ঢাকা, শনিবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মতামত

ষড়যন্ত্র এবার লালকেল্লা নিয়ে

মাসুম মুরাদাবাদী

০৮ মে ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৮:২০


প্রিন্ট
ষড়যন্ত্র এবার লালকেল্লা নিয়ে

ষড়যন্ত্র এবার লালকেল্লা নিয়ে

মুসলিম যুবকেরা আশির দশকে ‘মসজিদ বাঁচাও কমিটি’র ব্যানারে দিল্লির ঐতিহাসিক মসজিদগুলোতে নামাজের অনুমতি আদায়ের জন্য জোরদার আন্দোলন করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের অধীনে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক ভবন ও কেল্লাগুলোতে অবস্থিত বিরান পড়ে থাকা মসজিদগুলোকে সেজদার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা। এ আন্দোলন এতটাই অগ্রসর হয়েছিল যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। মিসেস গান্ধী এ বলে ওই মসজিদগুলোতে নামাজের অনুমতি প্রদানে অস্বীকার করেন, এর ফলে ঐতিহাসিক ভবনগুলোর কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আলাপ-আলোচনা চলতে থাকল এবং ধীরে ধীরে এ আন্দোলনও থেমে গেল।

এখন যখন কেন্দ্রীয় সরকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো গ্রহণযোগ্য অর্থের বিনিময়ে করপোরেট কোম্পানিগুলোর কাছে হস্তান্তরের নীতি গ্রহণ করেছে এবং এর অধীনে দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লাকেও পাঁচ বছরের জন্য ২৫ কোটি রুপির বিনিময়ে লিজ দিয়েছে, তখন এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, এ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত লালকেল্লার ঐতিহাসিক মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্যকে কিভাবে অক্ষুন্ন রাখবে? এমনটি করায় কি ওই স্থাপনাগুলোর কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? লালকেল্লাকে ২৫ কোটি রুপির বিনিময়ে লিজ বিরোধিতা শুধু রাজনৈতিক মহলই নয়, বরং ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকেও হচ্ছে। ওই চুক্তিকে বাতিল করার দাবি বেশ জোরালো হচ্ছে, যা সরকার লালকেল্লার জন্য ডালমিয়া গ্র“পের সাথে করেছে।

এখানে মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের বড় বুলি আওড়ানো সরকারের এ যোগ্যতাও নেই যে, তারা রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। লালকেল্লাকে এক করপোরেট কোম্পানির কাছে লিজ দিয়ে সরকার কি নিজেদের অযোগ্যতা ও অক্ষমতাকে মেনে নেয়ার ঘোষণা করছে না? এর কী গ্যারান্টি রয়েছে যে, করপোরেট সেক্টরের এ কোম্পানিগুলো, যাদের অন্যতম উদ্দেশ্য প্রতিটি কর্ম থেকে অর্থ কামাই করা, তারা লালকেল্লা ও অপর ঐতিহাসিক স্থাপনার লিজ নিয়ে সেগুলোর ঐতিহাসিক মর্যাদা ও কাঠামো থেকে ফায়দা উঠাবে না? এ কারণেই ইন্ডিয়ান হিস্টরি কংগ্রেস লালকেল্লার দেখাশোনার দায়িত্ব ডালমিয়া গ্র“পকে দেয়াতে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে এ চুক্তি এখনই বাতিলের দাবি করেছে। ইন্ডিয়ান হিস্টরি কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘ডালমিয়া শিল্প গ্র“পের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সুতরাং এ বিষয়ের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে যে, তারা আবার পর্যটকদের সর্বাত্মকভাবে নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করার নামে লালকেল্লার ঐতিহাসিক মর্যাদা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বাস্তবতাকে ভেঙেচুরে প্রকাশ না করে এবং তার ভুল ব্যাখ্যা দেয়া শুরু না করে।’ ইন্ডিয়ান হিস্টরি কংগ্রেস লালকেল্লার সেকুলার আকৃতিকে আঘাত হানার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে।

আমরা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, গত বছর পর্যটন দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সরকারের একটি স্কিমের ঘোষণা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, যে কেউ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে সেবা করতে চায়, সে এগিয়ে আসতে পারে। এ স্কিমের অধীনে সরকার এখন পর্যন্ত পুরো ভারতে এমন ৯৩টি ঐতিহাসিক স্থাপনার লিজ দেয়ার ঘোষণা করেছে, যা পরিদর্শনের জন্য টিকিট ক্রয় করতে হয়। যে স্থাপনাগুলো এ পর্যন্ত করপোরেট কোম্পানিগুলোকে দেয়া হয়েছে তার মধ্যে দিল্লির পুরাতন কেল্লা, জন্তরমন্তর, কুতুবমিনার, সফদর জঙ্গ মাকবারা, আগ্রাসেন কি বাওলিও রয়েছে। ওই স্থাপনাগুলোর সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে লালকেল্লা। আরেক চুক্তির মাধ্যমে দিল্লির লালকেল্লা ২৫ কোটি রুপির বিনিময়ে ডালমিয়া গ্র“পের কাছে আগামী পাঁচ বছরের জন্য লিজ দেয়া হয়েছে।

ডালমিয়া গ্র“প পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর পর্যটকদের কাছ থেকে ফি আদায় করাও শুরু করে দেবে। মিডিয়ার রিপোর্ট মতে, ডালমিয়া কোম্পানি ৩০ দিনের ভেতর কেল্লাতে কাজ শুরু করে দেবে, যার পর পাঁচ বছরের জন্য লালকেল্লার দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে তাদেরই অর্পণ করা হবে। ডালমিয়া গ্র“পের বক্তব্য, লালকেল্লার রক্ষণাবেক্ষণের লিজ পাওয়ার কারণে ব্র্যান্ডের কাছে তার শাখা বানানোর ভালো সুযোগ রয়েছে। কোম্পানি লালকেল্লাকে ইউরোপীয় কেল্লার মতো নবসংস্করণের কথাও বলেছে।

সপ্তদশ শতাব্দীতে মোগল শাসক শাহজাহানের হাতে নির্মিত এ মহান স্থাপনার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হচ্ছে এর নিজস্ব মান-মর্যাদা। আর এ কারণেই প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লার অলিন্দ থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে থাকেন। এ কেল্লাতে দিওয়ানে আম ও দিওয়ানে খাস ছাড়াও মোগল যুগের দুর্লভ বস্তুগুলোর এক জাঁকজমক জাদুঘরও রয়েছে। আর এখানে সুদর্শন মোতি মসজিদও রয়েছে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালে স্বাধীনতার প্রথম লড়াইয়ের সূচনা এ লালকেল্লা থেকেই বাহাদুর শাহ জাফরের নেতৃত্বে হয়েছিল। এত সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এ স্থাপনাকে মোদি সরকারের পক্ষ থেকে এক করপোরেট কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ায় নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এক দিকে যখন বিরোধী দলগুলো সরকারের তীব্র সমালোচেনায় মুখর, ঠিক তখন সোশ্যাল মিডিয়াতেও সরকারের এমন সিদ্ধান্তে বেশ সমালোচনা হচ্ছে।

কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছে, ‘শেষ পর্যন্ত সরকার রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলোকে পুঁজিবাদীদের হাতে কিভাবে তুলে দিতে পারে?’ আরজেডি বলেছে, ‘মোদি সরকারের এ কাজকে লালকেল্লার ব্যক্তিগতকরণ বলা যায়, লিজ দেয়া যায় অথবা একে বিক্রয়করণ বলা যায়। এখন প্রধানমন্ত্রীর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণও হবে বেসরকারি কোম্পানির মালিকানাধীন মঞ্চে।’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বক্তব্য, ‘মোদি সরকার আমাদের ঐতিহাসিক লালকেল্লার দেখাশোনা কেন করতে পারছে না? লালকেল্লা আমাদের জাতীয় সম্পদ। একে কেন ভাড়া দেয়া হলো? এটা আমাদের ইতিহাসের বেদনাদায়ক ও কালো দিবস।’ ডালমিয়া গ্র“পের সিইও মহেন্দ্র সিন্ধির বক্তব্য, ‘লালকেল্লা প্রথমে আমরা পাঁচ বছরের জন্য পেয়েছি। চুক্তিতে পরবর্তীতে সময় বৃদ্ধিও হতে পারে।’ তিনি বলেন, প্রতিটি পর্যটক আমাদের জন্য একজন গ্রাহক হবেন। ইউরোপে কিছু কেল্লা লালকেল্লার তুলনায় খুবই ছোট; কিন্তু সেগুলোকে উত্তম পদ্ধতিতে উন্নত করা হয়েছে।

আমরাও লালকেল্লাকে অনুরূপ উন্নত করব। ডালমিয়া গ্র“পের সিইওর এ বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, সেখানে আগমনকারী পর্যটকগণকে তারা গ্রাহক মনে করে তার পকেট খালি করার কাজ করবে। করপোরেট কোম্পানিগুলো কখনো কোনো চুক্তি লোকসানের জন্য করে না। ডালমিয়া গ্র“পও লালকেল্লাকে পাঁচ বছরের জন্য লিজ নিয়ে এর থেকে কয়েক গুণ অর্থ উপার্জন করবে। বিস্ময়কর কথা হচ্ছে, ভারত সরকার লালকেল্লার আয় বার্ষিক পাঁচ কোটি রুপি নির্ধারণ করেছে। অথচ বর্তমানে সরকারের তার চেয়েও বেশি আয় হচ্ছে এবং সরকার নিজেই এর উত্তম দেখাশোনা করতে পারে। অনুধাবন করা হচ্ছে, এক বেসরকারি কোম্পানিকে ফায়দা পৌঁছানো ও সরকারি কোষাগারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কী গ্যারান্টি আছে, লালকেল্লা বেসরকারি কোম্পানির হাতে অর্পণ করার পর তার মূল মর্যাদা ও আকৃতি বহাল থাকবে? কোম্পানি তার সংস্কারের নামে তার ঐতিহাসিক মর্যাদার ক্ষতিসাধন করতে পারে এবং তার মৌলিক অবদানকে পরিবর্তন করতে পারে। যেমনটা ইন্ডিয়ান হিস্টরি কংগ্রেস আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

ভারতের বিখ্যাত ইতিহাসবিদেরা সরকারের এ পদক্ষেপের জোরালো বিরোধিতা করেছেন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর ইরফান হাবীবের বক্তব্য, সরকারের এক করপোরেট গ্র“পের কাছে লালকেল্লাকে অর্পণ করা কখনোই উচিত নয়। কেননা তারা প্রাচীন নিদর্শন বিষয়ে অভিজ্ঞও নয় এবং তারা ইতিহাসবিদও নয়। আবার তারা মোগল যুগের নির্মাণপদ্ধতি সম্পর্কেও অবহিত নয়। প্রতœতাত্ত্বিক অধিদফতরের সাবেক জয়েন্ট ডাইরেক্টর আরসি আগারওয়ালও সরকারের এ পদক্ষেপকে লালকেল্লার স্বার্থ পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। তার বক্তব্য, ডালমিয়া গ্র“পের এ বিষয়ে দক্ষতা নেই। তারা এ কাজের জন্য অন্য কাউকে ইজারা দেবে এবং এ পদক্ষেপ এ ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষেত্রে লাভজনক হবে না। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রফেসর শিরিন মুসাভীও অনুরূপ অভিমত প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্য, সরকারের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর নবসংস্করণ করা উচিত নয়। কেননা এটা আমাদের পরিচিতি। আর মানুষ এগুলোকে এ অবস্থাতেই দেখতে চায়। তিনি এ প্রসঙ্গে হুমায়ুনের কবরের সংস্কারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তার রঙ, তৈলাক্ততা ও নবসংস্করণ মোগল আমলের মূল কবরগুলোর মতো নয়। এ ধরনের হস্তক্ষেপে ঐতিহাসিক নিদর্শনকে দেখতে একবিংশ শতাব্দীর স্থাপনা মনে হবে। 

লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক উর্দু টাইমস ৬ মে, ২০১৮ থেকে
ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫