ঢাকা, বুধবার,১৩ নভেম্বর ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

কিম জং উন : স্বৈরাচারী না ত্রাণকর্তা?

কিলিস বুগরা কানাত

০৮ মে ২০১৮,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বাইরের বিশ্বের সাথে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক খুবই কঠিন। উত্তর কোরীয়দের জীবন, সেখানকার সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কে তথ্যের অভাব, নির্মাতাদের কাছে এ বিষয়টিকে এ রাষ্ট্র নিয়ে তথ্যচিত্র ও কাল্পনিক গল্পের এক আদর্শ বিষয়ে পরিণত করেছে। যেখানে নির্মাতারা সেখানকার ‘বাস্তব জীবন’ অনুসন্ধান করতে চান কিছু তথ্যচিত্র দেখে। এসব তথ্যচিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘চিল্ড্রেন অব দ্য সিক্রেট স্টেট’, ‘কিমজঙ্গিলিয়া’, “সং’স ফ্রম দ্য নর্থ”, ‘দ্য প্রোপাগান্ডা গেম’ এবং ‘ক্যাম্প ফোরটিন : টোটাল কন্ট্রোল জোন’ সিনেমা। এখানে কিমকে তুলে ধরা হয়েছে ভয়ঙ্কর, উদ্ভট ও মজার এক কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। ‘টিম আমেরিকা : ওয়ার্ল্ড পুলিশ’-এ কিম জং উনকে তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত স্বৈরশাসক হিসেবে। এখানকার একটি সাক্ষাৎকার উত্তর কোরিয়াকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং পরে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে সাইবার হামলাও চালানো হয়। এ দেশ সম্পর্কে বহু তথ্য অজানা। দুর্ভিক্ষ, বাবার মৃত্যুর পর কিম জং উনের ক্ষমতা দখল আর পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর খবর ছাড়া দেশটির অভ্যন্তরের আর কোনো খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাওয়া যায় না।
কঠিন হলেও কোরিয়ান উপদ্বীপের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি অবাক করার মতো নয়। কয়েক মাস আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের উপায় খোঁজার কারণে জনসম্মুখে সেই সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসনের সমালোচনা করেছেন। একই সাথে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন। এর বিপরীতে উত্তর কোরিয়ার শত্রুদের ধ্বংস করার ক্রমাগত হুমকি দিয়েছেন কিম জং উন। পারমাণবিক অস্ত্র আর ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে ভয় দেখিয়েছেন প্রতিবেশী দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানকে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ম্যাটিসের মতো ব্যক্তি ইঙ্গিত দিয়েছেন এ সঙ্কটের সামরিক সমাধান সম্ভব নয়, অনেকে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলাফল নিয়ে। ‘সব উপায়ই আলোচনার টেবিলে আছে’ এবং আঙুলের নিচে ‘পারমাণবিক বোমার বোতাম’ প্রস্তুত, এসব কথা বলে আবার পরস্পরের সাথে যোগাযোগও রক্ষা করে গেছেন কিম ও ট্রাম্প।
যেখানে টিলারসন প্রথমেই ‘ব্যাক চ্যানেল’ বা পর্দার পেছনে অন্য কোনো উপায়ে সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং যেখানে সমঝোতার মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানে আগ্রহী ব্যক্তি হিসেবে দক্ষিণ কোরীয় প্রেসিডেন্ট মুন অধিক পরিচিতি পেয়েছেন, সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও কিমের বক্তৃতা উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার সঙ্কট দ্রুত সমাধানকে আরো কঠিন করে তুলেছে। ট্রাম্প ও কিমের বৈঠকের বিষয়ে হোয়াইট হাউজে মুনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ঘোষণা ছিল এ প্রক্রিয়ার প্রথম পদক্ষেপ। যা হোক, এমনকি গেল সপ্তাহে এক র্যালিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে একমত হতে ব্যর্থ হলে তিনি সমঝোতার প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে যাবেন। একই সময়ে দেশ পারমাণবিক ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে উল্লেখ করে কিমও পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
গেল কয়েক দিনে বেসামরিক অঞ্চলে কিম ও মুনের মধ্যকার বৈঠক এ উপদ্বীপের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কিছুটা অবাক করেছে। এ বৈঠকে কিম ও মুন করমর্দন, কোলাকুলি, একসাথে বৃক্ষ রোপণ এবং ব্যক্তিগতভাবে আলাপ-অলোচনার মতো সব ধরনের রাজনৈতিক শিষ্টতাই প্রদর্শন করেছেন। কিম সেখানে ঘোষণা দেন যে, তারা পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে দেবেন এবং পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে আর মুনকে আতঙ্কিত করবেন না। দুই জনই ঘোষণা করেন, এ উপদ্বীপে সঙ্ঘাত বন্ধ করার একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তারা আগ্রহী। এ বৈঠকের ব্যাপারে অবশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাবধানী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
কোরীয় উপদ্বীপের বিরোধপূর্ণ বিতর্কের গতিধারা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এরই মধ্যে বহু ধরনের বিশেষণ হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ, মুন প্রশাসনের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকি সব মিলিয়ে এই দ্বন্দ্ব নিরসনের তাগিদ হিসেবে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং বর্তমান সময়ের মতো পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা পালন করেছে। যাই হোক, দূর থেকে বোঝা মুশকিল যে, সমঝোতার শর্তগুলো ঠিক কী হবে। পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, উভয় পক্ষই বেশ চনমনে অবস্থানে আছে এবং দ্বন্দ্ব নিরসনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এ সমঝোতাপ্রক্রিয়ার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে এখনো কোনো সময়সীমা বা রোডম্যাপ তৈরি হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক প্রণোদনা যদিও এ ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে, তবে এরপরও উত্তর কোরিয়ার অন্যান্য কিছু চাহিদা থাকতেও পারে। নিজের ক্ষমতার সুরক্ষা কিমের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এ প্রক্রিয়ার কোনো একটি পদক্ষেপও যদি তার ক্ষমতায় থাকার বিষয়ে হুমকি সৃষ্টি করে তাহলে পুরো সমেঝোতাই ভেস্তে যাবে।
অবশ্যই অন্য কুশীলবদেরও এ সমঝোতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র গেম চেঞ্জার হিসেবে থাকবে। সমঝোতার ক্ষেত্রে তাই এ উপদ্বীপে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবস্থানকে অনেক জটিল ইস্যু হিসেবেই ধরা হবে। পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই কঠোর দৃষ্টি রাখবে, যা সামনের দিনগুলোতে ইরানের সাথে নতুন চুক্তি প্রস্তাব থেকে বের হয়ে যাওয়ার একটি মডেল হতে পারে। একই সময়ে যদিও চীনকে মনে হচ্ছে এ সমঝোতা প্রক্রিয়া থেকে অনেকটাই বাইরে, তবে ভূ-রাজনৈতিক নৈকট্য ও উত্তর কোরিয়ার সাথে দেশটির উঞ্চ সম্পর্কের কারণে এ আলোচনায় বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া অনেক গুরুত্ব বহন করে এবং ফলাফলকেও প্রভাবিত করবে।
সমঝোতাকালীন সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে কোরিয়ান উপদ্বীপের রাজনীতি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থাই শুধু বদলাবে না, এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিও পাল্টে যাবে। এ অঞ্চলে যেকোনো সমঝোতার বিষয়ে প্রধান কুশীলবেরা অবশ্যই কড়া নজর রাখবে। আর কে জানে পশ্চিমা দেশগুলোর গণমাধ্যমগুলো হয়তো উত্তর কোরিয়ার সেই কৌশলী স্বৈরশাসককে এখন সংস্কারক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা হিসেবেই তুলে ধরবে।
লেখক : কিলিস বুগরা কানাত, ওয়াশিংটন ডিসির ফাউন্ডেশন ফর পলিটিক্যাল, ইকোনমিক অ্যান্ড সোস্যাল রিসার্চ বা ‘সেটা ফাউন্ডেশ’-এর গবেষণা পরিচালক এবং পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক। ফরেন পলিসি, ইনসাইড টার্কি, দ্য ডিলোম্যাট, মিডল ইস্ট পলিসি, জার্নাল অব মুসলিম মাইনরিটিসহ বিভিন্ন গবেষণা পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখেন। ডেইলি সাবাহ’র কলাম লেখক। ডেইলি সাবাহ থেকে ভাষান্তর করেছেন
মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫