ঢাকা, বুধবার,১১ ডিসেম্বর ২০১৯

আমার ঢাকা

হাজার কোটি টাকা ব্যয়েও ঢাকার জলাবদ্ধতা কমেনি

মাহমুদুল হাসান

০৮ মে ২০১৮,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

স্বস্তির বৃষ্টি নগরবাসীর কাছে এখন অনেকটাই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। একটু বৃষ্টি হলেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতায় সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নগরীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলির কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি জমে যায়। যদিও বৃষ্টির পানি দ্রুত সরাতে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রকল্প। এরই মধ্যে খরচ হয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা।
গত বর্ষায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, ডিএসসিসির মেয়র আর সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানেরা এক বছর সময় চেয়ে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্ষা মওসুম শুরু হওয়ার আগেই কয়েক দিনের সামান্য বৃষ্টির পর রাজধানীর চিহ্নিত এলাকাগুলোয় জলাবদ্ধতা খুব একটা কমতে দেখা যায়নি। ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মিলে ড্রেন, নর্দমা নির্মাণ ও খাল পরিষ্কার করার কাজে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে, সেই পরিমাণ সুফল মেলেনি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। ১০ মিনিটে ১২০ মিটার ড্রেন পরিষ্কার করার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে জেড অ্যান্ড সাকার মেশিন কিনলেও তাতে তেমন একটা লাভ হয়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘সিটি করপোরেশন মূলত নতুন লাইন তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। যে ড্রেনগুলো আছে সেগুলোর কোথায় কোথায় ব্লক হয়েছে তা পরিষ্কার করার ব্যাপারে তারা মনোযোগী নয়। ফলে নতুন করে ব্যাপক অর্থ খরচ করা হলেও পুরো নেটওয়ার্কিং না হওয়ায় সুফল মিলছে না।’
বর্ষা মওসুমে জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করতে কাজ করছে ডিএসসিসি। এরই মধ্যে তৈরি করা খসড়া তালিকায় উঠে এসেছে ডিএসসিসির ৪৮ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকার নাম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার জলাবদ্ধতাপ্রবণ এসব এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য গত দুই বছরে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রায় হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। এ বছর সড়ক, ফুটপাথ ও ড্রেন নির্মাণে ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরেছে ডিএসসিসি। এরই মধ্যে প্রায় সব টাকা খরচ করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া ডিএনসিসি তাদের বার্ষিক বাজেটে এ খাতে প্রায় ২৭৮ কোটি বরাদ্দ রেখেছে। এরই মধ্যে প্রায় সব টাকা খরচ করেছে এ সংস্থা।
গত অর্থবছরে ডিএনসিসি নর্দমা ও ড্রেন নির্মাণে আরো ১৭৫ কোটি টাকা খরচ করে বলে জানা যায়। এ ছাড়া ডিএসসিসি তাদের একটি মেগা প্রকল্পের এক হাজার ২০২ কোটি টাকা থেকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করে কয়েক কোটি টাকা ড্রেন ও নর্দমা নির্মাণে ব্যয় করেছে। ঢাকা ওয়াসাও তাদের নিজস্ব ড্রেন পরিষ্কারের পেছনে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করেছে বলে জানা যায়। এর পরও বর্ষা মওসুমে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ওয়াসা প্রতি বছর গড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা খাল ও ড্রেন পরিষ্কারের পেছনে ব্যয় করে থাকে। গত দুই বছরে এ সংস্থা ১০ কোটি টাকার মতো ব্যয় করেছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বিপুল অর্থ দরকার। সেটি মন্ত্রণালয়ে চাওয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি। ফলে ওয়াসা কাজ করতে পারেনি। আর দুই সিটি করপোরেশন থেকে ড্রেন ও নর্দমা নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও এর সুফল মিলছে না। কারণ সংস্থা দু’টির পরিকল্পনা আর ডিজাইনে ত্রুটি রয়েছে। ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, শান্তিনগর এলাকার জলাবদ্ধতা কমাতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। কিন্তু সেখানেও এখন বৃষ্টি হলে পানি জমে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা শান্তিনগর এলাকায় পানি নিষ্কাশনে সব কাজ শেষ করেছি। এখন ওয়াসার টিটিপাড়া পাম্পের সক্ষমতা না বাড়ালে পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না। তাই ওয়াসাকে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দাফতরিকভাবে পত্র দিয়েছি। আর ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকার জলাবদ্ধতারোধে হাতিরঝিল প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কাজ করছে।
বৃষ্টির ফলে মিরপুর এলাকার লোকজন সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়ে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মেট্রোরেলের কাজ চলায় সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি আর নির্মাণসামগ্রী রাখায় চলাচলের উপযোগিতা হারিয়ে ফেলে সড়ক। বৃষ্টির পানি আর কাদার কারণে রাস্তায় গাড়ির চাকা ঘোরানোই ছিল চ্যালেঞ্জ। বৃষ্টি হলেই মিরপুর ১০ নম্বর থেকে থেকে ১৩ নম্বর সেকশন পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে, ১৪ নম্বর সেকশন, শেওড়াপাড়া, ইব্রাহিমপুর ও কচুক্ষেত এলাকার বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়।
ফার্মগেট থেকে কাওরানবাজার পর্যন্ত সড়কও অল্প বৃষ্টিতে পানির নিচে ডুবে যায়। পশ্চিম রাজাবাজার ও ইন্দিরা রোডের বিভিন্ন সড়কে দেখা যায় নিষ্কাশন ড্রেন থেকে উপচে পড়া ময়লা পানিতে রাস্তা সয়লাব।
১৯৯৬ সালের পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন আইন অনুযায়ী, ঢাকা শহরের পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। ফলে নিয়মিত নর্দমাগুলো সচল রাখা ও পরিষ্কার করার দায়িত্ব ওয়াসার। কিন্তু প্রতি বছর বর্ষা এলেই বরাদ্দ নেয়ার কথা মনে পড়ে ওয়াসার। এবারো মিলেছে ৪০ কোটি টাকা। ওয়াসার দাবি, এ টাকায় খাল খনন, নর্দমা ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করা হবে। এসব করেই ঢাকা মহানগরের জলাবদ্ধতা দূর হয়ে যাবে।
বর্ষার আগে কেন বরাদ্দ সম্পর্কে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বলেন, যখন বর্ষা, তখনই তো নর্দমা পরিষ্কার করতে হবে। আগে করলে তো ড্রেন ভরে যাবে। তাই আমরা বর্ষার আগেই এ বরাদ্দ চেয়ে থাকি। এবার অবশ্য অতিরিক্ত বরাদ্দ পেয়েছি। এবার জলাবদ্ধতা তেমন হবে না, আমরা যথেষ্ট প্রস্তুত রয়েছি।
গত কয়েক বছর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কয়েক শ’ কিলোমিটার ড্রেনেজ লাইনের সংযোগ ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ লাইনে দেয়া হয়েছে। ফলে প্রচুর বালু ও মাটি ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ লাইনে প্রবেশ করেছে। এ ছাড়া কার্পেটিং ও পুনঃকার্পেটিং করার কারণে ম্যানহোলগুলো ঢেকে গেছে এবং ক্যাচপিটগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বর্ষায় এসব ক্যাচপিট নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করতে চায় ওয়াসা। এ ছাড়া বেশির ভাগ খালের পাশে খননযন্ত্র পৌঁছানোর রাস্তা না থাকায় খাল খননের জন্য বুলডোজার প্রয়োজন। ময়লা অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত ডাম্প ট্রাক না থাকায় ডাম্প ট্রাক সংগ্রহ জরুরি। ওয়াসার মতে, এ ছাড়া ১৬টি পাম্প সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বড় ধরনের মেরামত এ রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা প্রয়োজন। এসব করতেই তাদের এত টাকার প্রয়োজন।
ওয়াসা ঢাকা মহানগরের পানি নিষ্কাশনের জন্য ৭৪ কিলোমিটার খাল রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত কঠিন বর্জ্য, নির্মাণসামগ্রী ও নির্মাণ বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলায় খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। ভাসমান কঠিন বর্জ্য অপসারণের পর দু-এক দিনের মধ্যে আগের অবস্থায় ফিরে আসে। আগে খালগুলো নগরের ভেতরে বিভিন্ন জলাশয়ের মধ্য দিয়ে নদীতে পড়ত এবং জলাশয়গুলো জলাধার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ওয়াসা বক্স কালভার্টগুলো সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ম্যানহোল নির্মাণ করবে। প্রতি বছর এ মঞ্জুরি সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা পেলেও এবার ৪০ কোটি টাকা এ কাজে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যদিও প্রতি বছর বর্ষার আগে ওয়াসা নর্দমা পরিষ্কারের কাজটি শুরু করে জানুয়ারি থেকে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয় সরকার বিভাগ একটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যেখানে ১৭টি কাজ দ্রুত করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে ‘সচিবালয় এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ’। পরিকল্পনা অনুযায়ী এবার সব সময় সক্রিয় থাকবে ‘কুইক রেসপন্স’ টিম। দুই সিটি করপোরেশনের ১০টি ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হয়েছে। এই দল কোথাও জলাবদ্ধতা হলে দ্রুত তা কর্তৃপক্ষের নজরে আনবে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে জলাবদ্ধতা অপসারণের কাজ সমন্বয় করবে। ঢাকা মহানগরে বেশি জলাবদ্ধতা হয় এমন সাতটি এলাকা বিশেষ নজরদারির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে সচিবালয়, মিরপুরের রূপনগর, সাংবাদিক কলোনি, রোকেয়া সরণি, ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, শান্তিনগর-মালিবাগ, মতিঝিল এবং নিকুঞ্জ ১ ও কুড়িল উড়াল সড়ক। এসব এলাকায় বিদ্যমান পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতি বছর মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় বর্ষা। সিটি করপোরেশনগুলো জুন থেকে বর্ষা মওসুম শুরুর হিসাব করে। তবে গত বছর এপ্রিলের শেষ থেকেই আগাম বর্ষা শুরু হয়। ছয় মাসের বেশি স্থায়ী বর্ষায় প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। এবারো সেই সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে।
ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রামচন্দ্রপুর খাল, রূপনগর খাল, বাউনিয়া খাল, দেব-ধোলাইখাল, সেগুনবাগিচা খাল ও মাণ্ডা খাল পুনঃখনন, ২৪৯ কিলোমিটার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের নালা পরিষ্কার, নালা মেরামত, সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্টের ময়লা অপসারণ, চারটি স্থায়ী পাম্প স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণ ও ১৫টি অস্থায়ী পাম্প স্টেশন স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এগুলো বর্ষার আগে শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫