশকে দেয়া যাবে বা আদৌ দেয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই এক সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গড়েছিল রাজ্য সরকার। মমতা কেন্দ্রকে জানিয়েছিলেন, তিস্তার জলের পরিমাণ এবং তা বণ্টনের পর রাজ্যে সেচের ওপর প্রভাব খতিয়ে দেখবে বিশেষজ্ঞ কমিটি। এ কমিটির রিপোর্ট হাতে এলে তবেই তিস্তা চুক্তি নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানাবে রাজ্যে। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি কমিটির মত সরকারের পছন্দ না হওয়াতেই তিস্তার জলসংক্রান্ত বিষয়ে কল্যাণ রুদ্রকে মাথা ঘামাতে বারণ করা হলো? কল্যাণকে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি অবশ্য বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি একটি কথাও বলব না’।

মমতাকে কী জানিয়েছিলেন তিনি?
প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সফরসঙ্গী (২০১১) হিসেবে বাংলাদেশে না এসে তিনি ২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সঙ্গীসাথীদের ক’জনকে সাথে নিয়ে ঢাকায় আসেন এবং সোনারগাঁও হোটেলে ‘জমজমাট’ আড্ডায় যোগ দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে গণভবনে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ পর্ব শেষে (সেই সাথে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা জানিয়ে) ২১ ফেব্রুয়ারি তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আশাবাদের কথা শুনিয়ে ঢাকা ছেড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। চুক্তিটি সইয়ের জন্য বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ দুই পক্ষের মানুষের স্বার্থ সুরক্ষার স্বার্থে কারিগরি সমস্যা মেটানোর কথা বলেছেন। কারিগরি সমস্যার সমাধান করা এবং দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষার উল্লেখ করায় চুক্তিটি সইয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার ইঙ্গিত ছিল দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তিস্তা চুক্তি সইয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিলেও কোনো সময়সীমার উল্লেখ করেননি। পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ সুরক্ষা করে যে তিনি চুক্তিটি সই করতে চান, সেটি স্পষ্ট করেই বলেছেন। এতে স্পষ্ট যে, পানির এখানকার প্রবাহ হিসাব-নিকাশ করেই তিনি চুক্তিটি করবেন।
স্থলসীমান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে মনমোহন সরকার যে ভুলটি করেছিল, সেটা করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি গোড়া থেকেই মমতা ব্যানার্জির সাথে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ রেখে চলেছেন। রাজ্যের দাবি-দাওয়ার বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে সেগুলো মেনেও নিয়েছে কেন্দ্র। রাজনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, স্থলসীমান্ত চুক্তির সাফল্যের ব্যাকরণকে কাজে লাগিয়ে এবার তিস্তার জন্যও প্রতি পদে মমতার সাথে যোগাযোগ রেখেই এগোবে মোদি সরকার। তবে ভারতের নতুন পররাষ্ট্র সচিবের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরে যে ছয়টি চুক্তি ও সমাঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে, এসব মধ্যমপর্যায়ের যেকোনো কর্মকর্তা এসব চুক্তি স্বাক্ষরে কোনো অসুবিধা যে হতো না তা বলাই বাহুল্য।
স্বাধীন বাংলাদেশের পাশে অবস্থিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লোকসংখ্যা বাংলাদেশের অর্ধেক বা তারও কম। এখানে একটি বিষয় অবশ্য লক্ষণীয় যে নদনদীর পানির বিষয়ে যেমন কেন্দ্রীয়ভাবে, সেই সাথে পাশাপাশি রাজ্যপর্যায়ে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও উৎকর্ষতার সাথে সব সময় সেসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও গুণীজনদের সাথে হরহামেশা যোগাযোগ, আলোচনা পরামর্শ কার্যক্রম এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ ও সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। মমতা ব্যানার্জি একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা পশ্চিম রাজ্যের সরকারপ্রধান হলেও তার রাজ্যের নদনদী, পানি, পানিপ্রবাহ, কৃষি সেচ ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে প্রথমত এবং প্রধানত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ভূগোল বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. কল্যাণ রুদ্রের মতো বিজ্ঞানীর ধ্যানধারণা এবং তার পরামর্শ গ্রহণ করেন।
অন্য দিকে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পানি বিশেষজ্ঞ প্রয়াত বি এম আব্বাস, আমজাদ আলী খান পর্যায়ের বিজ্ঞানীদের পরলোকগমনের পর এখনো কয়েক ডজন খ্যাতিমান পানি বিশেষজ্ঞ ও ব্যক্তিত্ব বলতে গেলে কর্তৃপক্ষের নজরের আড়ালে কালাতিপাত করছেন।
উন্নয়নের মহাসড়কে বিচরণের পাশাপাশি সরকার জেআরসির সাবেক সদস্য মির সাজ্জাদ হোসেন, মো: মোফাজ্জল হোসেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রখ্যাত পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত, খলিলুর রহমানসহ উপযুক্ত আরো ৫ থেকে ১০ জন বিশেষজ্ঞ সদস্যের সমন্বয়ে নদীবিষয়ক একটি স্থায়ী কমিটি গঠনে জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। পাশাপাশি মানববন্ধন সংশ্লিষ্ট কর্মগুলো সজতনে পরিহার করতে পারেন।
লেখক : সাবেক সচিব
ই-মেইল : [email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫