ঢাকা, সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অপরাধ

যৌন হয়রানি প্রতিরোধ হাইকোর্টের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৭ মে ২০১৮,সোমবার, ১৭:৩০ | আপডেট: ০৭ মে ২০১৮,সোমবার, ১৭:৫০


প্রিন্ট
যৌন হয়রানি প্রতিরোধ হাইকোর্টের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না

যৌন হয়রানি প্রতিরোধ হাইকোর্টের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না

৮৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালের সুপ্রিম কোর্টের দিক নির্দেশনা ব্যাপারে একেবারেই অন্ধকারে। অনেকে বিষয়টি শুনেনইনি, জানেনও না। এতে করে যৌন হয়রানি হলে তার প্রতিকার পান না ভুক্তভোগিরা। যৌন হয়রানি বন্ধ বা প্রতিকারে করণীয় কী, তা নিয়ে সচেতনতাও কম। মূলত নির্দেশনার বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অসচেতনতা ও না মানার ঝোঁকের কারণে এই অবস্থা।

একশনএইড বাংলাদেশের করা ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ : সুপ্রিমকোর্টের ২০০৯ সালের নির্দেশনার প্রয়োগ ও কার্যকারিতা’ নামের একটি গবেষণায় এমন চিত্র ফুটে উঠেছে। রাজধানীর একটি কনভেনশন সেন্টারে গবেষণাটি প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি।

এতে কর্মক্ষেত্রে তারা গবেষণা চালায় বলে জানান হয়। এক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালের সুপ্রিম কোর্টের দিক নির্দেশনা ব্যাপাবে কর্মক্ষেত্রে অবস্থানকারীরাও জানেন না এ ব্যাপারে। তাদের ক্ষেত্রে এ হার ৬৪.৫ শতাংশ। এখানেও মূলত নির্দেশনার বিষয়ে কর্মক্ষেত্র কর্তৃপক্ষের অসচেতনতা কারণে এমন পরিস্থিতি।

এ বিষয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন বলেন, “হাইকোর্টের নির্দেশনা পুরোপুরি মানা গেলে কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্যাতন নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে। মানুষ কিংবা পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজের ব্যাপকতা হয়ত কম। তবে আমরা কাজ করছি। নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

কী ছিল সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনায়?

কর্মক্ষেত্রে বা উন্মুক্ত স্থানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনাকে একটি যুগান্তকারী নির্দেশ হিসেবে ধরা হয়। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব- যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সচেতনতা বৃদ্ধি, কমিটি গঠন ও আইনের প্রয়োগের বিষয়টি শিক্ষার্থীদের অবহিতকরণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে বিদ্যমান আইনে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচার নিশ্চিত করার কথাও বলা আছে হাইকোর্টের নির্দেশনাটিতে। যেটি কর্মক্ষেত্রের যেকোন প্রতিষ্ঠানের জন্যও প্রযোজ্য। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যত দিন না একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ আইন গ্রহণ করা হয় তত দিন পর্যন্ত গণপরিসরে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ের সমস্ত কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

কিন্তু একশনএইড বাংলাদেশের গবেষণাটিতে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করছেন তারা হাইকোর্টের নির্দেশনা সম্পর্কে খুব কমই জানেন। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান, সংবাদ মাধ্যমের ২০ জন ব্যক্তির উপরও গবেষণাটি করা হয়। এদের মধ্যে ৬৪.৫ শতাংশ সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ১৪ শতাংশ নির্দেশনাটি সম্পর্কে জানলেও তাদের এ বিষয়ে কোন পরিস্কার ধারণা নেই। গবেষণায় সুনির্দিস্ট প্রশ্নের আলোকে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। যেখানকার ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সংক্রান্ত কোন কমিটির কথা জানেন না। ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থীরা সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা সম্পর্কে জানেন না। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাইকোর্টের নির্দেশিত বিষয়গুলো সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না।

এমনসব বিষয় নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের অধিকাংশ মানুষ হাইকোর্টের নিদের্শনা মানেন না এবং জানেন না। সচেতনতার মাত্রাও নগণ্য। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এই নিদের্শনা সম্পর্কে জানেন না ও ভাবেন না।

প্রতিবেদন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা বলেন, “আমাদের দেশের বাস্তবতা হলো একজন হয়রানি বা নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না। তিনি মনে করেন হয়রানি বা নির্যাতনকারীকে আইনের আওতায় এনে বড় অংকের জরিমানা করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে

অপরদিকে নারীনেত্রী খুশি কবির বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনাটা মানা খুবই দরকার। এটি মানা হলে আমাদের দেশে নির্যাতনের মাত্রা কমে যেত।

গবেষণা নিয়ে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেন, নারীরা ঘরে বাইরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সমস্যা সমাধানে হাইকোটের নির্দেশনার বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাড়াতে হবে।

এদিকে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে একই অনুষ্ঠানে নাসরীন স্মৃতিপদক ২০১৮ প্রদান করে একশনএইড বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রয়াত নারীনেত্রী নাসরীন পারভীন হকের উদ্যম, আদর্শ ও বিশ্বাসকে ছড়িয়ে দিতে একশনএইড বাংলাদেশ ২০০৭ সাল থেকে ‘নাসরীন স্মৃতি পদক’ প্রদান করে আসছে। চারটি বিভাগে এবার চারজন ‘নাসরীন স্মৃতি পদক ২০১৮’ পেয়েছেন । যৌন হয়রানী ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপন বিভাগে এবার পদক পেয়েছেন খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার তালতলা গ্রামের ভারতী বিশ্বাস। ভিন্ন রূপে পুরুষ (গৃহস্থালী সেবামূলক কাজে নিয়মিত অংশগ্রহণ) বিভাগে পদক পেয়েছেন জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার গাবের গ্রামের বালক চন্দ্র বিশ্বাস। গৃহস্থালী সেবামূলক কাজে নিয়মিত অংশগ্রহণ এবং প্রথাগত জেন্ডার ভূমিকা পরিবর্তনে অবদানের-এর জন্য তাকে এবার এই সম্মাননা দেয়া হয়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সোচ্চার বিভাগে পদক পেয়েছেন কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার মহিষকুন্ডি গ্রামের টিপু সুলতান ।

এছাড়া জুরিবোর্ড সর্বসম্মতিক্রমে নারী ক্ষমতায়নে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশেষ বিভাগে পদক পেয়েছেন নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার চকসুবল গ্রামের তাসমিনা খাতুন। পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেকেই পদক, সম্মাননা পত্র, আর্থিক সম্মাননা পান।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫