ঢাকা, বুধবার,২৩ অক্টোবর ২০১৯

আমার ঢাকা

ঢাকার জাদুঘর

মারিয়া নূর

০৮ মে ২০১৮,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ঢাকা থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে গর্বের অনেক ঐতিহ্য। এসব হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পরে ঠাঁই পাচ্ছে জাদুঘরে। রাজধানীতে জাতীয় জাদুঘরসহ মোট ১৫টি জাদুঘর রয়েছে। ঢাকার ৪০০ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার উপযুক্ত জায়গা জাদুঘর। লিখেছেন মারিয়া নূর
জাতীয় জাদুঘর
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ঢাকার ৪০০ বছরের ইতিহাসের প্রাক-মোগল আমল, মোঘল আমল, সুলতানি আমল, ব্রিটিশ আমল, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং আবহমান বাংলার অনেক ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন ঠাঁই পেয়েছে। এই জাদুঘরে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন গ্যালারি। এ জাদুঘরে প্রাকৃতিক ইতিহাস, জাতিসত্তা ও শিল্প, ইতিহাস ও ধ্রুপদী এবং সমকালীন শিল্পকর্ম ও বিশ্বসভ্যতা এ চারটি বিভাগে বিভক্ত সংগ্রহশালার গ্যালারি রয়েছে। ২০ হাজার বর্গমিটারের এই ভবনটির ৪৬টি গ্যালারিতে রয়েছে প্রায় ৮৩ হাজারের বেশি নিদর্শন। কেবল বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ জাদুঘর। রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত এই জাদুঘরে বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ ফি ৭৫ টাকা। আর দেশী দর্শনার্থীদের জন্য এটি মাত্র ১০ টাকা। ৩ থেকে ১২ বছর বয়সীদের জন্য টিকেটের মূল্য ৫ টাকা। পয়লা বৈশাখ, ২৬ শে মার্চ ও একুশে ফেব্রুয়ারীতে শিশু ও ছাত্র-ছাত্রীরা বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ পায় এ জাদুঘরে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
বাংলাদেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধকে নুতন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে নিয়ে আট জন ট্রাস্টি ১৯৯৬ সালে এ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর চালু করেন। জাদুঘর ভবনটি তিন তলা। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয়তলায় প্রদর্শনী চলে। স্মারক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন প্রদর্শনীর জন্য নিচতলায় দুইটি গ্যালারি ও চারটি কক্ষ এবং দ্বিতীয়তলায় চারটি কক্ষ রয়েছে। এই জাদুঘরের নিদর্শন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে দেখানোর সুযোগ করে দিতে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বড় আকারের বাসে ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে।
এই ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর বাসটির মাধ্যমে দেশের সব জেলায় প্রদর্শনীর আয়োজন করে চলেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সেগুনবাগিচায় অবস্থিত এ জাদুঘরে প্রবেশের ফি পাঁচ টাকা। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা বিনামূল্যে জাদুঘরে প্রবেশ করতে পারবে।
বঙ্গবন্ধু জাদুঘর
এই ভূখণ্ডের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত যে বাড়িতে বসে তিনি স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন সে বাড়িটিই মর্মান্তিক ঘটনার পর এখন জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। এ জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সবার জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে পারার সুযোগ রয়েছে। ১৫ আগস্টের সেই রাতে ঘাতকদের তাণ্ডবের আলামতও সযতেœ সংরক্ষিত আছে সেখানে। বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত পাইপ ও চশমাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তো রয়েছেই। এখানকার প্রত্যেক ঘরই একটি করে প্রদর্শনী কক্ষ। ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করেন। বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করে এবং নাম দেয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর। বর্তমানে যা বঙ্গবন্ধু জাদুঘর নামে সর্বাধিক পরিচিত। ধানমন্ডিতে অবস্থিত এই জাদুঘরের টিকিটের মূল্য পাঁচ টাকা। তবে তিন বছরের কম বয়সীদের কোনো টিকিট লাগে না।
সোহরাওয়ার্দী জাদুঘর
১৯৭১ এ পাকসেনাদের আত্মসমর্পণের স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করার লক্ষ্যে পাতাল জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এই জাদুঘর ভবন প্রাঙ্গণের শুরুতেই আছে প্রবেশপথ ও শিখা চিরন্তন। এরপর সিঁড়ি দিয়ে নিচে মূল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই ভবনের বাঁয়ে দেয়ালের গায়ের পোড়া মাটির ম্যুরালে অঙ্কন করা আছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস। পাতাল জাদুঘরে প্রবেশের প্রথমই হাতের ডানে রয়েছে অডিও ভিজুয়াল রুম, তার পরের প্রথমে বড় খোলা গ্যালারিতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমির ছবি ও লিখিত দলিল এবং এখানেই হাতের বামে রয়েছে চমৎকার ওয়াটার ফল।
তারপরের গ্যালারিতে যাওয়ার পথের দুই পাশের দেয়ালে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া নির্যাতনের নর্মম চিত্র। পরের খোলা গ্যালারিতে রয়েছে ড. হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে পাঠানো স্যামুয়েল এম হসকিনসনের গোপন দলিল। প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই পাতাল জাদুঘর। শুক্রবার ও শনিবার এবং সব সরকারি ছুটির দিনে জাদুঘরটি বন্ধ থাকে। শাহবাগের শিশুপার্কের পেছনের রাস্তা থেকেই এই জাদুঘর কমপ্লেক্সের মূল প্রাঙ্গণ শুরু। বর্তমানে জাদুঘরে বিনা টিকিটে প্রবেশের ব্যবস্থা আছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর
১৯৬৫ সালের ২৬ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর। চার তলাবিশিষ্ট ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলাতে গ্যালারি রয়েছে। গ্যালারিগুলো হলো সাইন্স গ্যালারি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজি গ্যালাার, বাইয়োলজি গ্যালারি, ইনফরমেশন টেকনোলজি গ্যালারি, ফান সায়েন্স গ্যালারি এবং ইয়ং সায়েন্টিস্ট প্রোজেক্ট গ্যালারি। মূল ভবন প্রাঙ্গণের সামনে একটি ডাইনোসরের মূর্তি এবং একটি ছোট যুদ্ধবিমান রয়েছে। আকাশ মেঘমুক্ত থাকা সাপেক্ষে প্রতি শনিবার ও রবিবার সন্ধ্যার পরে টেলিস্কোপের সাহায্যে আকাশ পর্যবেক্ষণের আয়োজন করে থাকে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। এই জাদুঘরের রেজিস্ট্রিকৃত ১১৮টি বিজ্ঞান ক্লাব রয়েছে। আগারগাঁওয়ে অবস্থিত এ জাদুঘরে প্রবেশ ফি জনপ্রতি পাঁচ টাকা। ৫ বছরের নিচের বাচ্চাদের টিকিট লাগে না।
সামরিক জাদুঘর
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাফল্য এবং মুক্তিযুদ্ধ সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড এবং বিশ্বে বিভিন্ন মিশনের সফলতা ও অস্ত্রের প্রদর্শনী হয়েছে এখানে। জাদুঘরের মূল সীমানা পেরোলেই বিস্তৃত মাঠ পেরিয়ে দ্বিতল ভবন অবস্থিত। মাঠের সীমানা দিয়ে পুরাতন ট্যাংক, বিমান, ছোট জাহাজ সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সব কর্মকাণ্ডের আলোকচিত্র, ব্যবহৃত যুদ্ধাস্ত্র এবং ছোট-বড় গাড়ি প্রদর্শিত হচ্ছে। দ্বিতল ভবনের পুরোটাজুড়েই রয়েছে প্রদর্শনী। বিজয় সরণিতে অবস্থিত এ জাদুঘরে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট লাগে না। সপ্তাহের পাঁচ দিন শনিবার, রোববার, সোমবার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার জাদুঘর খোলা থাকে।
বিমান জাদুঘর
১৯৭১-এর উত্তাল দিনগুলোতে স্বল্পসম্পদ আর জনবল নিয়ে ডিমাপুরে সম্পূর্ণ বৈরী পরিবেশে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। অকুতোভয় কয়েকজন বৈমানিক আর নির্ভীক কিছু বিমানসেনার অদম্য সাহস মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনকে করেছিল প্রকম্পিত ও বিজয়কে করেছিল ত্বরান্বিত।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এ গৌরবময় ঐতিহ্যের ইতিহাস, সাফল্য ও উন্নয়নের ক্রমবিকাশকে সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে দুলে ধরতেই ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বেগম রোকেয়া সরণিসংলগ্ন তেজগাঁও বিমানবন্দর রানওয়ের পশ্চিম পাশে অবস্থিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর। জাদুঘরটি সোম থেকে বৃহস্পতিবার বেলা ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্র ও শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ এবং প্রবেশমূল্য ২০ টাকা।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫