ঢাকা, মঙ্গলবার,১৯ নভেম্বর ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ পরিচালনায় পরিবর্তনটি কি প্রত্যাশিত?

সুশাসন

ইকতেদার আহমেদ

০৮ মে ২০১৮,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির রাষ্ট্রপ্রধান। রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেন। রাষ্ট্রপতির এ অবস্থান রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা উভয় ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত না হলেও তা কোনোভাবে রাষ্ট্রের অপর সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির মর্যাদার হানি ঘটায় না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মানক্রমে রাষ্ট্রপতির অবস্থান ১ নম্বর ক্রমিকে। রাষ্ট্রপতির পরবর্তী অবস্থানটি প্রধানমন্ত্রীর এবং এর পরের দু’টি অবস্থানে রয়েছেন যথাক্রমে স্পিকার ও প্রধান বিচারপতি।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক পদধারীদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত। সাংবিধানিক পদধারী হিসেবে শপথগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন না। রাষ্ট্রপতির শপথ কোন সাংবিধানিক পদধারী দিয়ে পরিচালিত হবে, তা সংবিধানে নির্ধারিত করে দেয়া আছে। বাংলাদেশের সংবিধানে শপথ পরিচালনায় পদধারী নির্ধারণে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলেও আমাদের পাশের রাষ্ট্র ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রে কখনো এরূপ পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করা যায়নি। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধান কার্যকর হওয়া-পরবর্তী রাষ্ট্রপতির শপথ দেশ দু’টির প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।
আমাদের সংবিধান প্রণয়নের সময়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থার বিধান ছিল এবং রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনার দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত ছিল। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটানো হলে শপথ পাঠ পরিচালনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে স্পিকারকে দায়িত্ব দেয়া হয়।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী প্রণয়ন-পূর্ববর্তী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন। চতুর্থ সংশোধনী প্রণয়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি বিষয়ে বিশেষ বিধান প্রবর্তন করে বলা হয়Ñ এ আইন প্রবর্তনের অব্যবহিত আগে যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তিনি রাষ্ট্রপতি পদে থাকবেন না এবং রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হবেন ও রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণ করবেন এবং ওই প্রবর্তন থেকে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থাকবেন যেন তিনি এ আইনের মাধ্যমে সংশোধিত সংবিধানের অধীন রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীটি ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে সংসদে উত্থাপন-পরবর্তী ১১ মিনিট আলোচনান্তে গৃহীত হয়। চতুর্থ সংশোধনীটি সংসদ কর্তৃক গৃহীত হওয়ার সময় রাষ্ট্রপতি পদে মোহাম্মদ উল্লাহ অধিষ্ঠিত ছিলেন। সংসদে কোনো আইন প্রণীত হলে তাতে রাষ্ট্রপতির সম্মতি নেয়ার বিধান থাকলেও চতুর্থ সংশোধনীর ক্ষেত্রে দেখা গেল বিলটিতে রাষ্ট্রপতির সম্মতি ছাড়াই তা সংসদে গৃহীত হওয়ার পরক্ষণে সংসদ ভবনে তৎকালীন স্পিকার আবদুল মালেক উকিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়ে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও আবাসস্থল বঙ্গভবন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল-পরবর্তী যারা রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, একমাত্র চতুর্থ সংশোধনী-পরবর্তী রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ অনুষ্ঠান ছাড়া অপর সব রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
সামরিক ফরমান বলে প্রণীত দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ, ১৯৭৮-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকারের পরিবর্তে পুনঃপ্রধান বিচারপতির মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার বিধান প্রবর্তন করা হয়। এ সংশোধনী সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে অনুমোদন লাভ করে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে তার পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। রাষ্ট্রপতি যে দিন শপথ গ্রহণ করেন, সে দিনই তিনি তার কার্যভার গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ছাড়া অপর কোনো রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছর ব্যাপ্তিকালের একটি মেয়াদ পূর্ণ করা-পরবর্তী দ্বিতীয় পাঁচ বছর ব্যাপ্তিকালের মেয়াদের জন্য শপথ গ্রহণ করেননি। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের প্রথম শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার শওকত আলী কর্তৃক ২২ এপ্রিল ২০১৩ সালে পরিচালিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ লাভ-পূর্ববর্তী আবদুল হামিদ স্পিকার পদে কর্মরত ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী এবং আবদুল হামিদ-পূর্ববর্তী এ সময়কালের মধ্যে যারা রাষ্ট্রপতি পদে শপথ গ্রহণ করেছিলেন, তাদের সবার শপথ পাঠ অনুষ্ঠান প্রধান বিচারপতি দিয়ে পরিচালিত হয়েছিল। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পুনঃপ্রধান বিচারপতির পরিবর্তে স্পিকারকে দেয়া হয়, যা অদ্যাবধি অব্যাহত আছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর-পরবর্তী এবং ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ সাল-পূর্ববর্তী এ সময়ের মধ্যে যারা রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তাদের সবার শপথ পাঠ প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল।
পৃথিবীর অপর সব গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রপতির শপথ প্রধান বিচারপতি দিয়ে পরিচালিত হয়। আমাদের মূল সংবিধান, যেটি ’৭২-এর সংবিধান নামে অভিহিত; সেটিতেও অপরাপর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মতো রাষ্ট্রপতির শপথ বিষয়ে অনুরূপ বিধান ছিল। স্বভাবতই প্রশ্নের উদয় হয়, কী কারণে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে স্পিকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়? প্রণিধানযোগ্য, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়া হলে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি তার শপথ পাঠ পরিচালনায় অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা হয়। চতুর্থ সংশোধনীটি কোনো ধরনের বিতর্ক ছাড়াই সংসদে গৃহীত হয়, যদিও সংসদের ছয়জন সদস্য এটিকে অগণতান্ত্রিক অভিহিত করে সে সময় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। চতুর্থ সংশোধনী প্রণয়ন-পরবর্তী প্রণয়ন প্রক্রিয়াটির সাথে সম্পৃক্ত নীতিনির্ধারকদের ধারণা ছিল, সংশোধনীটি গণতন্ত্রের রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ অনুষ্ঠান পরিচালনায় অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে পারেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি যেহেতু দলীয় অনুগত ব্যক্তি ছিলেন না, সে কারণে তৎকালীন নীতিনির্ধারকেরা তার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছিলেন না। আর এ কথা অনস্বীকার্য, প্রধান বিচারপতি শপথ পাঠ বিষয়ে বেঁকে বসলে তা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিত। যে আশঙ্কার কারণে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী প্রণয়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ পরিচালনার দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে স্পিকারকে দেয়া হয়, অনুরূপ আশঙ্কার উপস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কেন এ দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে আবার স্পিকারকে দেয়া হলো; এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অভিমত রয়েছে।
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ক্ষমতাসীনদের অধীন অনুষ্ঠিত হলে কখনো ক্ষমতাসীনদের পরাভূত হওয়ার নজির নেই। সংসদ নির্বাচন বিষয়ে সংবিধানে বর্তমানে যে বিধান রয়েছে, তাতে সংসদ বহাল রেখে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা আছে। এ ব্যবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও এর ফলাফল কী হবে, তা এ দেশের সচেতন মানুষ পূর্বাভিজ্ঞতার আলোকে আগাম অনুধাবন করতে সক্ষম।
বাংলাদেশের বড় দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে নির্বাচন বিষয়ে মূল যে বিরোধ তা হলো, একটি সরকারের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী কোন ধরনের সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। উভয় দল ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় নিজ দলের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষপাতী হলেও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না থাকাকালীন দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনাগ্রহী। এ বিরোধের কারণেই একদা এ দেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান প্রবর্তিত হয়েছিল; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তা প্রথম দু’টি নির্বাচন অনুষ্ঠান-পরবর্তী সঙ্কীর্ণ মনোবৃত্তির কারণে ফলপ্রসূ হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে জনমতের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কিছু মহল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মহল অংশগ্রহণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে অনড় থাকলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে অন্যথা করার সুযোগ সীমিত। কিন্তু এর পরও কোনো ক্ষমতাসীন দল চায় না জনমত তাদের পক্ষে থাকুক বা না থাকুক, নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটুক। অতীতে আমাদের দেশে কোনো স্পিকার দলীয় আবরণ থেকে অবমুক্ত হয়ে নিজেকে নিরপেক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় সফলতা দেখাতে পারেননি। আর এ উপলব্ধি থেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে যেন কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা না হয়, তা বিবেচনায় নিয়েই যে সংশোধনীর মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে স্পিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার বিধান পূর্বাভিজ্ঞতার আলোকে পুনঃপ্রবর্তন, এমন ধারণা অমূলক নয়। এ বাস্তবতায় পরিবর্তনটি প্রত্যাশিত ছিল না। হ
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: [email protected]

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫