ঢাকা, শুক্রবার,২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

সুরুজদের হাতে বন্দী গণতন্ত্র

সহজ কথা

আলফাজ আনাম

০৯ মে ২০১৮,বুধবার, ০০:০০


প্রিন্ট

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের জয়ের সম্ভাবনা যতই কমে আসছিল, নির্বাচন নিয়ে সংশয় ততই বাড়ছিল। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে এক রিট আবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে। নির্বাচনের মাত্র ৯ দিন আগে নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করা হলে তিন মাসের জন্য নির্বাচন স্থগিতের আদেশ দিয়েছেন আদালত। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ৩ এপ্রিল। রিট আবেদন করা হয়েছে ৬ মে। যিনি রিট আবেদন করেছেন তিনি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় এক নেতা; সাভার আওয়ামী লীগের শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ বি এম আজহারুল ইসলাম সুরুজ মিয়া।
ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলেছেন, ‘আদালত স্বাধীন। আদালত রায় দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সরকারের কিছু করার নেই।’ অবশ্যই আদালতের রায় নিয়ে কারো কিছু বলার নেই। আদালতের রায় মেনে নিতে হবে।
প্রশ্ন আদালতের আদেশ নিয়ে নয়। নির্বাচনের কষ্টসাধ্য প্রচারণার শেষপর্যায়ে, তফসিল ঘোষণার দীর্ঘ এক মাস পর কেন সুরুজ মিয়ার আবির্ভাব ঘটল, তা নিয়ে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ছয়টি মৌজার জটিলতা নিয়ে তিন বছর আগে ২০১৫ সালে প্রথম রিট করেছিলেন এই সুরুজ মিয়া। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই ছয়টি মৌজার প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য ও দলিলপত্র পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ওই কমিটি এই ছয় মৌজাকে গাজীপুর প্রশাসনিক জেলা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিয়েছে। চলতি বছরের ৪ মার্চ এই ছয় মৌজাকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত বলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। অর্থাৎ গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সীমানাসংক্রান্ত এই বিরোধের প্রশাসনিক নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। সুরুজ মিয়া নির্বাচন কমিশনের তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছেন এই বলে, ‘ঢাকা জেলার এই ছয় মৌজাকে সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্তি এবং নির্বাচনের তফসিলের বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়নি, যা আইনসম্মত নয়।’
যা হোক, আদালতের আদেশে সুরুজ মিয়া খুব খুশি। আদালতের এই আদেশের সময় নির্বাচন কমিশনের কোনো আইনজীবী সেখানে ছিলেনÑ এমন কোনো খবর গণমাধ্যমে আসেনি। আজকাল বিরোধী দলের নেতাদের বিভিন্ন মামলায় দুদকের আইনজীবীদের বেশ সক্রিয় দেখা যায়; কিন্তু নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীদের খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ আদালতের আদেশের কথা জানার পর নির্বাচন কমিশন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সব কার্যক্রম দ্রুত গুটিয়ে নিয়েছে। আদালতের এই রায়ের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন আপিল করবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। অপর দিকে, আওয়ামী লীগের মতো তৃণমূলপর্যায় পর্যন্ত সংগঠিত একটি বড় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন স্থগিতকরণ চেয়ে রিট আবেদন করবেন তা ক্ষমতাসীন দলের নেতারা জানবেন না, তা অবিশ্বাস্য। আওয়ামী লীগের নেতারা যে কথাই বলুন না কেন, সাধারণ মানুষ মনে করেÑ তারা পরাজয় এড়াতে এমন কৌশল নিয়েছেন। সুরুজ মিয়াকে দিয়ে আদালতকে ব্যবহার করে জনগণের ভোটের অধিকার সুকৌশলে হরণ করা হলো কি না তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
আদালতের আদেশে নির্বাচন স্থগিত করার ঘটনা যে এবারই প্রথম ঘটল, তা নয়। এর আগে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এর কারণ প্রায় একই রকম। উচ্চ আদালত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন এবং সম্প্রসারিত ১৮টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচন গত জানুয়ারিতে ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছেন। দেশে প্রধান দুই দলই ঢাকা উত্তরের মেয়র উপনির্বাচনের জন্য তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছিল। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এই নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। ভাটারা এলাকার দু’টি ইউনিয়নকে উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় এনে ১৮টি ওয়ার্ড সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সেই ইউনিয়ন দু’টির চেয়ারম্যানেরা রিট আবেদনগুলো করেছিলেন। রিটের পক্ষে যুক্তি ছিল, সম্প্রসারিত এলাকাগুলোর ভোটার তালিকা চূড়ান্ত না করেই তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। বাস্তবে এটি ছিল নির্বাচন কমিশনের একটি বড় ধরনের ব্যর্থতা। জটিলতাগুলো দূর না করেই নির্বাচন কমিশন সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিল। গাজীপুরের মতো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়ের সম্ভাবনা ছিল। সেবারও ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে গিয়েছিলেন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অভিযোগ করেছিল, নির্বাচনে হার নিশ্চিত জেনে সরকার একটা সুযোগ নিয়েছে।
সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের জন্য অভিজ্ঞতা ভালো নয়। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছিলেন। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল। এই নির্বাচনে সন্ত্রাস, জালিয়াতি ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগে বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা দুপুরের আগেই ভোট বর্জন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছিল। এভাবে প্রতিপক্ষের বর্জনের মধ্য দিয়ে জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনে ঢাকায় উভয় সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণ এখন ক্ষমতাসীন দলের হাতে। গত বছরের নভেম্বরে ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক মারা যাওয়ার পর উপনির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচন স্থগিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধি ছাড়াই চলছে দেশের প্রধান সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম। এতে অবশ্য ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত রয়েছে।
ঢাকার বাইরের সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়রদের গত পাঁচ বছরে অনেকবার জেলে যেতে হয়েছে। তদুপরি তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী ও গাজীপুরের মেয়র বলতে গেলে দায়িত্বই পালন করতে পারেননি মামলা ও গ্রেফতারিতে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রতি ক্ষমতাসীন দলের এমন আচরণ সাধারণ ভোটারদের আরো বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এ ছাড়া শহরাঞ্চলের এসব নির্বাচনে জাতীয় ইস্যুগুলোর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে থাকে। ফলে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা এবার অনেক কম। আর ক্ষমতাসীন দলের গৃহবিবাদ তো আছেই। গত সপ্তাহে একটি দৈনিক শিরোনাম করেছিল, ‘গাজীপুরের ভোটাররা ঝিম ধরে আছে।’ নির্বাচনের দিন ভোটাররা ‘গা-ঝাড়া দিয়ে’ ভোটকেন্দ্রে গেলে ফলাফল যে অনুকূলে আসবে না তা বোঝা খুব কঠিন নয়। ফলে ক্ষমতাসীন দলের আপন লোক সুরুজ মিয়াকে সামনে আনা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনে সম্ভাব্য পরাজয় হয়তো ঠেকানো গেল; কিন্তু জনমানসে বিরোধী দলের প্রার্থী বিজয়ী হলেন। অর্থাৎ নির্বাচন না করেও বিএনপি প্রার্থীর নৈতিক বিজয় হলো। সাধারণ মানুষ গত এক দশকে ক্ষমতাসীন দলের নীতিহীন রাজনীতির নানা কূটকচাল দেখে চালবাজির এসব রূপ খুব সহজেই এখন ধরতে পারে।
বছরের শেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে, নির্বাচন কমিশনের জন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচন এসিড টেস্ট। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু করতে কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সরকারই বা কী ভূমিকা রাখে, সেদিকেই সবার দৃষ্টি; কিন্তু নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসে, ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে ভয় ও শঙ্কা বাড়তে থাকে। কারণ, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রভাব সংসদ নির্বাচনে পড়বে। সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের একটা পরীক্ষা হয়ে যেত এ নির্বাচন। বিশেষ করে রাজধানীর পাশে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে পরাজয় শাসক দলের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হতো; কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ সরকার কৌশলে এড়িয়ে গেল। জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
একের পর এক সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা ও সন্দেহ আরো বাড়ছে। রাজধানী ঢাকার পর গাজীপুরের সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা ও সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সীমানা নিয়ে জটিলতা বা ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির সুযোগ না থাকা নিয়ে শাসক দলের সমর্থনে যেভাবে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাচ্ছে, তাতে বর্তমাস নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
নির্বাচনী এলাকার সমস্যাগুলো নির্বাচন কমিশনের অজানা নয়। এমন ইস্যু আদালতে উঠলে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার উদহারণ নতুন নয়। কিন্তু পরিস্থিতি মোকাবেলায় নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনি এসব বিষয় নিয়ে এই নির্বাচন কমিশন আদৌ সচেতন কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন সব কিছু জেনেও না জানার ভান করে থাকতে পারেÑ এমন অভিযোগ ওঠাও অস্বাভাবিক নয়। নির্বাচন কমিশন বলছে, আদালতের রিটের ব্যাপারে তারা কিছুই জানত না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সবুজ সঙ্কেত পেয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিলেন। এখন নির্বাচন কমিশন স্থগিত হওয়া নির্বাচন অনুষ্ঠানে আদালতের দ্বারস্থ হয় কি না, তা দেখার বিষয়।
গাজীপুরে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় ক্ষমতাসীন দল যে কিছুটা হলেও টেনশনমুক্ত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্ষমতাসীন দলের এখন মনোযোগ খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিকে। ‘যেকোনোভাবেই’ খুলনায় বিজয়ী হয়ে তারা তাদের ‘জনপ্রিয়তা’ দেখাতে চাইবেন। ইতোমধ্যে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সেখানে তাদের প্রচার-প্রচারণায় বাধা দেয়া হচ্ছে এবং নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ খুলনায় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে এ অবস্থায় খুব কমই আস্থা রাখতে পারছে। এমন পরিস্থিতিতে ভঙ্গুর ভাবমর্যাদা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব। ক্ষমতাসীন দল যেভাবে কৌশলে জনগণকে ভোট দেয়ার অধিকার থেকে দূরে রাখতে চাইছে, তাতে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হতে তারা কতটা বেপরোয়া হতে পারে, সহজেই অনুমান করা যায়; কিন্তু অধিকারবঞ্চিত মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে কোনো-না-কোনো সময় ঘুরে দাঁড়াবে। তখন কোনো কৌশলে তা ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। হ
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫